পরিবেশ

ছাদবাগানে সবুজ শহর

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

গ্রামের গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার দৃশ্য কার না মনে পড়ে! গ্রামের সবজি বাগান থেকে টাটকা সবজি তোলা, ফুলের গন্ধ ও সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো বিষয় ভারী আনন্দের। কিন্তু শহরে এমন পরিবেশের ছোঁয়া পাওয়া যেন কল্পনারও অতীত! নগরায়ণের চাপে ও প্রয়োজনীয় আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ঢাকা শহরের ফাঁকা জায়গা দিন দিন কমে আসছে। ছোট এই শহরে প্রায় দুই কোটি লোকের বাস। কোনো ফাঁকা জায়গা না রেখে একটি ভবনের গাঁ-ঘেষে আরেকটি ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশ্বের ঘনবসতি শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। এ শহরে বায়ুদূষণ এক নীরব যন্ত্রণার নাম। সবুজ ঢাকা গড়তে এবং বাতাসকে দূষণমুক্ত করতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে ছাদবাগান কর্মসূচি। এ শহরটাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেন জানি পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার অভাব বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঢাকা শহরের সচেতন ও শৌখিন অনেক পরিবারকে বাসাবাড়ির ছাদে বাগান করতে দেখা গেলেও সেই সংখ্যা খুবই নগণ্য। এক তথ্য মতে, ঢাকা শহরে মোট ভবনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের মতো। সবার সচেতনতা, আগ্রহ আর যথাযথ কর্তৃপক্ষের (সিটি করপোরেশন) সহযোগিতায় ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি বাড়ির ছাদে ছোট ছোট এক একটি বাগান এ শহরটাকে সবুজের সমারোহে ভরিয়ে তুলতে পারে। বলতে গেলে, ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ ভাগ লোকই ভাড়া বাসায় থাকেন। ইট-কংক্রিটের এই শহরে সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেসব বাড়ির ছাদে বাগান করা সম্ভব নয়, সেসব বাসাবাড়ির বারান্দায়, চিলেকোঠায়, জানালার পাশে, সিঁড়ির কিনারায় বাগান কিংবা অল্প পরিসরে গাছ লাগানো যেতে পারে। শহরের ছাদ বাগানগুলোয় লাগানো যেতে পারে ফুল, ফল ও সবজির বিভিন্ন জাতের গাছ। এতে বিষমুক্ত শাকসবজির চাহিদা মেটাবার পাশাপাশি নিজ হাতে ফুল-ফল ও শাকসবজি তোলার আনন্দও পাওয়া যাবে। গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রকৃতির আবহ শহরের জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনার এ প্রচেষ্টা একটু হলেও ভিন্নমাত্রা নিয়ে আসবে। এ ছাড়া বিশুদ্ধ অক্সিজেনে শ্বাস নেওয়া যাবে। চারপাশের পরিবেশে প্রশান্তি বিরাজ করবে। সবুজের মধ্যে থাকার ফলে মন ভালো ও সতেজ থাকবে। মৌসুমভেদে বিভিন্ন ফল ও সবজির চাহিদা পূরণ করেও আত্মীয়স্বজনের বাসায়ও বিষমুক্ত ফল-সবজি পাঠানো যাবে। শহরের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষাসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ছাদবাগান কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ শহরে সবুজের সমারোহ দিন দিন কমছে। কিন্তু মনুষের সঙ্গে প্রকৃতির বন্ধন সেই সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে। মানুষ সবুজের সঙ্গে থাকতে চাই। অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর উন্নত দেশে ছাদবাগানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশ্বের বড় শহরগুলোর বাসাবাড়ির ছাদে বাগান কর্মসূচি শহরগুলোয় সবুজায়ন করে তুলতে সাহায্য করেছে। জাপান, জার্মানি ও চীনের কিছু শহরে ছাদের কিছু অংশ বাগান করার বাধ্যতামূলক নিয়ম আছে। রাজধানী ঢাকা শহরসহ বিভাগীয় শহরগুলোর বাসাবাড়িতে ছাদের অর্ধেক অংশ বাগান করার বাধ্যতামূলক নিয়ম করলে মন্দ হয় না! প্রত্যেক বাসাবাড়ির ছাদে এক একটি সবুজ খ- পুরো শহরটাকে সবুজে সবুজে ভরিয়ে তুলবে। এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে ঢাকা শহরকে দেখলে মনে হবে যেন ছোট একটি সবুজ পৃথিবী! সবুজ ঢাকা গড়তে উভয় সিটি করপোরেশনও তাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) থেকে এক ঘোষণায় বলা হয়েছেÑ বাড়ির ছাদে, বারান্দায় কিংবা বাড়ির আঙ্গিনায় বাগান গড়ে তোলা হলে ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করা হবে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে ছাদবাগান গড়তে কম দামে গাছ, পরামর্শ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে শহরবাসীকে ছাদবাগানের প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে এবং বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো এর সবুজায়ন। নান্দনিক ও সবুজ ঢাকা গড়তে শহরে ঋতুভিত্তিক বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বৃক্ষরোপণের ফলে নগরের বাস্তুসংস্থান ঠিক থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ও বায়ুদূষণ রোধে রাজধানী ঢাকাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা শহরের পরিসীমা সম্প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশনে যুক্ত হয়েছে নতুন ৩৬টি ওয়ার্ড। এ ছাড়া শহরের জনসংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। শহরটাকে বাসযোগ্য করতে ও সবুজের সমারোহ বাড়াতে শহরের প্রত্যেকটি বাসাবাড়ির মানুষকে সবুজ ঢাকা গড়তে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা উচিত। শহরের তথা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে হলেও ছাদ বাগানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। একটি ভালো অভ্যাস বা উদ্যোগের সঙ্গে শহরের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি যুক্ত করা যায়, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন ঢাকা শহর সত্যিকার অর্থে ‘সবুজ ঢাকায়’ রূপ লাভ করবে। দরকার শুধু যথাযথ পরিকল্পনা, উদ্যোগ আর চেষ্টা। আসুন সবাই মিলে শহরটাকে সবুজ করি, বাসযোগ্য ঢাকা গড়ি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"