মতামত

১২ নভেম্বর হোক ‘উপকূল দিবস’

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

আজকের বর্তমান, আগামীতে ইতিহাস। ইতিহাস যুগযুগ ধরে তথা অনন্তকাল ধরে মানুষ লালন করে থাকে। আমরা জানি, মানুষ ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেয়, অভিজ্ঞতা অর্জন করে। আর বিশেষ কোনো ‘দিবস’ যার মাধ্যমে প্রতি বছর আগের ইতিহাসকে স্মরণ করে। তেমনি একটি দিবস ‘উপকূল দিবস’। যে দিবসের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেও আজও স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি।

স্বাধীনতা ৪৭ বছরে বাংলাদেশ। মাঝে এসেছে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ ও নেতৃত্বের সংকট। জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। তার পরও পিছিয়ে নেই, বরং বিপুল বিক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে দারিদ্র্যের হার ৮২ থেকে নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১২ গুণের বেশি, ৫০০ গুণের বেশি বেড়েছে বাজেট। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশের বেশি হয়েছে। দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশকে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। বর্তমানে খাদ্য চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই উৎপাদন হচ্ছে দেশে। যার সিংহভাগই উপকূলে। বিশেষ করে সমুদ্রের মৎস্য সেক্টর হচ্ছে উপকূলকেন্দ্রিক। বিদেশনির্ভরতা অনেক কমেছে, কমেছে বাজেট

বাস্তবায়নও। বাজারমূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৪৭ বছরে ৪ হাজার ৯৪৫ কোটি থেকে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকায়। দেশে

এখন নিবন্ধিত কোম্পানি প্রায় ৪ লাখ। আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত আড়াই কোটি মানুষ। প্রায় এক কোটি প্রবাসীও বড় অবদান রাখছে দেশের অর্থনীতিতে। পিছিয়ে নেই উপকূলের মৎস্যজীবী এবং চাষিরা। তারাও জাতীয় আয়ে বিশাল ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটার হাউসকুপারস তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পরিণত হবে বিশ্বের ২৩তম অর্থনীতির দেশে। আর ২০৩০ সালে হবে ২৮তম। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। ২০৩০ সাল নাগাদ ‘নেক্সট ইলেভেন’ সম্মিলিতভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৭টি দেশকে ছাড়িয়ে যাবে, যার অন্যতম বাংলাদেশ। লন্ডনের পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ২০৫০ সালে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। আর বাংলাদেশের কল-কারখানার পাশাপাশি উপকূলের মৎস্য সেক্টরসহ উপজেলার জনশক্তি দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় গণমাধ্যমে, উপকূলের শ্রমশক্তি, মৎস্য খাত সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

দেশের ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চলের মোট ১৯টি উপকূলীয় জেলা ও ১৪৭টি উপজেলার মধ্যে ১২টি জেলার ৪৮টি উপজেলা সমুদ্রের অববাহিকায় অবস্থিত। বাকি ৯৯টি উপজেলা ভৌগোলিকভাবে অভ্যন্তরীণ উপকূলের অংশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ বাস করে উপকূলীয় অঞ্চলে। এদের জীবন-জীবিকা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে মাছ, কৃষি, বন, স্থানীয় পরিবহন, লবণ ইত্যাদির ওপর। এ দেশের উপকূলের জনগোষ্ঠী প্রতি বছর নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন : সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ইত্যাদির মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট নানা রকম দুর্যোগ। যেমন : আর্সেনিক দূষণ, জলাবদ্ধতা, চাষের জমির জলাবদ্ধতা। আর এসবের সঙ্গে সংগ্রাম করেই বেঁচে আছে এ অঞ্চলের মানুষ।

উপকূলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও তাদের জীবন যে কতটা অস্বাভাবিক, সে বিষয়ে খুব একটা খোঁজ রাখা হয় না। ১২ নভে¤¦রের ঘটনা উপকূলবাসী আজও ভুলেনি। এটাই উপকূলবাসীর কাছে নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় দিন। কারণ, ১৯৭০ সালের এই দিনে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল পুরো উপকূল। এ পর্যন্ত ইউকিপিডিয়ার রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ এবং এটি সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকরতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি। এ ঝড়ের তা-বে পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। যার অধিকাংশই জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যায়। এটি ১৯৭০ সালের উত্তর ভারতীয় ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের ষষ্ঠ ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল। এটি সিম্পসন স্কেলে ‘ক্যাটাগরি ৩’ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে ৮ নভেম্বর সৃষ্টি হয়ে ক্রমেই শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তরদিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১১ নভেম্বর এটির গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৮৫ কিমিতে (১১৫ মাইল) পৌঁছায় এবং সে রাতেই তা উপকূলে আঘাত করে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। এতে ওইসব এলাকার বাড়িঘর, গ্রাম ও শস্য ¯্রােতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিল তজুমদ্দিন উপজেলা, সেখানে ১৬৭০০০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭০০০ জনই (৪৬ ভাগ) প্রাণ হারায়।

