মতামত

সবকিছুই ঘরের শোভা

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জি. কে. সাদিক

‘সংবিধান, আইন-আদালত, বিচারক সবই আছে কিন্তু আমরা ওসবের ধারধারি না, আমরাই তো ওসব বানাইÑকেবল ঘরের শোভা। বিরোধীপক্ষ শায়েস্তা করতে ফলদায়ক আর ক্ষমতায় থাকাকালীন সব অপকর্ম হালালের কায়দাসমেত গলাবাজির জন্য পারফেক্ট করে সাজানো।’ এ কথাগুলো আমাদের দেশের সাধারণ পাবলিকের না। এগুলো যারা সংবিধান ও আইন রচে, আদালত বানায় ও পছন্দসই বিচারক নিয়োগ দেয় তাদের। আবার যদি কখনো বিচারক ঠিকমতো আজ্ঞা পালন না করে বা তেড়িবেড়ি করে অথবা ভালো না লাগলে তাহলে বদলে ফেলে। ‘প্রজায় যদি অন্যায় করে বিচার করে রাজায়, যদি রাজায় করে অন্যায় বিচার কে?’ কথাটাকে মামুলি একটা প্রবাদ মনে করে ফেলে দেওয়ার জোঁ নেই। দেশের ও বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ কথার বাস্তবতা বোঝা দরকার। সাধারণ পাবলিক বড়জোর অভাবের তাড়নায় বা স্বভাবভ্রষ্ট হয়ে কিছু মামুলি অপরাধ-অপকর্ম করে। ‘পুকুর চুরি’ ও ব্যাংক ডাকাতি সব নেতা আর বড় মাথাওয়ালা আমলাদের কাজ। এমন রিকশাওয়ালা খুব কম মিলে যে উল্টোপথে রিকশা চালায়। যদি কোনো কারণে চালায়ও রিকশা আটকানোর জন্য ট্রাফিক পুশিলকে গালি দেয়, আপমান করে বা হুমকি দেয়, এমন রিকশাওয়ালা মিলবে না। ওসব আমাদের এমপি-মন্ত্রীরা হামেশাই করেন। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময় ভিআইপিদের যে পরিমাণে ‘ভুয়া পাজেরো’ দেখা গেছে, সে তুলনায় লাইসেন্স ছাড়া রিকশা, অটোভ্যান, পিকআপ কম আছে। আমাদের সংবিধানের ১১ ভাগে ৪টি শিডিউলের ১৫৩টি অনুচ্ছেদে কী আছে, তা নিয়ে দেশের ‘পা ফাটা জনতা’ মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বেশি একটা বোধ করে না। বলতে গেলে তাদের মাথা ঘামানো তেমন প্রয়োজন নেই, তারা প্রয়োজন মনেও করে না। তিনবেলা আহার, মাথা গোঁজার ঠায়, গতর ঢাকার বস্ত্র আর বিবি-বাচ্চা নিয়ে শান্তিতে জীবন কাটাতে পারলেই তাদের দুনিয়াবি জীবন সফল।

‘খায় চান মিঞা, মোটা হয় জব্বার’Ñকে খাচ্ছে, কে মোটা হচ্ছে আর কে শুকিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের দেশের মানুষ মাথা ঘামায় কম। স্বীয় অবস্থা নিরাপদ হলে দেশের ও দশের খোঁজ বেশি একটা দরকার নেই। তার ওপর যদি তাদের পেট শান্তি থাকে, তাহলে বিন্দাস। তেমনি রাজনীতিবিদদের মনটাও শান্তিতে থাকে যখন গদিটা তাদের দখলে থাকে ও ঠিকমতো নিশ্চিন্তে খেতে পারে এবং তাদের শান্তির চোখ দিয়ে দেশের সবার শান্তি মাপে; দেশে তখন গণতন্ত্র কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে টইটম্বুর করে; দেশ চলে উন্নয়নের উড়োজাহাজে। যত ঝামেলা আছে সব পাকায় বিরোধী দল। বেশি নাড়াচাড়া করে বিল্ডিং ভাঙা থেকে মশার কামড় বেড়ে যাওয়া সব তাদের চক্রান্ত। আর যারা আমাদের দেশে বিরোধী দলে থাকে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সরকারকে গদিচ্যুত করে আবার ক্ষমতা দখল করা। তাহলেই দেশের মঙ্গল ও সেবা ষোলোকলায় পূর্ণ করতে পারবে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বড় সম্বল ভণিতা ও মিথ্যাচার করার দুর্নিবার ক্ষমতা। যে দেশে স্বাধীনতার অর্ধশতক সময় পরও কে স্বাধীনতার প্রতি ইমানওয়ালা ও ইমান ছাড়াÑএ নিয়ে বিতর্ক হয়, তখন আর বলার কিছু থাকে না। একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, যা সাবেক উপনিবেশ থেকে অর্ধশতক বছর আগে রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছে। সে রাষ্ট্রকে অর্ধশতক পরও পাকিস্তানের সঙ্গে মেলানোর আশায় এ দেশে কেউ রাজনীতি করে এমন কথা যদি পাবলিক ঠ্যালায় পড়ে মেনে নেয়ও, তবু তারা বিশ্বাস করে না। আপাতত যাদের বিবেকের বাতি এখনো নিভে নাই, তারা বিশ্বাস তো দূরে থাক এ কথা মেনেও নেবে না। আধুনিক পৃথিবীতে কেউ বোকা নাÑবুঝটা একটু কম আর বেশি। পাবলিক সবই বোঝে কিন্তু মুখ খুললে বিপদ তাই ‘আমজনতা’ মূক। ‘আমরা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী’Ñস্লোগানে যখন কোনো সংগঠন দাঁড় করানো হচ্ছে, তখন এর মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে? যারা ওই সংগঠনে নেই বা তাদের কার্যক্রম সমর্থন করে না বা কোনো কারণে তাদের বিরোধিতা করে, তাহলে তারা কি স্বাধীনতার চেতনায় অবিশ্বাস করে? সাংবাদিক, সাহিত্যিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও এমন আজব নামে ও স্লোগানে সংগঠন আছে। তাহলে এসব নাম ও স্লোগান কি তেলমারার জন্য না হুজুগের বশে করা? এই যে আধুনিকতা, প্রগতিশীলতা ও গণতন্ত্রের রং মেখে, ধুলো ছিটিয়ে জনতাকে বোকা বানানো হচ্ছে আবার স্বার্থের জন্য কাউকে বা বলির পাঁঠা করা হচ্ছে, তার পেছনে কোন উদ্দেশ্য লুকায়িত আছে? যে সময় দেশের উন্নয়নের জন্য স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন, ঠিক সে সময়ই সুকৌশলে জাতীয় জীবনের অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা হয়েছে, হচ্ছে।

