পর্যালোচনা

সপ্তম ঘাতক ডায়াবেটিস

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শামীম শিকদার

ডায়াবেটিস রোগের সঙ্গে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। প্রতিনিয়ত এ রোগের কথা শোনার কারণে আমাদের কাছে এটি একটি সাধারণ রোগ বলে মনে হতে পারে; কিন্তু এটি এমনই একটি রোগ যা কখনো সারে না। কিন্তু এই রোগকে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের এমন কোনো পরিবার নেই যেখানে ডায়াবেটিস রোগ নেই। ডায়াবেটিস রোগীর দেহের কোষে গ্লুুকোজ পৌঁছাতে পারে না। তখন ওই মানুষের শরীরে ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়। এতে করে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। কার্বোহাইড্রেট বা সাধারণ শর্করা জাতীয় খাবার ভেঙে গ্লুুকোজে পরিণত হয়। আর ইনসুলিন হচ্ছে এক ধরনের হরমোন। এর কাজ হলো এই গ্লুকোজকে মানুষের দেহের কোষগুলোয় পৌঁছে দেওয়া। এরপর সেই গ্লুুকোজ ব্যবহার করে শরীরের কোষগুলো শক্তি উৎপাদন করে। সেই শক্তি দিয়েই রোজকারের কাজকর্ম করে মানুষ। যখন এই গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছায় না তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়।

যেকোনো বয়সের ব্যক্তিরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে যাদের বংশে বিশেষ করে বাবা-মা বা রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস আছে তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বংশগত কারণ ছাড়াও কিছু পরিবেশগত কারণ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া ত্বরান্বিত করে। এ কারণগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত ওজন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা, চর্বি বা তেলযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া, ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫ ঘণ্টার কম ঘুমানো, বয়স চল্লিশের বেশি হওয়া, ধূমপান করা, কর্টিসোল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা, রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকার কারণগুলো অন্যতম।

ডায়াবেটিস বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে টাইপ ওয়ান ও টু বেশি লক্ষ করা যায়। টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তখন রক্তের প্রবাহে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে। এই ধরনের রোগীদের শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সে এ ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব রোগীকে ইনসুলিন ইনজেকশন নিতেই হয়। অন্যথায় রক্তের শর্করা অতি দ্রুত বেড়ে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই রক্তে অম্লজাতীয় বিষক্রিয়ায় অজ্ঞান হয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ১০ শতাংশ এই টাইপ ওয়ানে আক্রান্ত। সাধারণত মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ ব্যক্তিরা টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও যাদের ওজন বেশি এবং যাদের বেশিরভাগ সময় বসে বসে কাজ করতে হয় তাদেরও এই ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই শ্রেণির রোগীর বয়স অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৩০ বছরের ওপরে হয়ে থাকে। আজকাল ৩০ বছরের নিচেও এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলছে। এদের শরীরে ইনসুলিন তৈরি হয়। তবে প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন না দিলে টাইপ ওয়ান রোগীর মতো এদের বিষক্রিয়া হয় না। অর্থাৎ এরা ইনসুলিন নির্ভরশীল নয়। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও নিয়মিত ব্যায়ামের সাহায্যে এদের চিকিৎসা করা সম্ভব। বিশেষ কিছু এলাকার লোকেরাও এই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অন্যতম। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ইনসুলিন প্রয়োজন বলে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতি বছর বিনামূল্যে সাড়ে ১১ কোটি টাকার ইনসুলিন ফ্রি দিয়ে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ১৯৮০ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ কোটি। ওই সময় ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার হার ছিল ৫ শতাংশেরও কম কিন্তু ২০১৪ সালের তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া ২০১৬ সালে ডায়াবেটিসের কারণে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) ডায়াবেটিস এটলাস ২০১৭ এর অষ্টম সংস্কারই অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪২ কোটিরও বেশি। আগামী ২০৪০ সালের এটি ৬৪ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে এ রোগীর সংখ্যা ৭৩ লাখের বেশি। এছাড়া ১০০ জনের মধ্যে ২০ জন গর্ভকালীন নারীই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর একবার আক্রান্ত হলে পরবর্তী গর্ভধারণের সময় ৬৫ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাদের পরে ৫০ শতাংশ টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার শঙ্কা থাকে। এসব মায়ের জন্ম নেওয়া শিশুদের টাইপ টু ডায়াবেটিস হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নারীদের মধ্যে এ হার ২৫ শতাংশ। পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় ৮৩০ জন নারী গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিরোধযোগ্য জটিলতায় মারা যান। এদের মধ্যে ৯৯ শতাংশ মায়ের মৃত্যু ঘটে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে দেশে অর্ধেক রোগীই জানেন না তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণে সবাই স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনাও সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র ২৫ ভাগকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে পেরেছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। যেখানে একজন ডায়াবেটিস রোগীর গড় খরচ ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে বর্তমানে গ্রামে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ ভাগ থাকলেও শহরে ১০ ভাগ মানুষ। তাছাড়া আরো ১০ শতাংশ লোক ডায়াবেটিস হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হচ্ছে বাল্যকাল থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত খেলাধুলা, পরিমিত ব্যায়াম, নিয়মিত হাঁটা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, মানসিক প্রশান্তি, ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা, রক্তচাপ পরীক্ষা, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন সম্পর্কিত চেকআপ ইত্যাদির মাধ্যমে ডায়াবেটিসজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক মনোভাবও যথেষ্ট ভূমিকা পালন করবে। তাই প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রত্যেকের নিজেস্ব অবস্থান থেকে সচেতন থাকতে হবে।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

shamimsikder488@gmail.com

"