প্রযুক্তি

শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষিত

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

একসময় বিমানে আকাশে উড়াল দেওয়া ছিল স্বপ্ন। এখন সেই স্বপ্নের চেয়েও অনেক বেশি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে মানুষ, পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুঠোয় বন্দি। মানুষের জীবিকাসহ দৈনন্দিন সব কাজেই এখন প্রযুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহার হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করবে মনুষ্যসৃষ্ট রোবট। রোবটের পূর্ণ ব্যবহারে মানুষ কর্মহীন হবে এমন আশঙ্কাও করছেন অনেকে। প্রযুক্তির এই দ্রুত প্রসারের ধারাকে প্রযুক্তিবিদরা বলছেন ‘বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’। কিন্তু বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত তা আলোচনার দাবি রাখে।

সম্প্রতি খবর প্রকাশ হয়েছে, চীনে রোবট দিয়ে টিভির খবর পাঠ করানো শুরু করেছে। এটি বিরতিহীনভাবে খবর পাঠ করতে সক্ষম। পাশাপাশি ব্র্যাকিং নিউজও পাঠ করবে এই রোবট। ভবিষ্যতে রোবট দিয়ে যদি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদ পাঠ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে সংবাদ পাঠক-পাঠিকা হিসেবে এখন যারা কর্মরত, তাদের ভাগ্য অনিশ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। একসময় পৃথিবীতে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতায় প্রযুক্তির জগতে প্রবেশ ঘটে। সময়ের বিবর্তনে তা কয়েকধাপ অতিক্রম করে বর্তমানে রোবটের যুগে পৌঁছায়। এ পর্যায়ে আসতে প্রযুক্তির বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাসীর প্রথাগত জীবনমান ও কর্মকৌশলেও আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের পর বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা ঘটে। আর ইলেকট্রনিকস ও ইনফরমেশন টেকনোলজির বিস্তারের মধ্য দিয়ে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের আগমন ঘটে। সর্বশেষ কৃত্রিম মানব তথা রোবটিক মানব তৈরির মধ্য দিয়ে বিশ্ব অনুপ্রেবশ করল বহুল প্রত্যাশিত ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’-এর যুগে। এ বিপ্লব মানবসভ্যতায় যেমন সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থায় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তখন সমগ্র বিশ্বে উৎপাদন ব্যবস্থা চলে যাবে দক্ষদের হাতে। তখন প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানই হবে ব্যবসায়িক পুঁজি। অদক্ষদের জন্য পৃথিবীতে বেঁচে থাকার স্থান সংকোচিত হবে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ব্যাপকসংখ্যক মানুষ কর্ম হারাবে।

উন্নত ও আয়েশি জীবনমানের পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও। তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব আজ সমগ্র বিশ্বকে এক সমাজে পরিণত করেছে। এ প্রযুক্তির আশীর্বাদে এখন পুঞ্জীভূত পুঁজির চেয়ে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও এর বহুমাত্রিক প্রায়োগিক কৌশলকে মূল পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আজ বিশ্বব্যাপী আউটসোর্সিং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এখন বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে সব নাগরিক সুবিধা ঘরে বসেই মানুষ পাচ্ছে। ঘরে বসে শুধু ৯৯৯ এই নম্বরে ফোন দিয়ে বিপদ থেকে আসান পাচ্ছে মানুষ। লাঙলের স্থলে এসেছে যন্ত্রচালিত ট্রাক্টর। মূলত এ বিপ্লবের যুগে উন্নয়ন ও স্বাচ্ছন্দ্যনির্ভর প্রাপ্তিটা নির্ভর করবে আমরা কতটা বিপ্লবের সুযোগকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজে লাগাতে পারছি তার ওপর। তাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই প্রান্তে এসে এর গুরুত্ব অনুধাবন করে জনমত গঠনের জন্য দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইডিইবি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গণপ্রকৌশল দিবসের মূল প্রতিপাদ্যই নির্ধারণ করা IR4. for Economic Development & Comfortability’ অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ৪র্থ শিল্প বিপ্লব। তাদের অভিমত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পরিবর্তন হবে খুব দ্রুত। কেউ কোনো উদ্ভাবন নিয়ে দ্বিধায় থাকলে তার স্থান অন্য কেউ দখল করে নেবে। অধিকাংশ উদ্ভাবনী ব্যবসার ব্যাপারে ‘এখনই অথবা কখনই না’ ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটবে খুব দ্রুতগতিতে। নতুন প্রযুক্তি বয়ে আনবে আরো নতুন নতুন প্রযুক্তি। নবপ্রযুক্তির বিকাশ, উদ্ভাবন, প্রয়োগ এবং সম্প্রসারণ গাণিতিক নয়, জ্যামিতিক হারে হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ঢেউ আঘাত হানছে অর্থনীতি, সমাজ, ব্যবসা ও ব্যক্তিজীবনে। নব উদ্ভাবিত যন্ত্রগুলো পরস্পর কথা বলবে, জানবে পরিস্থিতি কী কী করতে হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। মানুষ সরলরেখায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত। এমনি অবস্থায় চতুর্থ বিপ্লবের আগমনী প্রযুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এ বিপ্লবের প্রভাব মানবসভ্যতাকে প্রভাবিত করবে ব্যাপকভাবে। উন্নত বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্ব চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, ১৯৭০ সালের ৮ নভেম্বর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিই) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনকে সামনে রেখে আইডিইবির সব কার্যক্রম দেশ ও জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হয়। দেশের রাষ্ট্রীয় অর্থব্যয়ে তৈরি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা দেশ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে আইডিইবির প্রতিষ্ঠা দিবসকে দেশ ও জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছে। আইডিইবির প্রতিষ্ঠা দিবস প্রতি বছর গণপ্রকৌশল দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হয়। উন্নয়ন দর্শন, জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি ত্বরান্বিত করতে আগামীর প্রযুক্তিগত ও আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে প্রতিষ্ঠা দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে আইডিইবির পক্ষে আহ্বান করা হয়েছিল; তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্রযুক্তি চিন্তাহীন রাজনীতি শোষণের হাতিয়ার, জাতীয় উন্নয়নে এডহকইজম নয়Ñসুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা চাই, সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরস্থ পানি ব্যবহার কর, উন্নয়নে জাতীয় ঐকমত্য চাই, জীবন ও উন্নয়নের জন্য পানি, জীবন ও জীবিকার জন্য কারিগরি শিক্ষা, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন উন্নয়নÑউৎপাদনে ইতিবাচক আন্দোলনের সংস্কৃতি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি টেকসই উন্নয়নে সহায়ক, সচল নদীÑসচল অর্থনীতি, পরিবর্তনের জন্য প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, প্রযুক্তিতে গণমানুষের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণমুখী তথ্যপ্রযুক্তিÑবদলে দেবে অর্থনীতি, কৃষিজমি রক্ষা করÑরিকল্পিত গ্রাম গড়, গণমুখী প্রযুক্তিই-গণমানুষের মুক্তি, জীবন-জীবিকা সমৃদ্ধির জন্য দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, দক্ষতা সংস্কৃতিÑজাতীয় সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও দক্ষতায়-মুক্তি, সমৃদ্ধি বিল্ড স্কিল বাংলাদেশ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় বিশ্বমানের টিভিইটি প্রভৃতি।

