নিবন্ধ

মাদকমুক্ত হোক বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী ও শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আর উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। তবে আরো বেশ কয়েকটি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশ পাচার হচ্ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ লাখ। অন্যদিকে সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক ব্যবসায়ী প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা করে। আরো একটি ভয়ংকর চিত্র হচ্ছে, সারা দেশের ছড়িয়ে পড়া ইয়াবার শতকরা ৮৫ ভাগই ভেজাল। যার ফলে এসব ইয়াবা গ্রহণকারী মাদকাসক্তরা নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার মধ্যে কিডনি, লিভার ছাড়াও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও মাদকসেবীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে, তাদের শিক্ষাজীবন হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত, জাতি হারাচ্ছে মেধা। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তা সহজেই অনুমান করা যায়। এ চিত্র আসলে খুবই ভয়াবহ। তবে কেন জানি, এক ক্রিকেট ধারাভাষ্যকারের (নাম মনে হচ্ছে না) একটি কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ক্রিকেটে স্কোর বোর্ড একটি জ্যান্ত গাধা। কোন পরিস্থিতিতে কে কী ধরনের পারফর্ম করলেন, তা বোঝা যায় না! বোঝা যায় না কে কবার জীবন পেয়েছেন...। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন কে! সে রকম মাদকের ভয়াবহতার পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, বাংলাদেশ বা ভারতে পরিসংখ্যান/জরিপের ফল থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ড্রাগ/মাদক হলো এমন বস্তু, যা গ্রহণ করলে ব্যক্তির এক বা একাধিক কার্যকলাপের পরিবর্তন ঘটায়। একটা ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ানির্ভর করে তার রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্যের ওপর। এই ড্রাগ অপব্যবহারের কারণে রোগী তার রোগের জন্য ওষুধের গুণাগুণ পাওয়ার বদলে হয়ে যায় বিষ। তাই অনেক সময় বিষ স্বল্পমাত্রায় প্রয়োগ করলে হয় ওষুধ, কিন্তু বেশিমাত্রা বা অযথা গ্রহণ করলে হয় বিষাক্ত বা শরীরকে নিস্তেজ করে, মৃত্যু ডেকে আনে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই অপব্যবহারের মাধ্যমে মাদকাসক্তির সূচনা হয়।

বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও অপব্যবহারমুক্ত নয়, বাংলাদেশে মাদক সমস্যা এখনো পাশ্চাত্যের মতো ভয়াবহ না হলেও যে হারে মাদকের অপব্যবহার বাড়ছে, তাতে পাশ্চাত্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমাদের দেশের মূল সম্পদ হচ্ছে জনশক্তি, এই জনশক্তির দুই-তৃতীয়াংশই হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ, কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের বড় একটা অংশ আজ মাদক নামক মরণনেশায় আক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের শতকরা ৮০ ভাগ তরুণ ও যুবক। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, দিন দিন ইয়াবা আসক্তদের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। আসক্ত তরুণ-তরুণীরা অধিকাংশ উচ্চ ও মাধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, মাদক ব্যবহারকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বয়সে তরুণ বা টিনএইজ। পশ্চিমা দেশগুলোয় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। আমাদের দেশে জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও এটুকু বলা যায়, এ হার কোনো অংশে কম নয়। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ সময়টি বিভিন্ন কারণে ঘটনাবহুল, চ্যালেঞ্জিং ও সমস্যাসংকুল। শিক্ষা, চাকরি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আধুনিক নগর জীবনের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেকে এ বয়সে হতাশ, বিপথগামী এবং লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়ে। অনেকে এ সময় আত্মপরিচয় সংকটে ভুগে থাকে। এতে তাদের ভেতর মানসিক চাপ বৃদ্ধি, উদ্বেগ, বিষণœতা এবং আচরণগত সমস্যাসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পায়, যা মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক ভীতি ও লজ্জার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা বিষয়টি কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চায় না। ফলে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয় ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

মাদকের সহজলভ্যতা, মাদক চোরাচালান, কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের মনোসামাজিক কারণে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। মাদকাসক্তি থেকে পরে চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে তারা। মাদকের সহজলভ্যতা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। মাদকাসক্তির কারণ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা এবং অপ্রাপ্তি। গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই (শতকরা ৭০-৮০ ভাগ) ধূমপায়ী। এ জন্য ধূমপানকে মাদক গ্রহণের সিঁড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তরুণদের মাদকাসক্তির আরো অনেক কারণ রয়েছে; যেমন : অপরাধপ্রবণ ও মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত সামাজিক পরিবেশ, খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের অভাব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদি। অভিভাবক ও পারিবারের যেকোনো সদস্যের মাদকাসক্তির সমস্যা থাকলে অন্যদের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহু গুণ।

