বিশ্লেষণ

কিমের ওভার ট্রাম্প

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আলমগীর খান

যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কখনো দোস্তি সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এবার হয়েছে, অন্তত বাইরে থেকে দেখে তেমনটা মনে হয়। দুই প্রান্তের বৈরী সম্পর্কের এই দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের এ উন্নতি আশ্চর্যের বৈকি। এ জন্য বেশি অবদান দুদেশের দুই রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উনের। তারা দুজন এখন পরস্পর কাছের মানুষ। কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের এই ঘেঁষাঘেঁষিকে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না। ট্রাম্প ও কিমের সম্পর্কও কিন্তু শুরুতে ছিল সাপে নেউলে। তারপর এই আপন হয়ে ওঠাটা বেশ রোমান্টিক ও নাটকীয়।

ট্রাম্পের চোখে কিম ছিলেন ‘ছোট্ট রকেট বাবু’ আর কিম তাকে মনে করতেন ‘মাথানষ্ট’। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর দুজনের মাঝে অপমানের মিশাইল ছোড়াছুড়ি চলছিল। এরপর একটা ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা ঘটল। বেশ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এ বছর ৬ জুলাই সিঙ্গাপুরে হয়ে গেল ট্রাম্প ও কিমের প্রথম শীর্ষ বৈঠক। এই বৈঠকের পর পৃথিবীতে অসীম শান্তি নেমে এলো, কারণ ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে পারমাণবিক আক্রমণের আর কোনো ভয় নেই।’

এর ২৪ দিন পর কিম এক চিঠি লেখলেন ট্রাম্পকে। তিনি দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতির জন্য ট্রাম্পের ‘শক্তিময় ও অসাধারণ প্রচেষ্টা’র প্রশংসা করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুশিতে গদগদ। তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় এক র‌্যালিতে সমর্থকদের বলেন, ‘আমি সত্যি কঠোর আচরণ করেছি তার সঙ্গেÑসেও তাই করেছে। আমরা এক কদম এগিয়েছি, আবার আরেক কদম পিছিয়েছি।’ তার স্বীকারোক্তি : ‘এবং আমরা প্রেমে পড়ে যাই। ঠিক আছে? না, আসলেই। উনি আমাকে সুন্দর সুন্দর চিঠি লিখেছেন, আসলেই কী ভালো সব চিঠি।’

পুরনোকালের মতো এই পত্র চালাচালির পর থেকে তাদের প্রেম গাঢ় থেকে আরো গাঢ় হতে শুরু করে। ট্রাম্পের চোখে কিম হয়ে পড়েন ‘অসামান্য’। জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে তিনি তাকে ‘চেয়ারম্যান’ সম্বোধন করে সম্মান জানান। এখন তারা দুজনই শিগগিরই দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকের স্বপ্ন দেখছেন, যদিও প্রথম বৈঠকের কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা এখনো জানা যায়নি। শোনা যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়া এখনো পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসকে ঘিরে কিছু সাদামাটা শব্দের মানে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল তর্কের খেলায় মজে আছে।

ট্রাম্পের জন্য এখনো প্রথম শীর্ষ বৈঠকের একমাত্র সাফল্য দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকের পরিকল্পনা প্রণয়ন। কিম অবশ্য দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনকে তিনি তার দেশের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়ার আন্তর্জাতিক প্রচারণায় নামাতে পেরেছেন। শি জিনপিংয়ের দাওয়াতে তিন মাসে তিনবার চীন সফর করেছেন। মুন ও ট্রাম্পের সঙ্গে দরবার তো আছেই। তিনি আর একঘরে নন। কিম এখন বিশ্বের বড় নেতাদের একজন।

নিউইয়র্ক টাইমসে এক লেখায় (কিম জং-উনের খেলাটা কী?, ৮ মে ২০১৮) পূর্ব এশিয়ার চীন বিশেষজ্ঞ জাঁ-পিয়ের কাবেস্তান লেখেছেন, কিম চীনকে নিয়েও খেলছেন। তিনি লেখেছেন, ‘উত্তর কোরিয়ার বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ যেখানে চীনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে চীনের দিকে আরো ঘেঁষার অর্থ হবে উত্তর কোরিয়াকে দেশটির লেজে বা করদ রাজ্যে পরিণত করা...।’ এ জন্য ‘দেশটিকে চীন থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিয়ে যাওয়া’ একটি দূরদর্শী কৌশল, যা ‘১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত হুমকি ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের দিকে মাওয়ের হাত বাড়িয়ে দেওয়া’র মতো। তার মতে, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কিমের সাক্ষাৎ ‘মূলত চীনের মুখ রক্ষার জন্য একটি চমৎকার কূটনৈতিক কৌশল’ হবে হয়তো।

সিআইএয়ের সাবেক ঊর্ধ্বতন বিশ্লেষক কেন্ট হ্যারিংটন ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ওয়ালকট তাদের এক যৌথ লেখায় (কিম যেভাবে ট্রাম্প খেলছেন, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২২ নভেম্বর ২০১৮) লেখেছেন, ‘জুনে সিঙ্গাপুরে তাদের প্রথম বৈঠকের পর থেকে কিম তার প্রতিপক্ষকে লাগাতার টপকে যাচ্ছেন। ট্রাম্প যতই নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণির চুক্তিবাজ বলে মনে করেন না কেন, সত্য হচ্ছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের মতো কিমও তাকে চিনে ফেলেছেন।’ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির ফলে কিমের যেসব লাভ হয়েছে, তার মধ্যে আছে : ট্রাম্পের হুমকি বন্ধ, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারকে কাছে পাওয়া, তার দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধ দুর্বল করা ও তার বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চে অভিষেক।

ট্রাম্পকে টেবিলে নিয়ে আসা ও তার শর্ত অনুযায়ী আলোচনায় বসানো উত্তর কোরিয়ার ৩৫ বছর বয়সী নেতা কিম জং উনের জন্য এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য। যদিও ট্রাম্প নিঃসন্দেহে কম সেয়ানা নন। তার মানে এই নয়, ‘চুক্তির কলাকৌশল’ বই লেখার কারণে তিনিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চুক্তিবাজ। একটি ফলপ্রসূ চুক্তি কীভাবে করতে হয়, তার কলাকৌশল সম্পর্কে বিশ্বসেরা চুক্তিবাজ প্রেসিডেন্ট এখনো অনেক কিছু শিখতে পারেন উত্তর কোরিয়ার তরুণ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে। ট্রাম্প-কিম সম্পর্ক একজনের জন্য সফল ও অন্যের জন্য নিষ্ফল হয়েছে কি নাÑভেবে দেখা যেতে পারে।

যুদ্ধের উত্তেজনা হ্রাস করে কোরিয়া ও পাশের অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতিতে নিশ্চয়ই ট্রাম্প-কিম পিরিতির অবদান যথেষ্ট। তবে এই সম্পর্কের একটা বড় ঝুঁকি হলো ট্রাম্প মিথ্যা বলায় ও চুক্তিভঙ্গেও সেরা। আর আশার দিক হচ্ছে, ট্রাম্প শীর্ষ বৈঠক যারপরনাই ভালোবাসেন এবং তিনি তার কথার ও কাজের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি লাভে সদা উদগ্রীব। কিম তা আরো ভালো জানেন বৈকি। এখন এই রাজনৈতিক পিরিতি খেলায় শেষ হাসিটা যে কে হাসবেন, আগামী দিনে তাই দেখার বিষয়।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, শিক্ষালোক

"