মতামত

সংলাপ সফল না হলেও...

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

অবশেষে সংলাপ সফল না হয়ে ফলপ্রসূ হয়েছে। ফলপ্রসূ বলছি এ কারণে এখন মনে হয় সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতামূলক একটা সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিএনপি যে গো ধরে বসেছিল, তাদের ৭ দফা দাবি না মানলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। তা থেকে সরে এসে তারা নির্বাচনমুখী বলে মনে হচ্ছে। তাদের মূল দাবিগুলো ছিল বেগম জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, সংসদ বিলুপ্ত করা, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং একটা বেসরকারি তদারকি সরকার গঠন। এই চারটি দাবির কোনোটি সরকারি দল মেনে নেয়নি। কেননা এই দাবিগুলো মানতে হলে সংবিধান অমান্য করে তা করতে হবে। আর ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাবহির্ভূত কোনো কিছু করতে রাজি নন। বিএনপি বার বার নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে আলোচনায় বসার জন্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। সরকারি দলের বক্তব্য হচ্ছে পূর্বশর্ত দিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করে কোনো আলোচনায় বসতে তারা রাজি নন। অবশেষে সরকারি দলই আপাতত বিজয়ী হয়েছেন বলে মনে হয়। যদিও সরকারি দল অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে ঐক্যফ্রন্টের প্রদত্ত ৭ দফার বেশকিছু দফা মেনে নিতে রাজি হয়েছেন। তবে সর্বশেষ ঐক্যফ্রন্ট প্রদত্ত ৪ দফার একটাও মেনে নেয়নি। দুইবার সংলাপ হয়েছে। দুইবারই সন্তোষজনক সমাধানে আসা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে সরকারি দল বসতে রাজি না হলেও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন যখন ঐক্যফ্রন্টের প্রধান হিসেবে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তখন থেকে বরফ গলতে শুরু করে। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর আকুল আবেদন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস। অপরদিকে, ড. কামাল হোসেনের নির্বাচনকালীন সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান ও শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সরকারি দল এবং বিরোধী দল প্রায় সমঝোতামূলক অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। এরূপ বাস্তব অবস্থানের ওপর ভর করেই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে মোটামুটি আস্থাবান হয়ে এই তফসিল ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানান। নির্বাচন কমিশন কালবিলম্ব না করে তফসিল ঘোষণা করেছেন। আর তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার কয়েক ডজন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ করেছেন এবং সে কারণেই সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়েই যথাসময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি দল থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল যে, বিরোধী দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সরকারের উদ্যোগ এমনই ছিল যে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও প্রায় অংশগ্রহণকারী একটা নির্বাচন করতে সক্ষম হবে। তারা ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন, বিরোধী দলের অনেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চান। কিন্তু খালেদা-তারেক অনুগত বিএনপিরা তা হতে দিচ্ছে না। তাই কৌশলগত কারণে হঠাৎ করে সংলাপে রাজি হয়ে আলোচনাকে এমন ফলপ্রসূ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন যেসব বুঝতে পেরেছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে কোনো লাভ হবে না। বিএনপির নেতৃত্ব বুঝতে ভুল করেনি যে এবার নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাইরে থাকলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকেই ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সব দল ও উপদলের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি নির্বাচনে যেতে রাজি হয়েছে।

ড. কামাল হোসেনের দফা একটি তা অবাধ ও সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তাই ঐক্যফ্রন্টে যোগদান করে ড. কামাল হোসেনের ভাবমূর্তি বেশকিছুটা ক্ষুণœ হলেও মনে হয় তিনি ঐক্যফ্রন্টের প্রধান হওয়ার কারণেই সংলাপে বসার অন্যতম কারণ। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে একদিকে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে অপরদিকে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। তারা ভালো করেই জানেন, নির্বাচনকালীন রাজপথে আন্দোলন করা, নির্বাচন কমিশনের প্রদত্ত বিধি-নিষেধের পরিপন্থী। নির্বাচনকালীন কোনো ধরনের আন্দোলন করা নির্বাচন বিধিমালা সম্মত নয়। আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বানচাল করার জন্য যদি কোনো সহিংস তৎপরতা চালানো হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশ প্রদান ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর। সরকারের বেশি কিছু করার নেই। নির্বাচনকালীন সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তাই নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করবেন। আর তা করতে ব্যর্থ হলে দেশ ও জাতির কাছে নির্বাচন কমিশনকে জবাবদিহি করতে হবে। সব মহল এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করে দিয়েছেন। এখন বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি যদি এরূপ চিন্তা-ভাবনা করে থাকে নির্বাচনে তো তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত, তাই নির্বাচনকে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য করার জন্য তারা যদি ২০১৪ সালের মতো জ্বালাও পোড়াও নীতি অনুসরণ করে তাহলে দেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে এ কথাও ঠিক সরকার ও বিরোধী দলের অনেকেই সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে চান। যেসব অপশক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীরা নির্বাচন প্রতিহত করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে চায় জনগণ তাদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না। প্রয়োজনে প্রতিটি বুথ পাহারা দেবে। তাই নির্বাচনকে ভন্ডুল করা বা নির্বাচনের রায়কে বিতর্কিত করে অগ্রহণযোগ্য করা খুব সহজ হবে না। বিদেশিরা যারা বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর প্রখর দৃষ্টি রেখেছেন তাদের অনেকের ধারণা ছিল বিরোধী দলকে বাইরে রেখে সরকার একতরফা নির্বাচন করবে। তাই সব কয়টি দল যখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে সম্মত হয়েছে তখন কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকার বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করবেন এরূপ বাস্তবতা আর নেই। বরং সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিদেশিরা তাদের সদিচ্ছা পূরণ হয়েছে বলে মনে করবেন।

এখন ক্ষমতাসীন দলের কর্তব্য হচ্ছে অসীম ধৈর্য, সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সফল করা, বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া নির্বাচন বিরোধী কোনো কার্যকলাপে লিপ্ত না হওয়া। যত ধরনের অনিয়ম বাংলাদেশে হয়ে থাকে তা থেকে বিরত থাকা। বিরোধী দলের শর্ত, উসকানিমূলক কথায় সহনশীল হওয়া। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাত্রাতিরিক্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা। আর নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে প্রদত্ত আইন অনুযায়ী সুচিন্তিত ও সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রভাবিত না হয়ে সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেওয়া যে বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। আর এরূপভাবে কয়েকটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হবে। নির্বাচন মানেই সরকার ও বিরোধী দলের সংঘাত, রক্তপাত, সংখ্যালঘুর ওপর হামলা, নিরীহ ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে না দেওয়া ব্যালটবাক্স ছিনতাই করা, জোরপূর্বক সিল মেরে বাক্সভর্তি করা, কেন্দ্র দখল, নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়া এর সবকিছুই পরিবর্জন করে বাংলাদেশে একটা অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব। আর দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা এটা করতে সক্ষম হলে আগামীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবার কান্ডারি হবেন। যারা মনে করেছিল শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না তাদের অবাক করে দিয়ে হয়তো জননেত্রী শেখ হাসিনা এরূপ একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়ে তিনি আবারও দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

"