মতামত

রোহিঙ্গা ইস্যু মানবতার বিষফোঁড়া

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

২০১৭ সালের আগস্টের মাসটি ছিল সারা বিশ্বে আলোচিত মাস। সবশেষ সে থেকেই বিশ্বে আলোচনায় আসে মিয়ানমার। সেই সঙ্গে মানবতা দেখানোর কারণে শেখ হাসিনার সরকারও সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়। প্রশংসিত হবে না কেন? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার যে মানবতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে।

মিয়ানমারে সু চি সরকার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ করেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীতে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের যে মৌলিক অধিকার, তা-ই মানবাধিকার। যেমন : নিরাপত্তা, বাকস্বাধীনতা, সম্পত্তির মালিকানা, ধর্ম পালনের অধিকার। এসব অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পৃথিবীতে প্রথম লিখিত যে সনদ হয়েছিল, তার নাম ম্যাগনা কার্টা। ম্যাগনা কার্টা কাগজে-কলমে থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত প্রথম লিখিত সনদ ‘মদিনা সনদ’ বলে উল্লেখ করা হয়। মানবাধিকার, মানবিকতা, মানবতা, বিবেক একই সুতোয় গাঁথা। মানবতা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয় যে, কাউকে দেওয়া যাবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারে যে অমানবিক আচরণ হয়েছে বা হচ্ছে, তাতে মানবতার ওপর অমানবিক আরচণই বটে। প্রশ্ন উঠছে-বিশ্বমানবতা কী করছে? আর জাতিসংঘ কি এখন অন্ধ হয়ে গেছে? ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের অং সান সু চির নোবেল পুরস্কার নিয়েও এখন সমালোচনা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, তিনি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নন। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০১৬ সালেও সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। সে সময় অনলাইনে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন লক্ষাধিক মানুষ। চেঞ্জ ডট অর্গে এ আবেদনটি করা হয়। সবশেষে হাতে গোনামাত্র কয়েকটি রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের সব রাষ্ট্রই মিয়ানমার সু চি সরকারের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চায়।

বর্তমানে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে। প্রায় ৩০০ বছর রোহিঙ্গাদের আবাস ভূমি ২২ হাজার বর্গমাইলের রোহাঙ্গা একটি স্বাধীন ভূখ- ছিল। তৎকালীন বার্মা ও বর্তমানের মিয়ানমারের বৌদ্ধ রাজার দখলের মধ্য দিয়ে এটি প্রথম পরাধীন হয়। এরপর ব্রিটিশরা মিয়ানমার দখল করলে রোহাঙ্গাও ব্রিটিশ শাসনের অধীন হয়। ব্রিটিশরা মিয়ানমার দখল করে একটি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি করেছিল; কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ওই তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম ওঠানো হয়নি। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। এ সময় মিয়ানমারের সংসদে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক শাসক জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখলের পর রোহিঙ্গাদের নাম জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় না থাকায় তাদের বিদেশি হিসেবে গণ্য করে নিপীড়ন-নির্যাতন চালাতে থাকে। ১৭৮৫ সালে যখন বৌদ্ধ রাজা আরাকান দখল করেছিলেন, তখন যেমন রোহিঙ্গারা পালিয়ে চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল, ঠিক একইভাবে সামরিক শাসকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ রোহিঙ্গারা বারবার বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছে।

মিয়ানমারের হত্যাযজ্ঞ আর নির্যাতনের অনেক পর হলেও জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা হত্যাকারীদের বিচার চেয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ‘রোমহর্ষক নিধনযজ্ঞ’-এর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার করতেই হবে। গত বুধবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক উন্মুক্ত আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি। মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের এক প্রতিবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করে এটাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞকে গণহত্যা অভিহিত করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ ছয় জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার এক সত্যানুসন্ধানী দল।

দীর্ঘ একটি বছর আন্তর্জাতিক পর্যায় রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা অনেক কিছুই হয়েছে। কিন্তু কতটুকুু বাস্তবায়ন হয়েছে? রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করাটা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ভাবনায় রাখতে হবে, জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের সম্মতি ছাড়া প্রত্যাবাসন শুরু করলে বৈশ্বিক অঙ্গনে তা একতরফা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য বাংলাদেশকে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে এ জন্য আন্তর্জাতিক কমিউনিটিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। গত ৩০ অক্টোবর ঢাকায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। কিন্তু জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার বিরোধিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়।

কূটনীতিকদের মতে, মিয়ানমারে এখনো সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন মোটেই নিরাপদ নয়। অবশ্য প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুকদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। বলার অপেক্ষা রাখে না, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সর্বোপরি বাংলাদেশও এ বিষয়টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে বিপদ মাথায় নিয়ে যে রোহিঙ্গারা সেখানে ফিরে যেতে চাইবে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রত্যাবাসন একটি জটিল প্রক্রিয়া, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মিয়ানমানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব। প্রত্যাবাসনের সুযোগ নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে মিয়ানমার সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে এর আগে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে জানানো হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সুশাসন ও আইনি পদক্ষেপ।

সবচেয়ে বড় কথা-ফিরে যাওয়ার পর আবার নিগৃহীত হলে এবং তাদের ওপর হামলা হলে তারা যে আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কাজেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আগে সে দেশে তাদের নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে পাবলিক পলিসিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করে সেই বৈঠকে বলা হয়েছিল, উত্তর রাখাইন রাজ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য যাতে না হয়, সে জন্য সেখানকার সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অতীতে আসা রোহিঙ্গাদের বড় অংশ এখনো মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেনি। আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমার সরকারের ওপর এত চাপ সৃষ্টি করলেও সু চির কানে পানি যাচ্ছে না। সবশেষ ১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চির মধ্যে বৈঠকেও এটি আরো স্পষ্ট হয়ে গেল। ওই বৈঠকের আগে মাইক পেন্স সু চির কাছে জানতে চান যারা রোহিঙ্গা সহিংসতার সৃষ্টি করেছেন, তাদের দায়ী করা হবে কি না। আর ওই বৈঠকের আগে সু চির সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স মিয়ানমারে মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের কারণে দেশটির সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছেন।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি এবং সু চির কার্যক্রম সবার কাছেই স্পষ্ট। চুক্তি বাস্তবায়নে দেশটির সেনাবাহিনী কী ভূমিকা পালন করে, এটিও এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে গিয়ে কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বে কি নাÑএ আশঙ্কায় তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। তারা স্বদেশে ফিরে গিয়ে যাতে মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এটা নিশ্চিত করা জরুরি। এটার দিকে খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশে এসব রোহিঙ্গা থাকলে একসময় এরাই আমাদের বিরোধী হতে পারে। একসময় মানবতাই বিষফোঁড়া হতে পারে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন দ্রুত দরকার। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নিয়েও কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাবেÑএটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

msi.khokonp@gmail.com 

"