মতামত

হুমকির মুখে শ্রমবাজার

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ব্যাপারেও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। গণবিক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে মিসর ও তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এ মুহূর্তে বিক্ষোভে উত্তাল লিবিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন। আশপাশের অন্যান্য দেশেও যেকোনো সময় ছড়িয়ে পড়তে পারে এর উত্তাপ। গণবিক্ষোভের প্রভাব সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শ্রমবাজারে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। মিসর ও তিউনিসিয়ায় আমাদের শ্রমবাজার বড় না হলেও লিবিয়া ও বাহরাইনে কাজ করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি। ইতোমধ্যেই অস্থির হয়ে ওঠা লিবিয়ায় প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত। টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটা একটা আকস্মিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে। সেখানে অস্থিরতা দেখা দিলে নিঃসন্দেহে আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজারের জন্য তা হবে এক বড় দুঃসংবাদ। আরেকটি বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে সে শ্রমবাজারেও পড়বে এর প্রভাব। মোট কথা, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমবাজারের সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে জরুরি চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিব্যাপ্ত হয়ে বহুমুখী সম্পর্কে উভয়কে একীভূত করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের জনগণের কাজ করার অবাধ প্রবেশাধিকার। প্রায় সব দেশে বাংলাদেশিরা ছড়িয়ে পড়েছে।

উদাহরণস্বরূপ সৌদি আরবে প্রায় দুই মিলিয়ন বাংলাদেশি বসবাস করে এবং বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়ে সৌদি আরবের উন্নয়নে বাংলাদেশের নিবিড় অংশীদারিত্বের প্রমাণ তৈরি করে। এ ছাড়া যেসব বৈধ শ্রমিককে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সরকারের আইনগত সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি। গত বছর কেবল সৌদি আরব থেকে পাঠানো শ্রমিকদের অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৪৭ কোটি টাকার চেয়েও বেশি। দেশের জিডিপিতে যার অবদান খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ খাত বিপদগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। অনতিবিলম্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ টিম গঠন করে তাতে পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মজীবন বাধামুক্ত করা যায়। সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের জনশক্তির কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে নানা কারণে। তার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নব-উত্থিত সংকটগুলোর ভূমিকাই মুখ্য। ফলে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক থেকে এখন কাক্সিক্ষত ফল লাভ করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে সঞ্চারিত ও সম্প্রসারিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং আফগানিস্তানের মুজাহিদ যোদ্ধাদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের ডাক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে ছিন্নভিন্ন করার কারণে বাংলাদেশ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরাকে কর্মরত বাংলাদেশিরা ইরাকযুদ্ধের কারণে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়। আরব বসন্তের কারণে লিবিয়ায় গণ-অভ্যুত্থানের নামে গাদ্দাফি সরকারের পতন হলে সে দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে আরবরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমবেত হলেও অতি সম্প্রতি সৌদি আরবসহ কতিপয় আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনের নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের কর্মপরিবেশ নষ্ট হয়। লেবানন ও সিরিয়াযুদ্ধের বহুতর সংস্করণে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের জটিল রূপ প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর অন্যতম শীর্ষ খবর ছিল বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার হারাচ্ছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি হারানোর লোমহর্ষক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে সংবাদপত্রে। সে দেশে কর্মরত বৈধ-অবৈধ সব শ্রেণির শ্রমিকের অনেককে সৌদি আরব থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরাও কমবেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের শ্রমিক প্রেরণনীতির পুনর্মূল্যায়ন করে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের কর্মজীবন বাধামুক্ত করতে অভ্যন্তরীণ শ্রমনীতি ও শ্রম কূটনীতি শাণিত করা প্রয়োজন। আমাদের জিডিপির সিংহভাগ আসে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো টাকা থেকে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাপারে জাতীয় নীতি ও বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে তেমন ফলপ্রসূ নীতি ও সিদ্ধান্ত পরিলক্ষিত হয় না। বাংলাদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বন্ধন চিরায়ত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দ্বারা গ্রন্থিত। ইসলামের সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বনীতি উভয়কে খুব কাছাকাছি ধরে রেখেছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি মধ্যপ্রাচের দেশগুলোর স্নায়ুযুদ্ধকালীন অস্বস্তি থাকলেও অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করে এগিয়ে আসে সে দেশগুলো। বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির প্রাঞ্জলতা ও সৃজনশীলতার ধারায় বাংলাদেশ-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক সুদৃঢ় হতে থাকে। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, বাংলাদেশের রফতানিমুখী প্রবৃদ্ধি-কৌশল, আরব-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে আরবদের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন, ওআইসি, ইসিও, আইসিএসসহ মুসলিম বিশ্বের আঞ্চলিক সংস্থাসমূহে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন জীবন দেয়। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মজবুত স্থাপনা গড়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে দেশমাতৃকার পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজ দুটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সদ্য স্বাধীন দেশের নেতাদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত, কমিউনিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে সহযোগিতার জন্য দ্বারস্থ হয়ে আশানুরূপ ফললাভে ব্যর্থ হন। ফলে তারা পুঁজিবাদী যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ ও আফ্রো এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর কাছে বৈদেশিক সহায়তা চান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বাংলাদেশের কঠিন সময়ে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করে।

বাংলাদেশ ধীরে ধীরে মতাদর্শভিত্তিক পররাষ্ট্রিক রূপরেখা পরিবর্তন করে প্রয়োজনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে পররাষ্ট্র সম্পর্কের নবতর যুগের সূচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের সাহায্য ও সমর্থনপুষ্ট আফগান মুজাহিদ যোদ্ধা, তালেবান, আল-কায়েদা, আইএস, সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক যুগসন্ধিক্ষণে এসে সন্ত্রাসী হিসেবে সাব্যস্ত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র যাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে লালন করা হয়, তাদের আবার সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে এদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধের নানা ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের জটিল অধ্যায়ের সূচনা করা হয়। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত সহজ-সরল বাংলাদেশিদের জীবন ও জীবিকা তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ শ্রমনীতি সংস্কার করে, যা সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সৌদি সরকার সে দেশের কোম্পানিগুলোয় কাজ করার জন্য স্থানীয়দের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ফলে কোম্পানিগুলো বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে সৌদি নাগরিকদের নিয়োগের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত ৮ অক্টোবর প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার খবরে জানা যায়, ৩ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র তিন দিনে দাম্মাম ডিটেনশন কেন্দ্র থেকে তিন পর্যায়ে ৪০০ বাংলাদেশি শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ব্যুরো অব ম্যান পাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৭ সালে সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার ৩০৮ জন।

অথচ এ বছর এ সংখ্যা কমে গিয়ে মাত্র ১ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জনে নেমেছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিকদের বের করে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেকের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় তারা বিপাকে পড়ছে। কিন্তু যারা বৈধভাবে কাজ করছে, তাদেরও ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে পরে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমিক প্রেরণনীতির ব্যাপক পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। শ্রমিকদের যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ দিয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ধারণায় শানিত করে সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিদেশে পাঠানো উচিত। বিদেশে কর্মরত কোনো শ্রমিকের অসুবিধা যেন ব্যক্তিগতভাবে ওই শ্রমিক বা তার পরিবারকে বিপর্যস্ত না করে, বরং সরকার যেন ওই শ্রমিকের অসুবিধা দূর করার নীতি গ্রহণ করে, সেই ব্যবস্থা শ্রমনীতিতে যুক্ত হওয়া জরুরি। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। এ পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারে সম্ভাব্য বিপর্যয় রোধে এখনই সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

raihan567@yahoo.com

"