নিবন্ধ

ঋতুচক্রে শীতের প্রকৃতি

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সতীর্থ রহমান

হেমন্ত ঋতুর পর ঠান্ডা আমেজমাখা উত্তরের হাওয়া শীতকালের আগমনী বার্তা ঘোষণা করল। শুষ্ক-শীতল চেহারা নিয়ে আসে শীত ঋতু। কুজ্ঝটিকার হিমেল আবরণ টেনে উপস্থিত হয় শীত তার চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে। নির্মম রুক্ষতা, পরিপূর্ণ রিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি হলো এই ঋতু। শাল, সেগুন, আমলকী, জামরুল, কৃষ্ণচূড়া শিরীষের বনে লাগে হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া। বাতাসে বাতাসে রিক্ততার সুর বেজে ওঠে। ভোরের প্রকৃতি তখন ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা থাকে। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় হাড়ে কাঁপন লাগিয়ে শীত এসে জেঁকে বসে। সমগ্র প্রকৃতি তখন

শীতের দাপটে নির্জীব হয়ে যায়। শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ বৃক্ষলতা পত্র-পল্লবহীন হয়ে পড়ে। যেসব গাছের

পাতা ঝরে পড়ে না, সেগুলো বিবর্ণ হয়ে যায়। সবুজ প্রকৃতি রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। এ সময় পাতাহীন গাছের ডালগুলো কেঁদে ওঠে বুকফাটা হাহাকারে। একটা উদাস সুর বাজে প্রকৃতিতে।

গ্রামবাংলায় শীতের সকাল থাকে কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় ঢাকা। শীতের সকালে কুয়াশা পড়া নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো কুয়াশার স্তর এত ঘন হয় যে, কয়েক হাত দূরের গাছপালাও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেশ বেলা হওয়া সত্ত্বেও সূর্যের মুখ দেখা যায় না। অনেক দেরি করে রোদ ওঠে, বেলা কতটুকু হয়েছে, তা অনুমান করা যায় না। পুকুরের পানি থাকে স্থির, তার ওপরে হালকা ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। কখনোবা গাছের পাতায় পড়া শিশির বড় বড় ফোঁটায় ঝরতে থাকে। শীতের আগমনে মাঠে মাঠে কচি ঘাসের পাতায় শিশির বিন্দু জমে রোদের আভায় ঝিকমিক করতে থাকে। ধানের ওপর পড়ে থাকা শিশির বিন্দু সূর্যের সোনালি রশ্মিতে মুক্তার মতো ঝলমল করে।

শীতের দীর্ঘ রজনিতে মানুষ লেপ, কাঁথা, কম্বল মুড়ি দিয়ে জড়াজড়ি করে কাটায়। পাখিরা সূর্য ওঠার আগে তেমন ডাকে না। তখন দিন ছোট হয়ে পড়ে। সুদূর দক্ষিণ থেকে সূর্য কিরণ দিতে থাকে এবং দিনের চেয়ে রাত বড় হয়ে যায়। ধীরে ধীরে শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডায় যেন সারা দেশ কাঁপতে থাকে। প্রচন্ড শীত প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। তীব্র শীতের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে। ফলে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে। শীতকালে কারো গায়ে বাহারি রঙের শাল, জাম্পার, জেকেট, সোয়েটার, আলোয়ান, চাদর, কারো গলায় মাফলার, কারো মাথায় গরম টুপি পরতে দেখা যায়। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ তীব্র শীত উপেক্ষা করেই কাজে বের হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে কৃষক লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে চলে যান। কেউ জমি চাষ করেন। কেউ খেতে নিড়ানি দেন। কৃষাণ বধূরা শয্যা ত্যাগ করে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে হাত দেন।

শীতে পাকা ফসল ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত গ্রামবাসী। এসব দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না। হিমশীর্ণ পৌষে বাংলার নদীনালা, খালবিল, পুকুর, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যায়। তখন এ দেশে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। ফলে রবিশস্যের চাষাবাদের জন্য প্রকৃতি হয় অনুকূল। শীতের শুকনো মাঠও রবিশস্যের প্রাচুর্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে। শীতকালীন টাটকা শাকসবজিতে ভরে যায় বাংলার মাঠঘাট প্রান্তর। পালংশাক, নতুন আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, লাউ, টমেটো, গাজর, শালগম, মুলা, লালশাক প্রভৃতি শীতকালীন শাকসবজি আমাদের খাবারকে আকর্ষণীয় করে। সরিষা ফুলের শোভা বাংলাদেশের প্রকৃতিকে শুষ্কতার মাঝেও এক অপরূপ সাজে সজ্জিত করে। পল্লী এলাকায় শীতের সকালের দৃশ্য বড় চমৎকার। ছেলেমেয়েরা অপেক্ষায় থাকে কখন সূর্য উঠবে। শীতের সকালের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত জিনিস তির্যক রোদ। সকালবেলার মিষ্টি রোদে বসে বয়স্ক ও অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা রোদ পোহায়। এ সময় ছেলেমেয়েদের কোঁচড়ে থাকে চিড়া, নাড়–, মুড়ি ও খেজুরের পাটালি গুড়। চাদর গায়ে দিয়ে রোদে বসে গুড়, মুড়ি, খিচুড়ি ও ভাপাপিঠা খেতে খুব ভালো লাগে। শীতের রোদ্দুর বাঙালির কাছে যথার্থই তৃপ্তিকর।

