মতামত

সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্র

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

হাসান মাহমুদ

সভ্যতার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বৈশ্বিক অগ্রগতির হাত ধরে। শিক্ষা ও সভ্যতার অগ্রগতিতে সংবাদপত্র আজ অপরিহার্য অঙ্গ। বিশ্বের সবক্ষেত্রে মানবম-লীর এগিয়ে চলার সারথি সংবাদপত্র। আসলে, সংবাদপত্র হচ্ছে বিশ্বে জনমত গঠনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরা। মানবিক চেতনা জাগ্রত করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদপত্র স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করলেও, বিপর্যস্ত কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে সংবাদপত্রের যথাযথ ভূমিকা পালন করা খুব কঠিন। সেখানে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের দায়িত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। গণতন্ত্রকামী মানুষের পাশাপাশি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয় গণমাধ্যমকেও। আর সে জন্য সাংবাদিক ও তার প্রতিষ্ঠানকে নানা ঝুঁকি নিয়ে এগোতে হয়।

সংবাদপত্র জগতের ঘটনাবহুল তথ্য নিয়ে প্রতিদিন হাজির হয় মানুষের কাছে, আধুনিক সভ্যতার বাহন হিসেবে। প্রতিদিন প্রভাতের সূর্যের মতো রাতের অন্ধকার কেটে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করে পাঠকের মনোজগৎ। সংবাদপত্র জীবন-জগতের প্রতিদিনের খবরাখবর দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ, সমৃদ্ধ ও গতিশীল করেছে, তেমনি সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রিক সার্বিক অগ্রগতি ও মানবিক চেতনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশ ও বিকাশে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের গঠনশৈলীতে নানা বৈচিত্র্য ও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দৈনিক, সাপ্তাহিক, অর্ধ-সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ¥াসিক ও বার্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকায় রাজনীতি-অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিনোদন-খেলাধুলা প্রভৃতি বিষয়ে নানা খবরাখবর প্রদান ও আলোচনা-সমালোচনা, পর্যালোচনা-পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়।

জনগণের নাগরিক অধিকার এবং মানবতার পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে সংবাদপত্রকে স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়। তবে, স্বৈর সরকার বিরোধিতা রাষ্ট্র বিরোধিতা না হলেও, স্বৈর শাসকরা কৌশলে রাষ্ট্রকে সংবাদপত্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করায়। তবে গায়ে পড়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারের বিরোধিতা না করে সরকারের গঠনমূলক কাজের প্রশংসা করা নিরপেক্ষ সংবাদপত্রে কর্তব্য। জাতীয় স্বার্থে সরকারের নীতি ও কাজের সমর্থন দেওয়া সংবাদপত্রের দায়িত্ব। সংবাদপত্রের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীনে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। মুঘল আমলে মুসলিম শাসনেও ভারতবর্ষে সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল। অবশ্য তখন সংবাদপত্র মুদ্রিত হতো না। রাজনৈতিক সংবাদ হাতে লেখা হতো এবং তা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজকর্মচারীর কাছে পাঠানো হতো। তবে এই উপমহাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত সত্যিকারের পত্রিকা ‘বেঙ্গল গেজেট’। এটা একটা ইংরেজি সাপ্তাহিক। জেমস আগস্টাস হিকি নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। হিকির গেজেট প্রকাশের ৩৮ বছর পর, ১৮১৮ সালে বাংলা সংবাদপত্রের অভ্যুদয় ঘটে। ‘দিকদর্শন’ নামের আদি বাংলা সাময়িক পত্রটির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন একজন ইংরেজ। তার নাম জন ক্লার্ক মার্শম্যান। তিনি বাংলা সংবাদপত্রের প্রথম সম্পাদক। বাংলা ভাষার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালের ২৩ মে।

‘দিকদর্শন’ প্রকাশের এক মাস পর, উইলিয়াম কেরির সম্পাদনায় এই বিখ্যাত বাংলা সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। সমাচার দর্পণ বাংলা সাংবাদিকতার গোড়াপত্তনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সমাচার দর্পণ প্রকাশের পক্ষকালের ব্যবধানেই প্রথম বাঙালি সম্পাদিত পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গালা গেজেট’ প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য এবং প্রকাশক হরচন্দ্র রায়। পত্রপত্রিকার ইতিবৃত্ত থেকে জানা যায়, এই উপমহাদেশের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষাতেই সংবাদপত্রের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। উপমহাদেশীয় সাংবাদিকতায় বাঙালিরাই পথিকৃত।

বাংলাদেশের আজকের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে প্রথম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল রংপুর থেকে, ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’। সেটা ১৮৪৭ সালের আগস্টে। ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ঠিক এক শ বছর আগে। কালের যাত্রায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ আমাদের সংবাদপত্র বৈশ্বিক মানে পৌঁছে গেছে। এখন বাংলাদেশে অসংখ্য পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মিডিয়াভুক্ত সব ধরনের পত্রিকার সংখ্যা ২৮১০টি। তবে দৈনিক পত্রিকা ৫২৮টি। এর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ২৪৫টি এবং মফস্বল থেকে ২৮৩টি। আর বিশ্বব্যাপী দৈনিক খবরের কাগজের সংখ্যা এখন প্রায় সাত হাজার (২০০৭ সালে ছিল ৬,৫৮০টি)। এখন একদিনে পত্রিকা বিক্রি হয় অন্তত ৪০০ মিলিয়ন কপি। ২০০৭ সালে বিক্রি ছিল ৩৯৫ মিলিয়নেরও বেশি।

