মতামত

সেবার মানসিকতা প্রয়োজন

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমান সরকারের গত পাঁচ বছর সুবর্ণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে পদোন্নতির জট, মেধাবী, যোগ্য, নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি, পদায়ন দিয়ে নজির স্থাপন করেছে শেখ হাসিনার সরকার। সরকারি এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার জন্য সহায়ক বলে মনে করে প্রশাসনের শীর্ষ মহল। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এই প্রথমবারের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত সবার জন্য বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রায় দ্বিগুণ বা শতভাগ ক্ষেত্র বিশেষ দেড় শ গুণ বৃদ্ধি করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে সরকার। একই সঙ্গে চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হওয়ায় শেখ হাসিনার সরকারের বর্তমান সময়কে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘সোনালি সময়’ বলে অভিহিত করেছেন সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মো. মোজাম্মেল হক খান।

প্রজাতন্ত্রে নিয়োজিত সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুই বছর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি, বেতন-ভাতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি এবং শূন্যপদ না থাকলেও দফায় দফায় পদোন্নতি দিয়ে কাজের গতি আনার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনে বিরাজমান অসন্তোষ ও অস্থিরতার অবসান হয়েছে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরে সে সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুুল মুহিত বলেছিলেন, বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করার ফলে কাজে গতি আসবে, সেবা পাবে জনগণ আর প্রশাসনে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু বাস্তবে সেবা প্রার্থী জনগণ সঠিক সময়ে সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও উন্নয়নকাজেও ধীর গতি অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এখন তারা নিজ নিজ গ্রেডে পরিচিত হবেন। আর গ্রেড-১-এ বর্তমানে বেতন ৭৮ হাজার টাকা, আগে ছিল ৪০ হাজার। গ্রেড-২-এ ৬৬ হাজার, আগে ছিল ৩৩ হাজার ৫০০, গ্রেড-৩-এ ৫৬ হাজার ৫০০, আগে ছিল ২৯ হাজার। এ ছাড়া গ্রেড-১৯-এ ৮ হাজার ৫০০ করা হয়েছে, আগে ছিল ৪ হাজার ২৫০ টাকা এবং ২০-এ ৮ হাজার ২৫০ টাকা করা হয়েছে, আগে ছিল ৪ হাজার ১০০।

বিগত ২০১৫ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিভিন্ন পদে একসঙ্গে ৮৭৩ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে ৩৪৩ জন, উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে ২৯৯ জন এবং যুগ্মসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে ২৩১ জন। ঠিক একইভাবে গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্র্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করে ৮ম বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা এক লাফে দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সরকার অনুমোদিত কাঠামোয় সচিবের সংখ্যা রাষ্ট্রদূত ও রিজার্ভ পদসহ ৭৮ জন। অতিরিক্ত সচিব ১০৭, যুগ্মসচিব ৪৩০, উপসচিব ৮৩০ জন। এ ছাড়া অনুমোদিত সিনিয়র সহকারী সচিবের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার এবং সহকারী সচিবও প্রায় ২ হাজারের মতো। সব মিলিয়ে ৫ হাজারের মতো কর্মকর্তা নিয়ে জনপ্রশাসনের সাংগঠনিক কাঠামো বিদ্যমান। একটি সুষম এবং আদর্শ জনপ্রশাসন কাঠামোতে প্রশাসনের গোড়ার দিক অর্থাৎ সিনিয়র সহকারী সচিবের সংখ্যা ২ হাজারের কথা থাকলেও বর্তমানে আছে ১ হাজার ৬৩৫ জন। আর সহকারী সচিবের সংখ্যা এখন আছে ১ হাজার ২১৪ জন। কিন্তু এখানে অনুমোদিত পদ প্রায় ২ হাজার।

অন্যদিকে, প্রশাসনের উঁচু স্তরের কর্মকর্তা বিশেষ করে উপ-সচিবের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৮৩০ হলেও কাজ করছেন ১ হাজার ২৮০ জন। কিন্তু গত বছরের এপ্রিলে এ পদে ৩৪৩ জনের পদোন্নতির ফলে বর্তমানে কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৩ জন। যুগ্মসচিব হিসেবে কাজ করে আসছিলেন ৮৬৭ জন, কিন্তু এর অনুমোদিত পদ ৪৩০টি। গত এপ্রিলে এ পদে ২৯৯ জনকে পদোন্নতি দেওয়ায় বর্তমানে যুগ্মসচিবের সংখ্যা ১ হাজার ১৬৬ জন। এ ছাড়া অতিরিক্ত সচিবের পদ ১০৭টি হলেও কাজ করে আসছিলেন ২২৬ জন। এ পদে ২৩১ জনকে গত বছরের এপ্রিলে পদোন্নতি দেওয়ার ফলে এখন অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ জনে।

জনপ্রশাসনে কাজের গতি আনতে প্রধানমন্ত্রী এর আগে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে জনপ্রশাসনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। তিনি এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকেও এ ব্যাপারে তার অভিমত ব্যক্ত করেন।

এমনি অবস্থায় এর আগে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সইয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের ১৭টি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তোলার আদেশ জারি করা হয় জনপ্রশাসন থেকে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খান এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলেছেন, সরকার গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়নের

ফলে প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে উৎসাহ বেড়েছে, একই সঙ্গে তাদের সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা না চাইতেই বেতন-ভাতা দ্বিগুণ, পদোন্নতি, চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির সুফল ভোগ করছেন। এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো দেশ গঠন ও উন্নয়নে সরকারকে সহযোগিতা এবং সেবাপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা দেওয়া। তবেই তারা নৈতিকভাবে নিজের কাছে স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে পারবেন। সরকারি চাকরিজীবীরা জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে আত্মনিয়োগ করবেন বলেও প্রত্যাশা তার। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনে জনসেবার ক্ষেত্রে এর পূর্ণ প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি-এটা কাম্য নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

"