মতামত

পরিবহন নৈরাজ্য এবং আমরা...

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মিহির রঞ্জন তালুকদার

আমাদের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত লোকদের পাবলিক বাসে যাতায়াতই প্রধান ভরসা। আর যারা পাবলিক বাসে যাতায়াত করেন, তাদের অবশ্যই কোনো না কোনো কারণে একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ড্রাইভার কিংবা হেল্পারের সঙ্গে তর্কবিতর্কের অভিজ্ঞতা রয়েছে। শেষে মানসম্মানের ভয়ে হার মেনে বসে থাকতে হয়। তারা না বুঝে আইন, না বুঝে মানবতা, না বুঝে যুক্তি, না বুঝে মানসম্মান। এ কারণেই জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলে গেছেন, ‘মূর্খের সাথে তর্ক করা বোকামি’। কিন্তু তারপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তর্ক না করে থাকা যায় না। দ্বিতীয়ত, নিজে করি শিক্ষকতা, তাই উপদেশ দেওয়াটা বোধ হয় রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। তবে এদের উপদেশ দেওয়া মানে তাদের সঙ্গে তর্কে জড়ানো। যদি বলি ভাই একটু আস্তে গাড়ি চালান, বলবে আরে এত ভয় পান তাহলে গাড়িতে উঠলেন কেন? এ কথা শোনার পর সিটে বসে বসে সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

গত কয়েক দিন আগের ঘটনা। আমি সিলেট থেকে দিরাই যাচ্ছি ড্রাইভারের ঠিক পেছনের সিটে বসে। গাড়ি চলন্ত অবস্থায় ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলা উচিত নয়। কিন্তু এ রাস্তার ড্রাইভার একেবারেই ব্যতিক্রম। মনে হয় তারা কথা না বলে,

সিগারেট না টেনে গাড়ি চালাতে পারে না। কথাবার্তা আবার রসিক ধরনের, এদের কথা যদি আপনি এনজয় করতে

পারেন, তাহলে ভালোই সময় কাটাতে পারবেন। যাত্রীদের কোনো অসুবিধা হলো কি নাÑএটা এদের দেখার বিষয় নয়। ড্রাইভারের দেখাদেখি আবার দু-একজন যাত্রীও গাড়িতেই সিগারেট ধরাল। আমি একটু চেষ্টা করেছিলাম বারণ করতে। ফলাফল ভালো হয়নি। উল্টো আমাকে শুনতে হয়েছে, আপনার সমস্যা হলে প্রাইভেট গাড়ি করে যান। আমার অর্থনৈতিক অবস্থান আমাকে সে সুযোগ তৈরি করে দেয়নি। তাই বাসেই যেতে হবে।

লেখার ধরন দেখে মনে হতে পারে ‘এ জার্নি বাই বাস’ রচনা লিখছি। তবে মূল ঘটনা এখনো শুরু হয়নি। ঘটনা শোনার পর আপনারা শুধু এতটুকুই অনুধাবন করতে পারবেন, প্রতিদিন আমাদের জীবন নিয়ে তারা কীভাবে ছিনিমিনি খেলে। গাড়িটি পাগলা বাজার অতিক্রম করার পরই হঠাৎ হার্ড ব্রেক। অনেক যাত্রীই আঘাত পেয়েছেন এবং ড্রাইভারকে গালাগালও করেছেন। সামনে থাকার কারণে ব্রেক করার আগ মুহূর্তেই প্রস্তুত ছিলাম, তাই আঘাত কম পেয়েছি। সামনে একটি ছাগল ছিল তাকে বাঁচাতেই হার্ড ব্রেক। তখন ড্রাইভার বলছিল, ‘শালার গরু-ছাগলই আমাদের বড় সমস্যা। এখানে যদি মানুষ থাকত তাহলে ব্রেক না করেই চলে যেতাম।’

বললাম কী বলেন এসব! বলল, ভাই গরু-ছাগল মারলে সাথে সাথে আমাদের জরিমানা গুনতে হয়, কিন্তু মানুষ মারলে আমাদের আর পায় কে? গাড়ি রেখে পালাব। পরে পাবলিকে গাড়ি পুড়িয়ে দেবে, মালিকও বিমা কোম্পানি থেকে নতুন গাড়ি নিয়ে নেবে। অর্থাৎ গাড়ির বিমা করা আছে দুর্ঘটনা ঘটলে বিমা কোম্পানি নতুন গাড়ি দেবে। ড্রাইভারদের কাছে এই হচ্ছে মানুষ এবং গরু-ছাগলের পার্থক্য। গল্পটা শোনার পর নিশ্চয়ই গালে হাত দিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। ভাবছেন, কী শুনলাম এসব! আমিও বাক্্রুদ্ধ হয়ে সারাপথ চুপ করে বসে রইলাম আর কোনো কথা বললাম না।

৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটে, পরিবহন শ্রমিকদের যে বর্বরতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে আমরা কোনো সভ্য দেশে আছি বলে মনে করছি না। সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রীদের হয়রানি, লাঞ্ছনা ছিল চোখে পড়ার মতো। স্কুলছাত্রীর যে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল, সেটা দেখলে যেকোনো সুশীল লোক তাদের ধিক্কার দেবে। সাদা ধবধবে স্কুল ড্রেস পরিহীত ছাত্রীটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো গতকালই তার মা স্কুল ড্রেসটি পরিষ্কার করে মেয়েকে পরিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তারা এই সুন্দর পোশাকটির গায়ে পোড়া মবিল লাগিয়ে দিল। ছবিটি দেখে মনে হলো মেয়েটি হয়তো কান্নাই ভুলে গেছে। মেয়েটি কারো না কোরো মেয়ে, কারো না কারো ছাত্রী। এদের হাত থেকে বাদ যায়নি প্রাইভেট কারের ড্রাইভারসহ মোটরসাইকেল আরোহীও। অকথ্য ভাষায় গালাগাল তো আছেই।

হরতাল, ধর্মঘটের সঙ্গে আমরা বেশ আগে থেকেই পরিচিত। কিন্তু রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স সর্বদাই এর আওতামুক্ত ছিল। কিন্তু এদের কাছ থেকে এবার আর কেউ রক্ষা পায়নি। সাত দিন বয়সের শিশুটিও। ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’ কী করব আমরা এসব অঙ্গীকার করে। যে শিশুটির এখনো নামকরণই হয়নি, তাকেই আমরা বাঁচতে দিলাম না। এসব সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কী কোনো সাজা নেই! এরা কী খুনি নয়? সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী আমাদের জীবন এই সন্ত্রাসীদের হাতে ছেড়ে দেব কি না। একটি গাড়ির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ড্রাইভাবের হাতেই থাকে। সে যদি মানুষের মূল্য না বোঝে। গরু- ছাগলকে মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান মনে করে, তার কাছে কী গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দেওয়া যায়? এক বাক্যে ১৬ কোটি মানুষ বলবে, না।

এদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার সব মামলা জামিনযোগ্য করা, দুর্ঘটনায় চালকের পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বিধান বাতিল, এদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণির পরিবর্তে পঞ্চম শ্রেণি করা, ৩০২ ধারার মামলার তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখা, পুলিশি হয়রানি বন্ধ ইত্যাদি। এসব দাবি যদি পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, তারা খুন করে খুনের বৈধতা চাচ্ছে। দেশ যখন শিক্ষা-দীক্ষায় এবং প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে, সেখানে ড্রাইভারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি রাখার কোনো যুক্তিই নেই। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার সব মামলা যদি জামিনযোগ্য হয়, তাহলে তারা আইনের ঊর্ধ্বে চলে গেল। দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোই হচ্ছে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব, নেশাগ্রস্ত, খামখেয়ালি জীবনযাপন। ফলে অন্যের জীবনের মূল্য তারা বুঝবে কী করে?

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা হলো, যারা সত্যিকার ড্রাইভার তারা এই আইন সম্পর্কে কিছু জানে না, বোঝেও না। যদি এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে (অধিকাংশেরই নেই) তবে

কাগজে-কলমে পঞ্চম শ্রেণি পাস, প্রকৃতপক্ষে তারা নামও লিখতে পারে না। কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তারা পত্রিকা যেমন পড়তে পারে না দেশের কোনো

খবরা-খবরই এদের প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জাগে, তারা ধর্মঘট ডাকল কেন? মূল কথা হলো, তাদের দিয়ে ধর্মঘট ডাকানো হয়েছে। সুতরাং এসব মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় হলে সড়কে অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।

লেখক : প্রভাষক, বালাগঞ্জ সরকারি কলেজ

সিলেট

 

"