বিশ্লেষণ

ইয়েমেন সংকটে বিশ্ববিবেক

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য

যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠা ইয়েমেনের শিশু আমাল হুসেন শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হেরে গেছে। শহরে এক শরণার্থী শিবিরে মারা গেছে শিশুটি। শিশুটি মারা গিয়ে বিশ^কে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা। বুঝিয়ে দিয়ে গেছে বিশ্ব বিবেক আজও ঘুমিয়ে আছে। রাত পোহাবার বড় দেরি। বিশ^ শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। আজও বিশ্বে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় শিশুরা মারা যায়। একজন আমাল আসলে বিশ^ নিষ্ঠুর চেহারার একটি রূপ মাত্র। দুচোখে শূন্যতা, পাঁজরের হাড় বের হওয়া আমালের ছবি ফেসবুকে হাজার হাজারবার শেয়ার হয়। বহু মানুষের চোখের জল আসে সেই ছবি দেখে। আমালের মতো বহু শিশু দুর্ভিক্ষের কবলে রয়েছে ইয়েমেনে। ইয়েমেনের এই অবস্থাকে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। খাদ্যাভাব যে কতটা নিদারুণ তা এই বাংলার মানুষ ভালোভাবেই জানে। এই সোনার বাংলায় একসময় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষ আজ ইতিহাস। ভয়াবহ সেই দুর্ভিক্ষে খাদ্যাভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি হয়। যে ঘটনাকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয়। এরপরও বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়। যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। সে সময় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়।

দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনা ঘটার জন্য কেবল সাময়িক খাদ্য সংকটই দায়ী নয়। মানুষের তৈরি করা লোভ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে চলা যুদ্ধ বা এরকম কোনো সংকট দীর্ঘদিন ধরে চললে দুর্ভিক্ষের মতো মারাত্মক খাদ্যাভাব দেখা দেয়। সেই চলে আসা শাসকগোষ্ঠীর লোভ আর ক্ষমতার কারণেই শতাব্দীর ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের মুখে আজকের ইয়েমেন। সেখানকার পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। আমালের মতো শিশুর মৃত্যু তাই অসংখ্য ইয়েমেনি শিশুর মুখ। কেবল ইয়েমেন নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে ক্রমেই আমালের মতো শিশুরা ভয়ংকর বিপদের মধ্যে রয়েছে। একদিকে, বিশে^র বড় বড় ধনী দেশগুলো যখন প্রতিদিন খাবারের একটি অংশ নষ্ট করে তখন ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ। বিশ^ বিবেক আজ বড় নিশ্চুপ মনে হয়। ইয়েমেনে বর্তমানে এক কোটি ত্রিশ লাখ মানুষ অনাহারের শিকার বলে সতর্কতা জানানো হয়েছে জাতিসংঘ থেকে। এ ছাড়াও ইয়েমেনে অন্তত ১৮ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের মতে, বর্তমান বিশে^র সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটছে ইয়েমেনে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে যুদ্ধাবস্থা চলায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের হামলায় সেখানে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে বহু বেসামরিক মানুষ। ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, পানি শোধন কেন্দ্রসহ সব ধরনের সেবামূলক স্থাপনা। সেখানকার শিশুরা জানে না তারা পরবর্তীতে কী খাবে অথবা তাদের সেই খাবার কী হবে বা কোন উৎস থেকে তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হবে। হাসপাতালগুলোতে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা এ ভয়াকহ সংকটের মধ্য দিয়েই দিন পার করছে। ইয়েমেনের এই পরিস্থিতি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ করা প্রয়োজন। তা না’হলে দেশটি আগামী তিন মাসের ভেতর শতাব্দীর ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষের শিকার হতে পারে বলে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেই সম্ভাবনা আছে আবার নেইও। কারণ বিশ^ বিবেক যদি জাগ্রত হয় তাহলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

তিন বছর আগে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের অনেক এলাকা দখল করে নিলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সমর্থিত সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশটির সরকারের পক্ষ নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি দেশটিতে ভয়াবহ অর্থ তারল্যের সৃষ্টি হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সাধারণত ঘটতে পারে, ইয়েমেনে সেটাই ঘটছে। এ পরিস্থিতি তৈরির জন্য সৌদি আরবের রণনীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়েমেনে সৌদি আরব নিকৃষ্টতম কৌশল ব্যবহার করছে। যা বোমা মেরে বা স্থাপনা উড়িয়ে দেওয়ার চেয়েও ভয়াবহ। সেটা হলো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অবরোধ। যার পরিণতিতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ধ্বংসের অনুপাতে এর ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব অনেক বেশি। বলা চলে, যুদ্ধ আর অবরোধে পুরোপুরি বিধ্বস্ত ইয়েমেনের সমাজ। এখনো আশপাশের বাজারগুলোতে খাবার জিনিস পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর দাম এত বেশি যে অধিকাংশ বাবারই তার ক্ষুধার্ত সন্তানের জন্য খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। সম্প্রতি সাংবাদিক খাশোগি হত্যাকা-ে সৌদি আরবের সমালোচনায় তোলপাড় সারা বিশ^। বর্তমানে যেসব অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে সেসব দেশের অবস্থা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিলেই যুদ্ধের নির্মমতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে জানলেই দেখা যায়, ফেলে যাওয়া কিছু ধ্বংসাত্মক অবস্থা ছাড়া আর কিছুই নেই। সে অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে সময় লেগেছে বহু বছর। কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধার চিৎকার আধুনিক অস্ত্রের শব্দের কাছে বড়ই মøান মনে হয়। এটাই বুঝি বাস্তবতা!

ইয়েমেনের জনগণের পক্ষে তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, খাবার ও জরুরি সাহায্যের অভাবে প্রতি ১০ মিনিটে একজন করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারা যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন ইয়েমেনের পরিস্থিতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। এই যে ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি তার পেছনে রয়েছে যুদ্ধ। এখানেও সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। যে বিষয়টি বোঝার বয়স আমালের মতো শিশুদের হয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিশুরাই এই ধরনের সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ শিকার। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে পত্রিকায় জানতে পেরেছি। সাংবাদিক খাশোগি হত্যার পর বিশ^ সৌদি আরবের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে, ফলে সে হত্যা রহস্য উন্মোচন করতে তারা বাধ্য হয়েছে। ঠিক সেভাবে যদি দুর্ভিক্ষ পীড়িত ইয়েমেনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সৌদি সেনাবাহিনীকে যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করে তাহলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটতে পারে। কারণ যুদ্ধ কেবল ধ্বংসই ডেকে আনতে পারে। পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সব জায়গাতেই রয়েছে পীড়িত মানুষের আর্তনাদ। যেখানে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের খাদ্যের অধিকার রয়েছে। কেউ ক্ষুধার্ত থাকার কথা নয়, এমনকি কোনো প্রাণীরও ক্ষুধার্ত থাকার কথা নয়। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট প্রতিটি জীবই ক্ষুধা মেটানোর অধিকার রাখে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করে ক্ষুধা পেটে রাতে ঘুমাতে যেতে। আমালের মৃত্যুর জন্য আমাল দায়ী না। দায়ী এ বিশে^র সামগ্রিক পরিস্থিতি।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"