বিশ্লেষণ

বর্তমান বিশ্ব ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

হিংসা দিয়ে যে জীবনবেদ তৈরি হয়, তাতে আর যাই হোক কাক্সিক্ষত মানবসভ্যতাকে লালন করা সম্ভব নয়। অহিংসার সাধক মহাত্মা গান্ধী তাই বলেছিলেন, অ্যান আই ফর অ্যান আই উইল মেক দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড! এখনই তা প্রয়োজন যেকোনো টেররিজমের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর সচেতন প্রয়াস। প্রয়োজন এর ভয়ংকর পরিণাম সম্পর্কে সর্বস্তরের সামাজিক জাগরণ। মার্কিন বা পশ্চিমা দুনিয়ার উৎপাদন নীতিমালার দুর্বলতর দিকটি প্রতিযোগী দেশসমূহ আমলে নিয়েছে আগেভাগে। পশ্চিমারা যেখানে ভোক্তা চাহিদা বিবেচনায় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা করে নাই, সেখানে এসব দেশ তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া বাড়িয়েই চলেছে। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ নানা দেশে হাজার হাজার কোটি ডলারের লগ্নি করে রেখেছে চীনসহ অন্য সহযোগীরা। তারা এসব দেশে তাদের শিল্প পল্লী স্থাপনে জায়গা বরাদ্দ নিয়েছে এবং দ্রুতগতিতে অবকাঠামোসমূহ গড়ে তুলছে। ইতোমধ্যে গণচীন ঘোষণা করেছে বুলেট ট্রেন চালানোর। ট্রেনখানি চীন দেশ থেকে যাত্রা করে ভারতের কলকাতা অবধি আসবে মিয়ানমার, বাংলাদেশের ভূখ- পেরিয়ে। এ রেললাইনটি হবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে যোগসূত্র আর একটি পরোক্ষ বিনিয়োগ। গণচীন ঘোষণা করেছে তার প্রতিষ্ঠিত রেললাইনটির উভয় পাশে স্থাপন করা হবে চীনা পণ্যের উৎপাদনকারী শিল্পসমূহ। অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবকে নবরূপে আর কিছুটা আগ্রাসীরূপে বাস্তবায়িত করতে যাচ্ছে গণচীন। যেসব দেশে এসব শিল্প স্থাপিত হবে, তারাও উপকৃত হবে নানা পর্যায়ে, নানামুখী কর্মধারায়। তাদের দেশের সমূহ বেকারত্ব যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা। দারিদ্র্যমুক্তির কর্মতৎপরতার এটি একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। তাই তারা সানন্দচিত্তে চীনা প্রস্তাবসমূহ বিবেচনা করছে। অন্যের কাঁধে কাঁঠাল রেখে নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করতে কেনা চায়! দ্রুত উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এই দেশগুলোতে আনবে মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তন। অবশ্যই রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস পাবে এবং ফললাভ ঘটবে ক্ষমতাসীন সরকারসমূহের নিরুপদ্রব শাসনব্যবস্থা। বিশ্বের সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। শিল্পে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আর জীবনমান বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রটি একটি ব্যতিক্রম দৃষ্টান্তও বটে।