অনেকে মনে করেন বেতার, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার কারণে এখন প্রিন্ট মিডিয়ার গুরুত্ব ও প্রাধান্য কমে যাচ্ছে। তবে এটা কেউ কেউ মানতে রাজি নন। কারণ, সংবাদের গ্রহণযোগ্যতা ও নেপথ্য কারণ এবং সংবাদের পেছনের সংবাদ খুঁজতে সংবাদপত্রের বিকল্প নেই।

তারা মনে করেন, সাংবাদিকের জন্য সংবাদপত্রই উৎকৃষ্ট স্থান। অবশ্য এটা সত্য, ইউরোপ-আমেরিকায় প্রিন্ট মিডিয়ার চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে, তবে এশিয়া-আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় প্রিন্ট মিডিয়ার প্রচার সংখ্যা এখনো বাড়ছে।

এশিয়ার মধ্যে কাগজে ছাপানো সংবাদপত্র সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে দক্ষিণ এশিয়ায়। এখানে ছাপানো দৈনিক পত্রিকার সার্কুলেশন বাড়ছে। মনে করা হচ্ছে, ছাপানো সংবাদপত্রের এই সার্কুলেশন বৃদ্ধি আরো কয়েক বছর চলবে। সুতরাং, দক্ষিণ এশিয়ায় সংবাদপত্রের এখনো ভয়ের কিছু নেই। বলা যায়, এটা প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে থাকার সুফল। দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো ইন্টারনেট সবার কাছে পৌঁছায়নি। সংবাদ পাওয়ার বড় ভরসা এখনো দৈনিক পত্রিকা। মানুষের আয় বাড়ছে। শিক্ষিতের হার বাড়ছে। এতে পত্রিকার সার্কুলেশনও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে সংবাদপত্রগুলো বিক্রি ও বিজ্ঞাপন মিলে প্রায় ১৭৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা এককভাবে পুস্তক প্রকাশনা, সংগীত বা চলচ্চিত্র শিল্পের আয়ের চেয়ে বেশি। এ সময়ে সংবাদপত্র বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৯২ বিলিয়ন ডলার। আর ৮৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে।

অবশ্য বিপুল খরচ, অধিক লোকবল, বেতন-ভাতার চাপ, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা, অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং অনলাইন ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার প্রসারসহ নানা কারণে উন্নত বিশ্বে এখন প্রিন্টিং বা ছাপানো পত্রিকা প্রকাশনা হ্রাস পাচ্ছে। আর এ জন্য উন্নত দেশগুলোয় মিডিয়ায় বিনিয়োগকারী বা প্রকাশ করা ইলেকট্রনিকস মিডিয়া তথা টেলিভিশন বা অনলাইনের দিকে ঝুঁকছেন। তবে ইউরোপ-আমেরিকার পাঠকদের মধ্যে পত্রিকার কদর কিছুটা হ্রাস পেলেও বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে তার ছোঁয়া লাগেনি। তাই এখনো দৈনিক পত্রিকা এখানে বেশ জনপ্রিয়। টেলিভিশন বা অনলাইন পত্রিকা নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ছাপানো সংবাদপত্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।

তবে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সাংবাদিকতার সামনে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। সাংবাদিকের রিপোর্ট তৈরির যে ফাইভ ডব্লিউ ওয়ান এইচ ফর্মুলা, সেই ফর্মুলা এখন চলছে না। কারণ, এই ডিজিটাল যুগে কখন কোথায় কী ঘটছে, তা খুব তাড়াতাড়ি ইন্টারনেট ও বেতার-টিভির সৌজন্যে দ্রুত সবাই জেনে যাচ্ছেন। সকালবেলায় পত্রিকা পাঠকের কাছে সেটা পুরনো বা বাসি খবর। তাই এ বিষয়টি সাংবাদিকতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, যে তথ্য জানা হয়ে গেছে, সাংবাদিক তা আর জানতে চাইবে না, বাড়তি কিছু চাইবে।

পাঠককে নতুন কিছু দিতে ঘটনার বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান চালাতে হবে। যে তথ্যগুলো এখনো জানা যায়নি, সেগুলো বের করে আনতে হবে। শুধু তথ্য দিলে হবে না, তথ্যগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে, ব্যাখ্যা দিতে হবে। কথা বলতে হবে ঘটনার ভেতরের-বাইরের, চারপাশের পক্ষের-বিপক্ষের মানুষের সঙ্গে, নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে। এখন সাংবাদিকতাকে হতে হবে বিশ্লেষণী ও ব্যাখ্যামূলক; প্রতিটি খবরই হতে হবে অনুসন্ধানমূলক। আসলে সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৎ, সত্যনিষ্ঠ, পক্ষপাতমুক্ত সাংবাদিকতা। সংবাদপত্রকে প্রমাণ করতে হবে কারো প্রতি পক্ষপাত নেই, কারো বিরুদ্ধে বা কারো পক্ষে কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। সেটা সম্ভব হলেই সর্বস্তরের পাঠক সেই পত্রিকাকে গ্রহণ করবেন। গণমাধ্যমকে সব সময় মনে রাখতে হবে, সেই অন্যকে সুন্দর ও সঠিক পথে প্রভাবিত করবে। কিন্তু নিজে কখনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। অন্যায়-অসত্যের কাছে নতি স্বীকার করবে না।

লেখক : কলামিস্ট

"