বিশ্লেষণ

কোন পথে ইউরোপ

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

হাসান জাবির

‘একজন ব্যক্তির পক্ষে একই সঙ্গে দুটি ট্রেনে ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।’ সম্প্রতি ইউরোপের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে এই উদাহরণ দেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী। মূলত রুশ-মার্কিন বৈশ্বিক বিরোধ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপকে ঘিরে নতুন এক মেরূকরণের মুখে তিনি এ কথার উদাহরণ দেন। এই নতুন মেরূকরণের পথে স্বতন্ত্র মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপ। বলা চলে, বিশ্ব সংকটের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে ইউরোপীয় ঐক্য। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক, সামরিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির শক্তিশালী দুর্গ ইউরোপ মহাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ কেমন হতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

যুগে যুগে ইউরোপীয় রাজনীতির গতিপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্ধারিত হয়েছে বৈশ্বিক সমীকরণ। অন্যদিকে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাল মুহূর্তে দুই পরাশক্তির নিষ্পেষণমূলক নীতির কারণে ইউরোপজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করেছিল দীর্ঘকাল। এই ধারাবাহিকতার অবসান করেছিল স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তি। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের মাত্র দুই যুগ পর আবার ইউরোপ ঘিরে এক নতুন মেরূকরণ সৃষ্ট্রি হয়েছে। দেখা দিয়েছে সামরিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঘিরে এক নতুন সংকট। মূলত পূর্ব-পশ্চিম বিরোধের নতুন সংস্করণের কারণেই এ প্রেক্ষাপটের সৃষ্ট্রি হয়েছে। অন্যদিকে বেক্সিটের মধ্য দিয়ে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’র কাঠামোগত সংকোচন সম্ভাবনায় সৃষ্ট মতবিরোধ ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইউরোপীয় রাজনীতির প্রভাবশালী দেশ ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত নেতিবাচক ঘটনা। ফলে দৃঢ় ঐক্যের পরিবর্তে ইউরোপের দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। একক ইউরোপীয় ধারণা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা বজায় রাখতে পারছে কি ইউরোপ? এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ে আমেরিকা ও ন্যাটোর সঙ্গে মতবিরোধ আন্তআটলান্টিকের বৃহত্তর ঐক্য সংহতিকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর উঠতি মৈত্রীও প্রায় বিপন্ন। সংগত কারণেই আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মূল্যায়ন করে সামগ্রিক পরিস্থিতি ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বিশেষ করে ‘ইরান পরমাণু চুক্তি’, ‘সিরিয়া সংকট’ ‘অভিবাসী সংকট’, ‘ইউরোপের জ্বালানি ও সামরিক নিরাপত্তা’ ইত্যাদিতে জুতসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে ইউরোপের ব্যর্থতা চোখে পড়ছে। আবার উপরোক্ত আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে ইউরোপের নেওয়া পদক্ষেপে আমেরিকা ও রাশিয়া কেউই সন্তুষ্ট নয়। তা সত্ত্বেও সিরিয়া ‘ও ইউক্রেন সংকট’সহ মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ইউরোপের নেওয়া পদক্ষেপে রাশিয়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, যা রাশিয়া ইউরোপ সম্পর্কের নতুন উষ্ণতার পথটিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরিতে সহায়তা করছে। সংগত কারণেই রাশিয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিলে ‘ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা’র প্রশ্নে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি বাজার ধরতে না পারলে ইউরোপের সামগ্রিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার ক্ষমতা গ্রহণের অব্যাহত পর থেকেই ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে চলছে এক ধরনের টানাপড়েন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের নেতৃত্বপ্রত্যাশী দেশ জার্মানিকে প্রায়ই নানাভাবে সতর্ক করছে ট্রাম্প প্রশাসন। উল্লেখ্য, স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর রুশ-ইউরোপ সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে হলে মস্কো- বার্লিন দ্বিপক্ষীয় মৈত্রী সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে আমেরিকা চায় সামরিক জোট ন্যাটোর বাজেটে ইউরোপীয় দেশগুলোকে আরো অধিক অর্থ সরবরাহ করুক। কিন্তু এ-সংক্রান্ত বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথমসারির দেশগুলো আমেরিকার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন। সম্প্রতি ফান্সের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ইউরোপের নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু ফ্রান্সের এ বক্তব্য ইউরোপের সব দেশ সমর্থন করবে কি? এ নিয়ে বিস্তর অনিশ্চয়তা আছে। বিশেষ করে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থি শক্তির রাজনৈতিক উত্থান ‘একক ইউরোপীয়’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করবে। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির পর্যালোচনা এখানে প্রণিধানযোগ্য। এটি খুব পরিষ্কার, ইউরোপ-সংক্রান্ত নয়া মার্কিননীতিতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। অন্যদিকে স্পেন থেকে কাতালোনিয়ার বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে ইইউর নীরবতা ইউরোপীয় সংকটের আরেকটি রূপ প্রকাশিত হয়। যে কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে ইউরোপের একক ধারণা ও একক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কার তৈরি হয়েছে।