বিশ্বে প্রযুক্তির নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বাংলাদেশের সামনে অনেক সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে বৈশ্বিক কর্মবৈচিত্র্যতার নিরিখে দেশের কর্মক্ষম মানুষকে অধিকতর সৃজনশীল ও দক্ষ করার বিকল্প নেই। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে ভর করে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন, উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার সরকারের নানামুখী কর্মপ্রচেষ্টা ও শ্রমনিষ্ঠ মানুষের প্রচেষ্টায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে এখন মধ্যম আয়ের পথে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয় প্রায় ১৮০০ ডলারে উপনীত হয়েছে। বহুবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বে¡ও জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭.৬৫ অর্জন করেছে। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, নারী-পুরুষের সমক্ষমতা অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থান, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত ও মোট জনগোষ্ঠীর ৭৫ ভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নতির ফলে এখন দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের জন্য শ্রেষ্ঠ স্থান হিসেবে মনে করছেন বিদেশিরা। এই সম্ভাবনা ও সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য বিশ্বকর্মের বৈচিত্র্যতায় মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প আছে বলে আমাদের জানা নেই।

ইতোমধ্যে আইডিইবির পক্ষ থেকে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার ২০ ভাগে, ২০৩০ সালে ৩০ ভাগে ও ২০৪০ সালে ৫০ ভাগে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করেছে পর্যায়ক্রমে কারিগরি শিক্ষাকে ৬০-৬৫ ভাগে উন্নত করা হবে। এবং কারিগরি শিক্ষাকে শিক্ষার মূল স্রোতধারায় আনা হবে। এই বাস্তবতায় জীবনের জন্য শিক্ষা-জীবিকার জন্য কর্মদক্ষতার নীতিকে সামনে রেখে প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, ব্যবসা, উন্নয়ন-উৎপাদন প্রতি স্তরে এর প্রয়োগ অপরিহার্য। কারণ একটি সেক্টরে দক্ষতার ঘাটতি থাকলে অন্য সেক্টরের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সব উন্নয়ন যেহেতু মানবকল্যাণকেন্দ্রিক, তাই দক্ষতার ক্ষেত্রে মানবিক দর্শন থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ দক্ষতার সুফল তখনই সার্থক হয়, যখন দেশ জাতির অগ্রগতিতে সেটি নিবেদিত থাকে এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। এর জন্য ব্যক্তির দায়বদ্ধতা, কর্মকৌশলের নৈপুণ্যতা অর্জন ও যথাযথ প্রায়োগিক মানসিকতা সৃষ্টি, সম্পদের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা, দায় এড়ানো নয়Ñদায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এমনি অবস্থায় ব্যক্তি, সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্রুততার সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট হবেনÑএ প্রত্যাশা সবার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

 

"