আগেই বলেছি, ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়, দিবস থেকে মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং দিবসের ইতিকথা স্মরণে রাখে। ঠিক তেমনি মনে রাখার মতো একটি দিন ১৯৭০ সালের ১২ নভে¤¦র। উপকূলে যে ভয়াবহতা হয়েছে, তা মনে এ প্রজন্মের মানুষ জানে না। হয়তো এই দিনে দিবস হিসেবে পালন করলে হয়তো এ প্রজন্মের মানুষ মনে রাখত। তাই আমরাও চাই একটি দিবস। যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’। হয়তো প্রশ্ন জাগবে, এত দিবসের ভিড়ে কেন আবার ‘উপকূল দিবসের’ দাবি? আমার প্রশ্নটা ঠিক এর বিপরীত। এত দিবস থাকা সত্ত্বেও ‘উপকূল দিবস’ নেই কেন? উপকূল অঞ্চলে আমার জন্ম, উপকূল নিয়েই ভাবি। খবর লেখার মধ্য দিয়ে আমি প্রতিদিন উপকূলের কথা মনে পড়ে উপকূলের ভয়াবহতা। কিন্তু একটি দিবস থাকলে অন্তত সবাই মিলে একযোগে উপকূলের কথা বলার সুযোগ পাই! দিন ঠিক করার আগে নিজের কাছে নিজের আরেকটা প্রশ্নÑকেন উপকূল দিবস চাই?

দিবসসমূহ দ্বারা বোঝানো হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বকীয় ও বিশ্বব্যাপী পালিত দিবসসমূহকে। এসবগুলো দিবসের তালিকা নিম্নে প্রণীত হলো। দিবসগুলোর অধিকাংশই প্রায় নিয়মিত পালিত হয় এবং হয়ে আসছে। তবে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে বহুল প্রচলিত কিছু কিছু দিবস নানা কারণে বাংলাদেশে পালিত হয় না। কিন্তু দেশে ২০১৭ সাল থেকে উপকূল দিবসের দাবি তুলছেন উপকূল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম, কোস্টাল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক, আলোকযাত্রা, নৌ-সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ প্রায় ১০০টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটি’। উপকূলে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়, ২০১৫ সালের সিডর, সিডর-পরবর্তী আইলা, হারিকেন, নার্গিস, রোয়ানু, মোরাসহ বিভিন্ন দুর্যোগের আঘাতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ঘূর্ণিঝড় এলেই প্রচারমাধ্যমের ক্যামেরাটা উপকূলের দিকে ছুটে। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে উপকূলে জীবনযাপন কতটা যে অস্বাভাবিক, তা গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে আসে না। এ জন্য বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের স্মরণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষদের সচেতন, উপকূলের সমস্যা আর সম্ভাবনাকে প্রকাশের আলোয় আনার জন্য ১২ নভেম্বরকে ‘উপকূল দিবস’ পালন করা

প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। দিবসটি যখন পালন হবে, তখন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপকূল ফোকাস হবে এবং উপকূল সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। আর দিবসটি শুধু, উপকূলে বসবাসরত ৫ কোটি মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে। ইতোমধ্যে দিবসের জন্য ‘উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটি’র যে আন্দোলন আস্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সাড়া ফেলেছে এবং সামাজিকভাবে যে জনমত তৈরি হয়েছে, তা ইতিহাসে ব্যতিক্রম।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ এখন আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির মধ্য দিয়েই সেটা স্পষ্ট। বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। তাই ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকার মানুষরা দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদের ভূমিকাও কম নয়। আর এসব খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি এনজিওসহ গণমাধ্যমেরও থাকবে বিশাল ভূমিকা। আসুন আমরা সবাই মিলে উপকূলের জন্য একটি দিবস চাই, যার নাম হবে ‘উপকূল দিবস’।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

msi.khokonp@gmail.com 

"