পর্যালোচনা

টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর সারা দেশে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষক-কৃষাণীরা ধান কাটা, মাড়াই, শুকানো ও গোলাজাত করার কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও জয়পুরহাট এলাকায় কৃষক ধান কাটার পর ওই জমিতে আলু, ভুট্টা, মসুর চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ লাগাচ্ছেন, পেঁয়াজ, রসুন, টমেটো, ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো পুষ্টিকর সুস্বাদু সবজি।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় সামানিয়াপাড়া গ্রামে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ আনিসুর রহমানের মাল্টা বাগান দেখতে যাওয়ার পথে আমন ধানের খেতে দেখা হলো ছলিমপুর গ্রামের প্রগতিশীল কৃষক আবদুল কদ্দুসের সঙ্গে। তিনি ধান কাটছিলেন। কথা প্রসঙ্গে বললেন, এ বছর আমন মৌসুমে ২.০০ একর জমিতে ব্রিধান ৪৯-এর চাষ করেছিলেন। প্রথমদিকে ফসলের অবস্থা খুব ভালো ছিল। কিন্তু কাইচ থোড় বের হওয়ার সময় বৃষ্টি না হওয়াতে আশা অনুযায়ী ফলন হয়নি তার। একরপ্রতি ধান ফলেছে মাত্র ৪৮ মণ। গত বছর সময়মতো বৃষ্টি হওয়াতে ওই একই জাতে একরপ্রতি ধান ফলেছিল ৬৪ মণ। এ বছর একরপ্রতি ধান উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ১৯ হাজার ২০০ টাকা। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ব্রিধান ৪৯ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা মণ দরে। এতে একর প্রতি তার আয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৬০০ টাকা। খরচ বাদে শুধু ধান থেকে তার নিট লাভ হবে একরপ্রতি ১৪ হাজার ৪০০ টাকা। এ ছাড়া উৎপাদিত খড় বিক্রি করে আরো আয় হবে ১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক একর আমন ধান চাষে তার নিট লাভ হবে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। তার মতে, প্রতি মণ আমন ধানের দাম হওয়া উচিত কমপক্ষে ১০০০ টাকা। গত বছর এ সময়ে প্রতি মণ আমন ধানের দাম ছিল ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি মণ আমন ধানের দাম কমেছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। ত্রিশাল নামাপাড়া গ্রামের আরেকজন কৃষক এ বছর অন্যের জমি লিজ নিয়ে ০.৮০ একর জমিতে বায়ার কোম্পানির ধানি গোল্ড হাইব্রিড জাতের ধানের চাষ করেন। ফলন হয়েছে ভালো। একরপ্রতি ধান ফলেছে ৫৬ মণ। ওই কৃষকের মণপ্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৪৮৫ টাকা। প্রতি মণ ধান ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদে প্রতি মণ ধানে তার নিট লাভ হয়েছে ১১৫ টাকা। এ ছাড়া খড় বিক্রি করে একরপ্রতি তার আয় হবে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা।

বোরো ধানের তুলনায় আমন ধান উৎপাদনের খরচ কম। দু-একটি সম্পূরক সেচ দিলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। বোরো ধান চাষের মতো আমন ধানের আবাদে ভূগর্ভ থেকে প্রচুর পানি উত্তোলন করতে হয় না। অল্প রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে সহজেই এই বৃষ্টিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব ধানের চাষ করা যায়। এ বছর সারা দেশে স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণা, বিনাধান ১৯, ব্রিধান ৩২, ব্রিধান ৪৯, ব্রিধান ৫২ ও হাইব্রিড জাতের মধ্যে ধানি গোল্ড ও ত্যাজ গোল্ডের ফলন হয়েছে আশাতীত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রোপা ও বোনা আমন মিলে ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রোপা ও বোনা মিলে আমনের আবাদ হয়

৫৮ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে। রোপা আমনের

মধ্যে ৪৪ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাত এবং ৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাত ও ১ লাখ

৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড জাতের চাষ হয়েছে। এ ছাড়া বোনা আমনের আবাদ হয়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর জমিতে। আমন মৌসুমে এবার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৩৪ হাজার টন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের ধারণাÑঅনুকূল আবহাওয়া, সরকারি প্রণোদনা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং রোগ-বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকার কারণে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। এ বছর দেশে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬ লাখ টন বেশি আমন চাল উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ৬ লাখ টন আমন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী চলবে সিদ্ধ আমন চাল সংগ্রহ কর্মসূচি। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ৬৭ পয়সা ও চালের উৎপাদন খরচ ৮৮ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এ বছর খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক প্রতি কেজি আমন চালের সংগ্রহ মূল্য তিন টাকা কমানোর রহস্য আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি চালে উৎপাদন খরচ কোনো অবস্থাতেই ৩৫ টাকার বেশি হয় না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উৎপাদন খরচ একটু বেশি ধরা হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নিয়ে আমন চালের মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সভায় খাদ্য পরিস্থিতি ও মজুদ সম্পর্কে জানানো হয়, সরকারি খাদ্য গোদামে চাল ও গমসহ বর্তমানে ১২ লাখ ১৮ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চাল ৯ লাখ ৬৮ হাজার টন। এটা সর্বোচ্চ মজুদ। অন্যদিকে জানা যায়, গত ১৯ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আমন উৎপাদনের ব্যয় প্রাক্কলন-সংক্রান্ত সভায় প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকা ৩০ পয়সা ও চালের উৎপাদন ব্যয় ৩৭ টাকা ৯০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে সরকারিভাবে দেশটির মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ ধান ও চাল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশে এ হার অনেক কম; মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। সরকার মূলত চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনে থাকে। এতে লাভবান হয় এক শ্রেণির, ব্যবসায়ী, ফড়িয়া, দালাল ও মিলমালিকরা। কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ও ধারদেনা করে ধান উৎপাদন করেন। সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় না করার কারণে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দেখা গেছে, কৃষকের গোলায় যখন ধান থাকে, তখন ধানের দাম থাকে কম। আর এই ধান যখন ব্যবসায়ীদের গুদামে মজুদ হয়, তখন ধান-চালের দাম হুহু করে বেড়ে যায়। চীনসহ পৃথিবীর অনেক দেশে উন্নত মানের খাদ্যগুদাম আছে। ওইসব গুদামে দীর্ঘদিন খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করা যায়। সেসব দেশে যে বছর বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়, সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে অধিক পরিমাণ খাদ্যশস্য কিনে মজুদ করে রাখা হয়। আবার কোনো বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে কম খাদ্যশস্য উৎপাদিত হলে সরকারি গুদাম থেকে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য ভর্তুকি মূল্যে জনসাধারণের কাছে বিক্রি করা হয়। এতে কৃষক তাদের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় না। আমাদের কথা সরকারিভাবে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মুনাফা ধরে ধান, চালের মূল্য নির্ধারণের পর কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কমপক্ষে মোট উৎপাদনের ১৫ শতাংশ ধান সংগ্রহ করতে হবে। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ‘কৃষিপণ্যের জাতীয় মূল্য কমিশন’ গঠন করতে হবে এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করতে হবে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়; ভারতের কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। চাষাবাদের খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এবং কৃষিঋণ মওকুফের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের লক্ষাধিক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ সম্প্রতি (৩০.১১.২০১৮) পার্লামেন্ট ঘেরাও করে তাদের দাবি পেশ করেছেন। গত ১০ বছরে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে ৩ লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। আন্দোলনকারীদের কথাÑফসলেল দাম নেই। সহায়ক মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ফসল বিক্রি করে কৃষক সর্বস্বান্ত ও ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশন ডেকে কৃষকদের এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল অর্থনীতিতে ভারতে কৃষির অবদান ১৫ শতাংশের বেশি। ভারত এশিয়ার তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। অথচ সেখানেও অন্নদাতা কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিষয়টি ভাবতেও আমাদের বিস্ময় লাগে।

দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশে কৃষির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষক যদি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে তারা আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গুণগতমানের পণ্য উৎপাদনে ও ফলন বৃদ্ধিতে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে দেশের টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। ব্যাহত হবে কৃষির অগ্রযাত্রা। ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ অর্থনীতির ঘূর্ণমান চাকা।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর

netairoy18@yahoo.com

"