মানুষের কামনাই দুঃখের মূল- বৌদ্ধ দর্শনে এমন একটা কথা আছে। কোরআনে আছে, ‘পৃথিবীতে জলে ও স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তা মানুষের নিজেদের কর্মফল।’ (সুরা রুম-৪১) বৌদ্ধ দর্শন আর কোরআন থেকে যা পাই, তা যদি বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে একটু চিন্তা করি, তাহলে আসমান-জমিন ও মাটি ফুড়ে যে ভুঁইফোর সংকট আমাদের সমাজে ও জাতীয় জীবনে দেখা দিচ্ছে, তা আমাদের অতিমাত্রিক কামনা পূরণের তেলামি ও অপকর্মের ফল। পকেটের টাকা নিত্যদিন কীভাবে হারায়, সেটা নিয়ে মন্ত্রিসভায় মিটিংয়ের আগে পকেটের তলায় কাটা-ফাটা আছে কি না, তা দেখে নেওয়া দরকার। হতাশায় ‘হায়-মাতলাম’ করা কিছু ঝানু মাথাওয়ালা বুদ্ধিজীবীর মূল কথা হলোÑবাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা হলো ধর্ম। বলতে গেলে ধর্মটাকে যদি বাড়তি চুলের মতো টান মেরে তুলে ফেলা যায়, তাহলেই আমাদের দেশটা তড়তড়িয়ে উন্নয়নের তালগাছের আগায় উঠে যাবে। তালগাছের আগায় উঠবে না কি বাঁশঝাড়ের আগায়, তা পরের কথা। তাহলে ধর্মই কি আমাদের সামাজিক ও জাতীয় জীবনের সংকটগুলোর জন্য প্রধান আসামি? ‘লা-জওয়াব’ হয়ে দাঁতপাটি বের করে হাঁ হয়ে থাকলে চলবে না। জাতীয় জীবনের মূল সমস্যা খুঁজে বের করে শক্তহাতে সমস্যার শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে হবে।

কবিগুরু বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আমাকে কেউ যদি বিষ্ণুদের কবিতার অর্থ বোঝাতে পারবে, তাকে আমি শিরোপা দেব।’ তেমনি এটা বলা যায়, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, লক্ষ্য এবং দেশের উন্নয়নে তা কতটা উপযোগী, এটা বোঝাতে পারে, তাকে আমি পুরস্কৃত করব। ধর্মনিরপেক্ষতার ঘণ্টি গলায় নিয়ে কীভাবে ধর্মের ছায়ায় শান্তি খোঁজে, তার বাস্তব উদাহরণ দুর্লভ হতো যদি না বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল থাকত। সংবিধানের মূলনীতি চতুর্দ্বয়ের মধ্যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ আজ ছটফটিয়ে মরছে। আজরাইলটা কে? আমাদের দেশে ‘কথিত ধর্মনিরপেক্ষ’ রাজনৈতিক দলগুলো। গণতন্ত্র এখন কর্তৃত্ববাদের কবলে। অধুনা আমাদের দেশের যেকোনোভাবে নির্বাচন করাটাই চূড়ান্ত গণতন্ত্র মনে করা হচ্ছে। একবার ক্ষমতায় বসতে পারলে জনগণের নাম করে, যা ইচ্ছা করে নেওয়া যায়। যত বিকৃতপনা আছে, সব নির্লজ্জের মতো দিবালোকে সর্বক্ষণ ডিসপ্লে করে উন্নয়নের ফিরিস্তি দেওয়া যায়। সব যখন এত সহজেই চলে, তখন ওসব সংবিধান, আইন-আদালত, বিচার সব প্রহসন নয় তো কী? আমরা আমজনতা ভক্তিবাদের অন্ধ অনুসারী, শাসকের নির্যাতনের ভয়ে নিজের অধিকার চাইতে ভয় পাই। দেশে যাই হোক ‘আমি জুঁত করে থাকব’ কথা বললে বিপদ। কারণ আমাদের অন্যায়ের বিচার হবে, কিন্তু আমাদের বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সামান্ত প্রভুরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই আমাদের রীতি।

ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ হলো তা সফল হয়নি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আমাদের জাতীয় ভাগ্য উন্নয়ন হবে, নীতিহীনতার পরাজয় ঘটবে ও গণতন্ত্র মুক্তি পাবেÑএমন আশা খুব কম। যে ব্যক্তি ও দলগুলো ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্টে আছে, তাদের সব কটারই অতীত সবার জানা। তাই এই যে কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, সবই অবৈধ কর্ম হালাল করার জন্য চোখে ধুলো দেওয়ার বৈধ কাজ ছাড়া বেশি কিছু না।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

sadikiu099@gmail.com

 

"