বর্তমান বিশ্বে মানুষ অহরহ ভিন্নতা খুঁজছে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দিন দিন দেশটির জীবনমান উন্নত হচ্ছে বিধায় রুচির বৈচিত্র্য দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। সে হিসেবে মার্কিন দেশে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে চীন, জাপান প্রভৃতি দেশের উৎপাদিত পণ্য যেমন মূল্যে সস্তা, তেমনি রুচির বৈচিত্র্য পূরণেও সক্ষম। বর্তমানে চীন, জাপান জাতীয় দেশগুলো একবারের জন্য ব্যবহারযোগ্য পণ্য উৎপাদন করে চলেছে। একবার ব্যবহার করার পর নতুন পণ্য নতুন অভিরুচি অনুসারে ক্রয় করে নিলেই হলোÑএই নীতি অনুসরণ করতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছে মার্কিন ভোক্তাগোষ্ঠী। ব্যবহার কর আর পরিত্যাগ কর নীতিতে প্রায় আসক্তি এসে গেছে মার্কিনিদের মধ্যে। একবার এর মতো ব্যবহারের যোগ্য দ্রব্য উৎপাদনে সক্ষম একমাত্র চীন, জাপান, কোরিয়া জাতীয় দেশসমূহ। অন্যদিকে মার্কিন উৎপাদিত দ্রব্যাদি উচ্চমানের, দীর্ঘস্থায়ী আর উচ্চমূল্যের। সে হিসেবে সেগুলোর কাটতি বর্তমান পরিবর্তনশীল যুগে মার্কিনি তথা বিশ্ববাজারে প্রায় তলানির দিকে। মার্কিন উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে এখন গড়ে উঠছে অতি উৎপাদনশীল দ্রব্যাদির সমাহার। পাহাড় প্রমাণ নানা জাতীয় দ্রব্যাদি এখন গুদামজাত হয়ে রয়েছে মার্কিনি প্রতিষ্ঠানগুলোয়। ইদানীং; দুই কোরিয়ার মধ্যকার হৃদ্যতা আর পারস্পরিক সমঝোতার প্রয়াস শুধু মার্কিনি নয়, পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের জন্য হয়েছে এক অশনিসংকেত। উভয় কোরিয়া যৌথভাবে যদি পণ্য উৎপাদনে অগ্রসর হয়, তাহলে তাদের উৎপাদিত পণ্যমূল্য আরো কমে আসবে আর গুণগত মান আরো উন্নত হবে। এখন বাজার অর্থনীতির ফলে পশ্চিমা বিশ্বে এ জাতীয় পণ্যের প্রবাহ বাড়বে বৈ-কমবে না। তখনকার পরিস্থিতিটা কী হবে, সেটা ভেবে পশ্চিমা নেতাদের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়।

আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থাপনায় আমেরিকাসহ অন্যরা পিছিয়ে পড়বে আবার নিজ নিজ দেশে দেখা দেবে তারল্য সংকট আর কর্মসংস্থান সংকট। স্বল্পমূল্য আর বৈচিত্র্যে ভরা চীনা বা জাপানি দ্রব্যাদি এখন মার্কিন বাজারে প্রচ- দাপটে রাজত্ব করে যাচ্ছে। অনেক মার্কিনি নাকি ঠাট্টা করে বলে থাকে, সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকাটি পর্যন্ত চীন দেশের তৈরি। মার্কিন মুল্লুকে তাদের উৎপাদিত উচ্চমানের আবার উচ্চমূল্যের পণ্যের পাহাড় জমছে। অন্যদিকে, ক্রেতারা ঝুঁকছে এশীয় দেশসমূহের তৈরি সস্তামূল্যের পণ্যে। ব্যবহার কর আর ফেলে দাও নীতিতে। ফলে মার্কিনি পণ্যদ্রব্যের বিক্রি বা ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব নতুন একটি প্যাঁচ করেছেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চীন বা তদনুরূপ দেশের উৎপাদিত পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে এ জাতীয় পণ্যক্রয়ে নিরুৎসাহিতকরণ নীতিটি কার্যকর করবেন। গণচীন এর প্রতিবাদ করেছে কিন্তু হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সেও মার্কিনি পণ্যের ওপর শুল্কারোপ করবে। গণচীন বা তার প্রতিবেশী দেশসমূহে নানা ধরনের প্রকল্পে বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভোক্তা শ্রেণির ব্যবহার্য দ্রব্যের ক্ষেত্রে সে এরূপ নাকের বদলে নরুন নীতিটি গ্রহণ করতে চাচ্ছে। টানাপড়েন এখনো চলছে। গণচীনের ভাষ্য মতে, এ জাতীয় কর্মপন্থা মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা কমই হবে। কারণ হিসেবে সে বলছে, তার উৎপাদিত পণ্যসমূহ যেমন ক্রেতাবান্ধব, সাশ্রয়ী আর প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উন্নত মানের। ইদানীং মার্কিন সরকার সৌদি আরবকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিণত করেছে। তারা সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে সৌদি সরকারকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে।

