মতামত

তরুণদের প্রত্যাশা

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভোটার জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ ঘোষণা করবে। আসন্ন নির্বাচনে তরুণ নতুন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ (যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে)। আর বয়স ৩৫ বছর পর্যন্ত বিবেচনা করলে তরুণ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি। আমিও একজন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ। অনেকের মতো আমিও মনে করি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বেকার তৈরির কারখানা! আমাদের দেশ, সমাজ, পরিবার সর্বোপরি শিক্ষাব্যবস্থা পড়ালেখা করা ৯৭ শতাংশ তরুণকে চাকরিপ্রত্যাশী করে তৈরি করে। সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, তরুণদের পড়ালেখা করা হয় বা করানো হয় যেন চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে! তথ্য মতে, দেশে এখন বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। তবে প্রকৃতপক্ষে বেকারের সংখ্যা আরো বেশি। পড়ালেখা করার সময় এবং পড়ালেখা শেষ করে চাকরি পাওয়ার জন্য একজন বেকার তরুণকে চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ সমস্যা কারো একার নয়, সমগ্র তরুণ জনগোষ্ঠীর সমস্যা। বছরের পর বছর ধরে তরুণরা এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, হচ্ছে ও হবে। প্রতিটি সংসদীয় আসনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে! তাই তরুণ প্রজন্মের ভোট পেতে হলে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোয় তরুণদের নি¤œলিখিত সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা : পড়ালেখা শেষ করা লাখ লাখ তরুণ চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতি বছর পড়ালেখা শেষ করে প্রায় ২২ লাখ তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর অর্ধেক তরুণের চাকরি হয়। বাকিদের বেকারের খাতায় নাম লেখে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হয় চাকরি পাওয়ার জন্য।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি : দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে তরুণ সমাজ চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করে আসছে। জাতীয় সংসদে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে বহুবার দাবিও উঠেছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার জনমত জরিপেও প্রায় ৯০ ভাগের বেশি তরুণ চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। বর্তমানে গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। আবার অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। পৃথিবীর ১৬০টিরও অধিক দেশে (রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারতসহ অধিকাংশ উন্নত দেশে) চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এর অধিক। বিশ^বিদ্যালয় বা কলেজের একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করতে করতে বিভিন্ন কারণে প্রায় ২৫ বছর লেগে যাচ্ছে! একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরু করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে লাখ লাখ ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা আছে, সনদ আছে কিন্তু চাকরি নেই! বয়স ৩০ পার হওয়া মানে অর্জিত সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ! সহজ কথায়, একজন তরুণকে ৩০-এর গন্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা হচ্ছে! ‘যুবনীতি-২০১৭’-তে যুবাদের বয়স ১৮-৩৫ রাখা হয়েছে। সময়ের যুক্তিসংগত ও যুগোপযোগী দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সব দিক বিবেচনা করে ইতোমধ্যে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ (একাধিকবার) করেছে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয় ‘সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’। সরকারের কাছে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানালেও তরুণ জনগোষ্ঠীকে বারবার হতাশ হতে হয়েছে। এ ব্যাপারে নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর কাছে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আশা করে।

ঘুষ-দুর্নীতিকে ‘না’ : গত কয়েকটি নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেও ঘুষ-দুর্নীতিকে ‘না’ বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কি ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে? উত্তর হলোÑনা। ধরে নেওয়া যায়, এবারের নির্বাচনেও একইভাবে ঘুষ-দুর্নীতিকে ‘না’ বলার প্রতিশ্রুতি থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী তরুণসমাজের কাছে দেশের প্রধান শত্রু ঘুষ-দুর্নীতি। এ দেশের তরুণরা কখনো ঘুষ-দুর্নীতিকে প্রস্রয় দেয়নি, কখনো দেবে না। এ ধরনের অসৎ পন্থাকে তরুণসমাজ মনেপ্রাণে ঘৃণা করে। দেশে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে দুর্নীতি কমবে। এ ব্যাপারে জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা জরুরি। নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণ জনগোষ্ঠী এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আশা করে।

