দুর্ঘটনা

সচেতনতা বৃদ্ধিতে ই-সোসাইটি

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

এটিএম কামরুজ্জামান

ই-সোসাইটি একটি সচেতনতা ও শিক্ষামূলক ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফরম, যা ই-লার্নিং, ই-মেন্টরিং এবং ই-অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তন করবে। এই প্ল্যাটফরমের উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক ইস্যু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামনে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করা, মানুষের চিন্তন-দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।

বাংলাদেশে ই-লার্নিংয়ের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। ই-সোসাইটিতে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক ই-পাঠ্যক্রম পাওয়া যাবে। ই-পাঠ্যক্রমে অংশগ্রহণকারীরা তাদের মতামত ও বিষয়বস্তুর বিশ্নেষণ করতে পারবে। এই মতামত কাক্সিক্ষত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে যেমন ভূমিকা রাখবে, তেমনি যুক্তিযুক্ত আলোচনা চিন্তাগত-ভ্রান্তি দূরীকরণে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ স্থাপন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ, মূল্যবোধচর্চা, নৈতিকতা শিক্ষা, আচরণগত পরিবর্তন ও সৃজনশীল কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্যই-মেন্টরিং সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক ফোরাম গঠন করা হবে এবং নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ মেন্টররা ফোরামের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। ফোরাম ছাড়াও প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে অনলাইনে লাইভ-সেশনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা, ইচ্ছা এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো মেন্টরের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবে। ফলে তাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কমে আসবে; কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ আনয়নে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত ও করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে এবং একইসঙ্গে খোলামেলা আলোচনার কারণে কোনো বিষয়ে দিকভ্রান্ত না হয়ে বিপদগামী পথ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে।

বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আলোচনা, তথ্য-উপাত্ত, সেবাপ্রাপ্তি অথবা প্রাপ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ইত্যাদি বিষয়ে আইনপ্রণেতা, নীতিমালা প্রণয়নকারী সর্বোপরি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংযোগস্থাপন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যাশিত ক্ষেত্রে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার জন্যই অ্যাডভোকেসি কাজ করবে।

দেশবরেণ্য পাঁচজন গুণী ব্যক্তি নিয়েই সোসাইটির উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তাদের নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী ক্রম সাজানো হয়েছে। তার হলেন এক্সিকিউটিভ চেয়ারপারসন ড. অনন্য রায়হান, সাংবাদিক কামাল লোহানী, অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, অধ্যাপক মাহফুজা খানম ও রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান।

ই-সোসাইটির প্রথম কোর্স : বিশাল জনগোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে সচেতন করার জন্য ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের ইতিবাচক আচরণগত অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। যেমন : নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণে শিক্ষার্থীসমাজ, অভিভাবকরাসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ দাবি তুলেছেন। গাড়িচালকদের পাশাপাশি পথচারী এবং গাড়ির আরোহীদের সচেতনতাও জরুরি। এই সচেতনতাবোধ তৈরি এবং উদ্বুদ্ধকরণের প্রয়াসে তৈরি হয় ই-সোসাইটির প্রথম অনলাইন কোর্স ‘রোড সেফটি অ্যাওয়ারনেস কোর্স’, যা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা পছন্দ করেছেন। ইতোমধ্যে ৭৫০ জন কোর্সটি সম্পন্ন করেছেন। কোর্সটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে ইতোমধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং এর ইতিবাচক সাড়ার প্রমাণস্বরূপ দেশব্যাপী বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ই-সোসাইটিতে মেন্টর হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। ইতোমধ্যে ১৮৮ জন শিক্ষক ই-সোসাইটিতে মেন্টর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন এবং ১০০৩ শিক্ষক/শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। এই মেন্টররা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এ ছাড়া নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণে ই-সোসাইটি ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে ই-সোসাইটি তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রথিতযশা গুণী ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠান গুণিজন ট্রাস্ট (যঃঃঢ়://িি.িমঁহরলধহ.ড়ৎম.নফ) ই-সোসাইটির কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে।

আমাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য ই-সোসাইটির সচেতনতামূলক কোর্সে অংশগ্রহণ করবে এবং পরিবারের সদস্যদের সচেতন করবে। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ই-সোসাইটি মানুষের আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছে। শিক্ষণীয় এই প্ল্যাটফরমে তাই শিক্ষাবিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সমাজের সর্বসাধারণের কাছে বোধগম্য এবং গ্রহণযোগ্য নিশ্চিতার্থে বয়স্ক শিখন ও শিশু শিখনের মিশেলে কোর্সগুলো তৈরি করেছে, যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ আকর্ষণীয় ক্ষেত্রগুলো খুঁজে নিতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি কোর্স তৈরি হবে বিভিন্ন দলের অন্তর্ভুক্তিতে যেন সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ করতে এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে আসে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ‘রোড সেফটি অ্যাওয়ারনেস কোর্স-১’-এ যেখানে কোর্সের জন্য তৈরি ভিডিওতে একইসঙ্গে শিশু, অভিভাবক, গাড়িচালক, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সবাইকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এগিয়ে আসতে বলে। প্রত্যেকে ভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্ব করে এবং আশা করা যায় নিজ নিজ দল তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হবে। ই-সোসাইটি তার কোর্সের উন্নয়নে বেঞ্জামিন ব্লুমের শিক্ষামূলক ডোমেইন বিবেচনায় নিয়ে কাজ করেছে। কোর্সটি করার পর অন্তর্নিহিত আবেগ, উদ্দীপনা এবং জাগ্রত বিবেক যুক্তিশীল মনকে সক্রিয় করে সমাজ কাক্সিক্ষত কাজটি করতে অনুপ্রাণিত করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ম্যাকসিম যেমন : সরল থেকে জটিল, জানা থেকে অজানা, নিকট থেকে দূরবর্তী, বিশ্লেষণ থেকে সংশ্লেষণ, মনস্তাত্ত্বিক থেকে যৌক্তিক, ইত্যাদি চিন্তন প্রক্রিয়াকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কনটেন্টের পাঠ্যক্রম প্রণয়নে কনসেপ্ট নোট তৈরি, বিষয়বস্তু নির্ধারণ, তত্ত্ব ও তথ্যের অন্তর্ভুক্তীকরণ, শিক্ষণ পদ্ধতি নির্দিষ্টকরণ, সাধারণীকরণ এবং মানবজীবন সম্পৃক্ততা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ই-সোসাইটির বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বর্তমান কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্ম বা মিলেনিয়াম প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জটিল ও অত্যাধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপখাওয়ানোর জন্য একুশ শতকীয় শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষ হতে হবে। ২১ শতক দাবি করে যে একজন সাক্ষর ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ দক্ষতা ও যোগ্যতার অধিকারী হবে এবং এই দক্ষতাগুলো বহুমুখী, পরিবর্তনশীল এবং নমনীয় হবে (ন্যাশনাল কাউন্সিল টিচার অব ইংলিশ, ২০১৩)। একুশ শতকের দক্ষতাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে প্রয়োগ করা যাবে, যা শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার ও নাগরিক জীবনযাপনে কাজে আসবে। ই-সোসাইটি এই ক্যারিয়ার ও নাগরিক জীবন সংশ্লিষ্ট দক্ষতাগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিভিন্ন কোর্সের মাধ্যমে উন্নয়ন করতে চায়, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেকোনো বাঁধাকে অতিক্রম করতে পারে।

ই-সোসাইটি বাংলাদেশের প্রথিতযশা গুণী ব্যক্তিদের তার কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যারা তাদের জ্ঞান, অনুপ্রেরণা, এবং দৃষ্টিভঙ্গির মিশেলে বিবেকবান সমাজ গঠনে একত্র হয়েছেন। তারা ই-সোসাইটির বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে পর্যায়ক্রমে অংশগ্রহণ করবেন এবং সমাজ পরিবর্তনের অনুরণন সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন।

লেখক : উদ্যোক্তা, ই-সোসাইটি

"