সৌদি সরকার বাহানা হিসেবে বলছে, যেহেতু ইরান সরকার নিজ দেশে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও পারমাণবিক চুল্লির ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসাধন করছে, তাই নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা। মার্কিন সরকার এখানে আবার দ্বিমুখী নীতি চালু রেখেছে। আধুনিক অস্ত্র বিক্রি বাবদ আবার পারমাণবিক (অস্ত্র) বিক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি স্থাপনসহ নানা কর্মসূচির মারফত সৌদি অর্থভা-ার শূন্য করে ফেলার ব্যবস্থা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছে। জেনে রাখা ভালো, সৌদি তেলভা-ার আর মাত্র বছর বিশেক স্বর্ণরূপ সম্পদ আহরণের আধার হিসেবে কাজ করতে পারবে, তারপর শুধুই থাকবে শূন্যতা। এখন যেখানে সুষ্ঠু বিনিয়োগ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিগ্রহণ করা সৌদি আরবের জন্য হতো যৌক্তিক, সেটা না করে দেশটি অগ্রসর হচ্ছে বিনাশি পথে। মার্কিনিদের হিসাব কিন্তু ঠিকঠাক রয়েছে। এ দেশটিতে প্রতিদিন এক কোটি সত্তর লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা রয়েছে। দেশটির ২৫ কোটি মানুষের জন্য রয়েছে ছাব্বিশ কোটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও জ্বালানি তেলের প্রয়োজন রয়েছে সমধিক। প্রশ্ন হতে পারে, আগামী বিশ বছর যদি সত্যিকার অর্থে তেলশূন্য হয়ে পড়ে সৌদি আরব, তখন মার্কিনিদের হাল হবে কেমনতরো। মনে রাখতে হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা জায়গায় রয়েছে অনেকগুলো প্রাকৃতিক তেলের আধার। সেগুলোতে হাতই দেয় নাই কর্তৃপক্ষ। আরো রয়েছে অনেক এলাকায় প্রস্তর সমৃদ্ধ ভূস্তরে সঞ্চিত তেলের আধার। আলাস্কার পুরোটাই রয়েছে তেলভা-ারের ওপর প্রায় ভাসমান অবস্থায়। এগুলোর সব কটি অব্যবহৃত। দুনিয়ার তেলসম্পদ শুষে নেওয়ার পর হাত দেবে সেগুলোতে। ইতোমধ্যে পারমাণবিক সৌরশক্তিসহ নানা উপায়ের বিকল্প ব্যবস্থাও করে রেখেছে দেশটি।

জাপান দেশটিও যে বিভীষিকা হয়ে উঠবে না, এটার নিশ্চয়তা কে দেবে। পাশের দেশসমূহ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাপিয়ে বেড়াবে, সেও তখন মান-অভিমান ভুলে উভয় কোরিয়ার সমান্তরাল চলার ব্যবস্থা নেবে। সেও যৌথ ব্যবস্থাপনার উৎপাদন নীতিতে আগুয়ান হবে ধরেই নেওয়া যায়। তখন স্বল্পমূল্যের আর বৈচিত্র্যেভরা পণ্যসমূহ উৎপাদন প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে যৌথ শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই যেতে চাইবে। তখন এদের উৎপাদিত পণ্যে বিশ্ববাজার যে সয়লাব হয়ে উঠবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার নীরব এবং নিষ্ক্রিয় সাক্ষী ওবামা। অর্থাৎ হোয়াইট হাউসে বসে একজন সাদা প্রেসিডেন্টও বুশের পর যেসব অপকর্মের দায়ভাগী হতে চাইতেন না, সেসব দায় মুখ বুজে বহন করছেন কালো প্রেসিডেন্ট ওবামা। সেই রুশ গল্পের জমিদারের চালাকি যেমন কাজ দিয়েছিল, তেমনি আমেরিকায় কাজ দিচ্ছে হোয়াইট এস্টাবলিশমেন্টের চালাকি। একজন কালো প্রেসিডেন্টের কাঁধে বন্দুক রেখে এভাবে আমেরিকার নিউকন ফ্যাসিস্টদের পাখি শিকারের সাফল্য বিশ্ব ইতিহাসের একটি চমকপ্রদ অধ্যায় হয়ে থাকবে। কিন্তু চালাকি দ্বারা কি কোনো মহৎ কাজ করা যায়? বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব চালাকি এখন ধরা পড়ে গেছে। যে বিশাল

জনপ্রিয়তা নিয়ে তিনি হোয়াইট হাউসে ঢুকেছিলেন, তার সবটুকুই খুইয়ে তাকে এ ভবনটি ত্যাগ করতে হবে। আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বে যে ধস নেমেছে, তাকে নতুন কোনো মন্ত্রবলে ঠেকাতে? বিশ্বের অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক তা মনে করেন না। তারা মনে করেন, আমেরিকার স্বর্ণযুগের অবসান হতে যাচ্ছে। অত্যধিক বলদর্পিতাই আমেরিকার কাল হয়েছে।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com"