চাকরির আবেদন ফি ও নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা : বেকার তরুণ চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হলো চাকরির আবেদন ফি। বিভিন্ন চাকরিতে আবেদন করতে একজন তরুণকে বেকার থাকা অবস্থায় অর্থের বিশাল একটা অংশ চলে যায়। তরুণ জনগোষ্ঠী এ রাষ্ট্রেরই সম্পদ। কত খাতে কত টাকা অপচয় হয়, আবার কোনো কোনো খাতে টাকা অতিরিক্ত হিসেবে জমা থাকে। তাই তরুণদের জন্য সব ধরনের চাকরিতে সামান্য আবেদন ফি বাতিল করলে ক্ষতিটা কোথায়! ব্যাংকগুলোতে এখন আবেদন করতে কোনো আবেদন ফি লাগে না। সব ধরনের চাকরির আবেদনে কোনো ফি লাগবে নাÑরাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এমন ঘোষণা থাকলে লাখো কোটি তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে এর থেকে খুশির সংবাদ আর কিছুই হবে না বলে মনে করি! চাকরির নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা তরুণ চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য অন্যতম একটি সমস্যা। বছরের পর বছর ধরে এ সমস্যা চলে আসছে। বিসিএস ক্যাডারের চাকরি থেকে শুরু করে অন্যান্য শ্রেণির (দ্বিতীয়, তৃতীয়, চুতর্থ) চাকরিতেও নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা চলে আসছে। বিসিএসের চাকরিসহ অধিদফতর, বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের বহু চাকরির বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে দেড়-দুই-তিন বছর পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। আবেদনের পর চাকরির পরীক্ষার আশায় একজন চাকরিপ্রত্যাশীকে বছরের পর বছর বসে থাকতে হচ্ছে। এ বিষয়সমূহ চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের বিরক্তির কারণ হচ্ছে। তরুণরা নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার চায়।

নিবন্ধিত শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা : ‘এনটিআরসিএ’ (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কর্তৃপক্ষ থেকে সনদ নিয়ে লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ বসে আছে। বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটি থেকে ‘এনটিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষের কাছে আসার পর শিক্ষক নিয়োগে বিশাল এক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই উদ্যোগ চাকরিপ্রত্যাশী নিবন্ধিনধারীসহ সমগ্র দেশবাসীর কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে। তবে যে উদ্দেশ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাত থেকে ‘এনটিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষের হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ হচ্ছে না। শিক্ষক নিয়োগে অযথা কালক্ষেপণ করে চলেছে ‘এনটিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষ। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য থাকার কারণে পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং পড়ছে। আবার যথাসময়ে নিয়োগ না হওয়ায় লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী নিবন্ধিত শিক্ষকরা হতাশায় দিন পার করছেন। জাতীয় মেধাতালিকা অনুযায়ী ১-১২তম শিক্ষক নিবন্ধনকারীদের দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা এখনো করা হয়নি। পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়মে (প্রিলি-লিখিত-ভাইভা) পরীক্ষা নেওয়া ১৩ ও ১৪তম নিবন্ধনধারীদেরও দ্রুত নিয়োগ দেওয়া জরুরি। অথচ নিয়োগ না দিয়ে ‘এনটিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষ শুধু নিবন্ধনধারীদের পরীক্ষা নিচ্ছে (এখন ১৫তম শিক্ষক নিবন্ধনে আবেদন চলছে)। লাখ লাখ তরুণ বেকার চাকরিপ্রত্যাশীদের হতাশ করার জন্য ‘এনটিআরসিএ’ কর্তৃপক্ষই দায়ী। এ বিষয়ে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়সহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। এসব আত্মহত্যার পেছনে চাকরি না পাওয়ার হতাশাসহ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। একটি দেশের প্রাণশক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। যেকোনো দেশের মোট জনসংখ্যার যত বেশি তরুণ জনগোষ্ঠী থাকে, সে দেশ তত বেশি সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পায়। তারুণ্যের শক্তি বা কর্মদক্ষতার ওপর ভর করে একটি দেশ উন্নতি লাভ করে। স্বপ্ন দেখাই হলো তারুণ্যের ধর্ম। তাই তরুণদের কাজে লাগাতে হবে, স্বপ্ন দেখাতে হবে। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীই আসন্ন নির্বাচনে ভোটের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী তরুণ জনগোষ্ঠীর চাওয়া-পাওয়াগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তবে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোকে শুধু ইশতেহার ঘোষণা করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নেও উদ্যোগী হতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"