ইয়াবা ট্যাবলেট মাদক হিসেবে তরুণদের বিশেষভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। মাদকদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত এসব বস্তুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ স্থানকে উদ্দীপ্ত করে, যার ফলে সাময়িকভাবে তীব্র ভালোলাগার অনুভূতি হয়। কিছুদিন ব্যবহারের পর সহনীয়তা তৈরি হয়। ফলে একই মাত্রায় আর আগের মতো ভালোলাগা বোধ থাকে না। এ জন্য মাদক ব্যবহারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার ফল হয় দীর্ঘমেয়াদি আসক্তি। ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, সাম্প্রতিককালের গবেষণায় ড্রাগ আসক্ত হওয়ার পেছনে কারণগুলোকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছেÑ১. প্রাথমিক কারণ। ২. সাহায্যকারী কারণ।

প্রাথমিক কারণ ব্যক্তি নিজেই। তার আসক্তিমূলক চিন্তাভাবনা, মনোভাব, দেহ রসায়ন, মানসিক অবস্থা, মূল্যবোধ ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত। বংশানুক্রমিকভাবে মাদকাসক্তির সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। সাহায্যকারী কারণ হিসেবে প্রধানভাবে যেগুলো আসে, তার মধ্যে নেতিবাচক দলগত চাপ, কৌতূহল বা নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের প্রয়াস, নৈতিক শিক্ষার অভাব, হতাশা, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের অভাব, মাদকের সহজলভ্যতা প্রভৃতি। তবে উল্লিখিত সাহায্যকারী কারণগুলোর মধ্যে দলগত চাপ এবং কৌতূহলকেই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দুটির প্রভাব তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাজ করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পিতা-মাতা বা পরিবার। কেননা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ পরিবার থেকেই শুরু হয়। আর সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এটি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ধর্মীয় মূল্যবোধ বা খেলাধুলা মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখতে পারে। সমাজে যারা প্রভাব বিস্তার করেন তাদের এগিয়ে আসতে হবে। এ গ্রুপে কারা আছে দেখে নিতে পারিÑধর্মীয় অনুশাসন বড় ফ্যাক্টর। ধর্মীয় নেতাদের কথা বেশির ভাগ লোকে শুনে থাকেন। এ জন্য ইমাম, পুরোহিত, ফাদার প্রভৃতি ধর্মীয় নেতাদের সময় সুযোগ পেলেই মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সংবাদপত্র/বুদ্ধিজীবী/লেখকরা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। সংবাদপত্রগুলো সমাজের দর্পণ। এখানে বেশি বেশি আলোচনা করতে হবে এ বিষয়ে। সংবাদপত্র বস্তুনিষ্ঠ খবর/লেখার মাধ্যমে জনমত। সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষকদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী আইডল হিসেবে মনে করে থাকে। ক্লাসে বা অন্যত্রে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন শিক্ষকরা। রাষ্ট্রযন্ত্র যারা পরিচালনা করেন (রাজনীতিবিদ/চাকরিজীবী) তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে সমাজে। সমাজের আমূল পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন এ সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।

চাঁদে অবতরণের পর নীল আর্মস্ট্রংয়ের বিখ্যাত উক্তি ছিল এ রকমÑছোট ছোট পদক্ষেপ একটি বড়/মহৎ কাজ করতে সক্ষম। তাই বলি, শুধু আইন দিয়ে কিছুই করা সম্ভব না। সরকারের সঙ্গে জনগণ তথা উল্লিখিত বিশেষ গোষ্ঠীগুলোকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই মাদকের করালগ্রাস থেকে আমাদের সমাজ থেকে মুক্ত করতে পারব। আমাদের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি আগে প্রয়োজন। আমরা যে যেখানে আছি নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হবে আগে। অন্যের ওপর না তাকিয়ে ধাক্কাটা আমাকে দিয়েই শুরু হোকÑপ্রত্যাশা সবার কাছে।

লেখক : উপপরিচালক (বিআরডিবি)

লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা

abuafzalsaleh@gmail.com

 

"