শীতকালে শহরাঞ্চলের মানুষ সাধারণত অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। নগরবাসী গভীর রাতে ঘুমুতে যায়। বিছানা ত্যাগ করে অনেক বেলা করে। তবে যাদের না বেরোলেই নয়, তারা ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়েই বের হয়। বহুতল ভবনগুলো কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে। রাস্তার পাশে বিজলিবাতিগুলো মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকে। শীতের সকালে শহরের রাস্তাঘাট থাকে ফাঁকা। গাড়িগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করে। ঘন কুয়াশার কারণে চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হয়, দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে যায়। শহুরে মানুষের গায়ে শীতের নানা রকমের

পোশাক দেখা যায়। গরম কাপড়ের অভাবে বস্তিবাসী লোকেরা শীতে খুব কষ্ট পায়। শীতের রাতে শহরে ব্যাটমিন্টন খেলার হিড়িক পড়ে যায়। অনেককে অবৈধ পার্শ্বসংযোগ নিয়ে বিজলিবাতি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাটমিন্টন খেলতে দেখা যায়।

অতিথি পাখি শীতের অন্যতম আকর্ষণ। শীতকালে

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পাখি আমাদের দেশে আসে। যদিও নিধনকারীদের অত্যাচারে পাখি আগমনের সংখ্যা

কমে গেছে। পর্যটন খাত থেকে শীতকালে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসে। এ সময় বিদেশি পর্যটকদের আগমন

বেড়ে যায়। শীতের অনুকূল আবহাওয়া দেশি-বিদেশি ভ্রমণবিলাসীদের কাছে আরামদায়ক। শীতকালে দেশের পিকনিক স্পটগুলো ভোজনরসিক ও ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখর হয়। বাসাবাড়ি, হাটবাজার, উন্মুক্ত প্রান্তর সর্বত্র পিকনিকের আয়োজন বেড়ে যায়। শীতকালে বাংলাদেশের সর্বত্র নানা রকমের পিঠাপুলি তৈরি হয়। গ্রামে গ্রামে চলে রং-বেরঙের পিঠা, পায়েশ, ফিন্নি খাওয়ার আয়োজন। শীতের নরম রোদের আঁচে খোলা আকাশের নিচে মাছের সুরুয়া দিয়ে পিঠা খেতে ভারি মজার। পিঠার জন্য আতপ চাল গুঁড়ো করতে হয়। কোনো পিঠা ভাপে, কোনো পিঠা তেলে ভাজতে হয়। আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই পিঠা খাওয়ার প্রচলন আছে। তবে শীতকালে বিশেষ করে ভাপাপিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাপাপিঠা দেখে জিভে পানি এসে যায়। আতপ চালের গুঁড়ো, গুড় ও নারকেল সহযোগে তৈরি করা হয় ভাপাপিঠা। রসের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে বানানো হয় রসের পিঠা। এ ছাড়া চিতই, দুধচিতই, বড়াপিঠা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি প্রভৃতি পিঠার বেশ প্রচলন রয়েছে। ছেলেবুড়ো সবাই এসব পিঠা খেতে ভালোবাসে।

উত্তরাঞ্চলীয় জেলা দিনাজপুরে এবার হেমন্তের শুরুতে কার্তিক মাসের দিন পড়তে না পড়তেই আগাম শীত অনুভূত হয়। তবে ভরা কার্তিকের আগাম শীত অনেকটাই হতাশ করেছে হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষদের। কৃষকদের ধারণা, আগাম শীত ও কুয়াশা রবিশস্য চাষাবাদের জন্য অমঙ্গলজনক। দিনে গরম আর রাতে ঠান্ডার কারণে শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে বহু মানুষ। জ্বর, সর্দি-কাশি, গলাফুলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ায় শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়। কৃষিবিদরা বলছেন, যে হারে আগাম শীত নামতে শুরু করেছে তা চলতি মৌসুমে রবিশস্য চাষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।

তীব্র শীত মানুষের জীবনে দুর্যোগ নামিয়ে আনবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য শীত হয়ে উঠে অসহনীয় এক ঋতু। উচ্চবিত্তরা প্রচন্ড শীতেও কষ্ট পায় না। কারণ প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র ক্রয় করার সামর্থ্য তাদের থাকে। কিন্তু প্রচন্ড শীতে নিম্নবিত্তরা প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র কিনতে না পারার কারণে প্রচুর কষ্ট ভোগ করবে, যা তাদের কাছে দুর্যোগের শামিল। এ ছাড়া গ্রিনহাউস এফেক্টের কারণে প্রতি বছরই প্রকৃতিতে এর প্রভাব পড়ছে। যেমনÑগ্রীষ্মে গরমের তীব্রতা বাড়ছে। বর্ষায় অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি বেড়ে গেছে। শীতেও শীতের তীব্রতা বেড়েছে। এত কিছুর পরও শীতের সকাল বাঙালি জাতির জীবনকে করেছে বৈচিত্র্যময়।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

info.skcbd@gmail.com

 

"