তাই বলা চলে, প্রথমত বেক্সিট ইস্যুর পাশাপাশি আমেরিকা ও রাশিয়ার সঙ্গে স্বতন্ত্র সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গিয়ে আপাতত কিছুটা ব্যাকফুটে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইতোমধ্যে আগামী বছর নাগাদ বেক্সিট-সংক্রান্ত চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের মধ্যে চলছে নানা ধরনের দর-কষাকষি। এ সুযোগে রাশিয়া, আমেরিকাসহ অন্য শক্তিগুলো ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করতে নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত আছে। সব মিলিয়ে দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়ার চাপে ইউরোপে আবার স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ ফিরে আসার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত সব পরিস্থিতিতেই রাশিয়ার বিপক্ষে ইউরোপীয় ঐক্যের পূর্বতন ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। আমরা অতিসম্প্রতি রুশ ডাবল এজেন্ট সার্গেই ক্রিপালকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের ঐক্যের একটি নমুনা দেখলাম। ক্রিপালকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক বহিষ্কারের ঘটনায় রাশিয়া ইউরোপ সম্পর্কে নানাভাবে প্রভাবিত করবে। এর ফলে রুশ ইউরোপ অর্থনৈতিক সম্পর্ক কাটছাঁট হচ্ছে বা হয়েছে, যা ইউরোপের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহে রাশিয়া সত্যি সত্যি পিছিয়ে গেলে সেই শূন্যতা কীভাবে পূরণ করবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে ইউরোপকে। এই বাস্তবতায় পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো ও রাশিয়ার মারমুখী অবস্থানের কারণে ইউরোপের সামরিক উত্তাপ ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংগত কারণেই আরো একবার ইউরোপের নিরাপত্তা সংকট তীব্র হওয়ার শঙ্কা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে।

তা সত্ত্বেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউরোপের অর্জন কী? ইউরোপ কি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। এখানেই বড় প্রশ্ন। ইরান পরমাণু চুক্তিসহ দেশটির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত ঘটনাবলিতে ইউরোপ-আমেরিকা বিবাদ আর গোপন নয়। ন্যাটোর ব্যয়নির্বাহ, ইঙ্গ-মার্কিন নয়া বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদি ওই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। বিশেষ করে ন্যাটো বিষয়ে ইউরোপের মনোভাব পরিষ্কার হওয়া অত্যাবশ্যক। কিন্তু ইউরোপের প্রথমসারির দেশগুলো এ ব্যাপারে পরিষ্কার নয়। এ ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর সময়ে ইউরোপ ন্যাটোকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগের যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বর্তমানে সেই প্রেক্ষাপট নেই। মূলত ইউক্রেন ঘটনার জেরে ইউরোপের নিরাপত্তা শঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ ‘শ্যাম না কুল রাখি’ অবস্থার মধ্যেই আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিরোধ। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে ইউরোপ কি প্রক্রিয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেবে? সব মিলিয়ে ইউরোপের সামগ্রিক পরিস্থিতি কিছুটা বেসামাল। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে দরকার আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নতুন মিত্র পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত। তাই ইউরোপে আমেরিকার ট্রাডিশনাল মিত্রদের অবস্থা কী হবে, তা সময়ই বলে দিতে পারে। তবে ইইউর নেতৃস্থানীয় দেশ ফ্রান্স ও জার্মানি কর্তৃক ইইউকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ সফল হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকতে পারে। তবে আপাতত সেই সম্ভাবনা খুব কম।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

 

"