পর্যালোচনা

তিরিশের ব্যারিকেড

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ১৮-৩০ বছর। তবে মানসম্মত চাকরি (১ম-২য় শ্রেণি) পেতে হলে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করতে করতে প্রায় ২৫-২৬ বছর লেগে যায়। গড় আয়ু ৫০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ করা হয়। বর্তমানে গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর। আবার অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। গত ২৬ বছরে (১৯৯১ সালের পর) চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা কয়েক দফা বাড়ানো হলেও দুঃখের বিষয় প্রবেশের বয়সসীমা আর বাড়েনি। পৃথিবীর ১৬০টিরও অধিক দেশে (রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, ভারতসহ অধিকাংশ উন্নত দেশে) চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এর অধিক। পাশর্^বর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, রাশিয়ায় অবসরের আগের দিনও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। আফ্রিকায় কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫৯ বছরের আগের যেকোনো সময় চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। বিশ^বিদ্যালয় বা কলেজের একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করতে সেশনজট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে প্রায় ২৬ বছর লেগে যাচ্ছে! একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করতে করতে এবং চাকরির পড়াশোনা শুরু করতে করতে বয়স ৩০ পার হয়ে যাচ্ছে। তবে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এ থমকে থাকবে? ফলে লাখ লাখ তরুণ চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। বাস্তবতা হলো, বর্তমানে লাখ লাখ ছেলেমেয়ের উচ্চশিক্ষা আছে, সনদ আছে, কিন্তু চাকরি নেই! বয়স ৩০ পার হওয়া মানে অর্জিত সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ! সহজ কথায়, একজন তরুণকে ৩০-এর গন্ডির মধ্যে বেঁধে রাখা হচ্ছে! ফলে বয়স ৩০-এর মধ্যে চাকরি না পাওয়া একজন তরুণকে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ মধ্যম আয়ের ও উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখতে হলে সব তরুণের মেধা কাজে লাগানো সবচেয়ে বেশি জরুরি! তাই সময়ের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হোক। বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী বেকার। এদের প্রায় অর্ধেক অংশই ¯œাতক-¯œাতকোত্তর শেষ করা চাকরিপ্র্রত্যাশী। সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে, ভর্তুকি দিয়ে কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর দেশ গড়ার কাজে সুসন্তান হিসেবে তৈরি করছে। কিন্তু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০-এ বেঁধে রাখার ফলে সরকার এসব শিক্ষার্থীর মেধা কি আদৌ কাজে লাগাতে পারছে? সরকারি নিয়ম অনুসরণ করার ফলে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে জনবল নিয়োগ দিচ্ছে না! আবার ‘যুবনীতি-২০১৭’তে যুবাদের বয়স ১৮-৩৫ রাখা হয়েছে। তাহলে কেন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ রাখা হবে?

উন্নত বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষিত তরুণদের কাজে লাগাতে দেশের উন্নয়নে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো প্রয়োজন। এতে করে বেকারত্বের বোঝা কমবে। অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে বেকারদের দ্রুত কর্মসংস্থানে নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার। দেশে এখন বেকারত্বের হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি। বেকাররা দেশের অভিশাপ নন, তারাও সুযোগ পেলে দেশের ও পরিবারের জন্য কিছু করতে চান। নীতিনির্ধারকদের সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় বড় ধরনের জনশক্তি অপচয় হবে। বেকারত্বের জ¦ালা সহ্য করতে না পেরে অনেকে সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক মেধা আবার বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। আরো বাড়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে! এ ছাড়া অন্যান্য কিছু পেশায় কর্মকর্তাদের অবসরের বয়স আরো বেড়েছে অথচ নিচের দিকে প্রবেশের বয়স বাড়েনি। ফলে ভারসাম্য না রাখার ফলে শুধু বেকারত্ব বেড়েছে, বেড়েছে তরুণদের হতাশা। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো মানে তো চাকরি দেওয়া নয়। বরং একটি সম্ভাবনাময় শেষ হওয়া জীবন গাড়ির চাকা নতুন করে সচল করা। এতে বাড়তি টাকার অপচয়ও হবে না। যে যার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবেন। তাছাড়া একটু বেশি বয়সে চাকরিতে প্রবেশ করলে জ্ঞানের চর্চাও অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বেকার তরুণদের জন্য বেকার ভাতা চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বেকার ভাতা না হোক অন্তত চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে তরুণদের বেকারত্বের হাত থেকে তো মুক্তি দেওয়া যেতে পারে! সব দিক বিবেচনা করে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ করেছে (একাধিকবার) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’। তরুণ সমাজের যুক্তিসঙ্গত, যুগোপযোগী, সময়ের ও প্রাণের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করা হোক। এতে করে শিক্ষার্থীরা হয়তো নিজেকে তৈরির এবং মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন। লাখ লাখ তরুণ তাদের হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাকে আবার ফিরে পাবেন। দেশের প্রতিটি মেধা কাজে লাগবে। দেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"