নিবন্ধ

রাজনীতির তাপ-উত্তাপ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

অলোক আচার্য

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম। রাজনীতির তাপ-উত্তাপে রাজপথ ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছে। জোট-মহাজোট গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ভোটের এই উত্তাপ শহর থেকে সুদূর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তা তো পড়ারই কথা। নির্বাচনের যে আজ বেশি দেরি নেই। এ মাসেই বসছে জাতীয় সংসদের সর্বুশেষ অধিবেশন। সংবিধান অনুযায়ী এক সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন ডাকতে হবে। গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। জোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন, সংসদের বাইরে থাকা দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপির নির্বাচনে আসা না আসার হিসাব, ছোট ছোট দল নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যপ্রক্রিয়া, বিএনপি এবং জামায়াতের অবস্থান এসব নানা বিষয় রাজনৈতিক অঙ্গন মুখর রেখেছে। রাজনীতির মাঠের তাপ এখন সর্বত্র ছড়াচ্ছে। সেই তাপে অবশ্য কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। সেই তাপে রাজনৈতিক পাড়া উত্তপ্ত হচ্ছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই তাপ বাড়তেই থাকবে। সময় গড়ানো সঙ্গে সঙ্গে তাপের মাত্রাও বাড়বে। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সবজায়গায় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, তা জানতে আগ্রহী সবাই। কারণ তত্তাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির পর এবারই গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। এই সরকারে বিএনপির কেউ প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না বা টেকনোক্র্যাট থেকে অন্য কোনো দল থেকে প্রতিনিধি থাকবে কি না, তা এ মাসেই জানা যাবে। তবে সংসদে থাকা দলগুলো থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হতে পারে বলে মনে হয়। এসব জাতীয় পর্যায়ের আলোচনা ছাড়াও কোনো আসনে কে প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়েও ব্যাপক আগ্রহ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে। এ আগ্রহ ভোটারদের মধ্যেই থাকবে। কারণ এদের ভোটেই নেতা নির্বাচিত হয়ে দামি গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ায়। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বহুবার বলা হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বা এলকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিতর্কিত, এমন কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে তরুণ প্রার্র্থী মনোনয়নের কথাও জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে।

দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে। গত নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ না নিলে নানা জটিলতায় পড়বে। সবদিক বিবেচনায় এবার আর নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে না বিএনপি। কারণ, এবার নির্বাচনে না এলে দলটি অস্তিত্ত সংকটে পড়তে পারে। তাছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি কারচুপির অভিযোগ করলেও একটি সিটি করপোরেশনে কিন্তু বিএনপি জয়লাভ করেছে। ফলে তাদের কিছুটা আত্মবিশ^াসও রয়েছে। এসব ছাড়াও নির্বাচনে ইভিএম ব্যাবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে দলগুলো ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছে, তাদের সন্দেহ ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণে কারচুপি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যদি ইভিএম ছাড়াও যেসব নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী কি কারচুপির অভিযোগ করেনি? ইভিএম না দিলে কি অতীতের নির্বাচনগুলোর মত কারচুপি অভিযোগ করা যাবে না। তাছাড়া প্রযুক্তি যখন সবখানে তখন নির্বাচন প্রযুক্তির মাধ্যমে হলে সমস্যা কোথায়? আমাদের দেশের রীতিই হলো পরাজিত হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে দাবি করা হয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে আমরা এটাই দেখেছি। জিতলে সব ঠিক আছে হারলেই কারচুপি। সম্প্রতি মালদ্বিপের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে মেনে নেওয়ার রীতি তৈরিই হয়নি। নির্বাচনে পরাজিত হলেই কারচুপির অভিযোগ। এই যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে।

গণতন্ত্র অর্থ জনগণের শাসন। যেখানে জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। জনগণই প্রতিনিধি নির্বাচিত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। সৎ নেতা নির্বাচন করা আজকাল বেশ কষ্টের। ভোটের আগে বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে ভোট প্রার্থনা করা অনেক নেতাকেই ভোটের পরে পাওয়া যায় না। নেতার টিকিটিরও খবর পাওয়া সাধারণ জনগণের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তখন তো তিনি বড় নেতা। তার ব্যবহারের জন্য দামি গাড়ি, আশেপাশে চাটুকারের দল ভিড় জমায়, তাকে নিরাপত্তা দিতে কতজন থাকে। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার কোথায়। আমাদের দেশে এবং সারা বিশে^ বহু নেতা জনগণের মাঝে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। কারণ, নেতার স্থানই জনগণের হৃদয়। একবার সেখান থেকে বের করে দিলে আর সে আসনে বসা যায় না। হৃদয়ের মণিকোঠা তাই সবার জন্য নয়। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের মণিকোঠায় রয়েছেন। তিনি সর্বদা তার জনগণের কথা ভেবেছেন। তাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেছেন। দেশের জন্য বন্দুকের নলের সামনে বুক আগলে দাঁড়িয়েছেন। তাই তো তিনি আমাদের সবার ভালোবাসা শ্রদ্ধার মানুষ। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় নেতা হওয়া যায় না। জনগণই যে সব ক্ষমতার উৎস। রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রবিন্দুই জনগণ। তাই ভোটের আগে কোলাকুলি করে ভোটারের মন জয় করে ভোট শেষে তা ভুলে গেলে চলবে না। বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে কোনো লাভ নেই। কারণ সেগুলো বাস্তবায়ন না করতে পারলে জনগণ সে প্রতিশ্রুতি বিশ^াস করে না। এমনিতেই আমাদের দেশের অনেক রাজনীতিবিদের কথা বিশ^াস করা জনগণের জন্যই কঠিন। রাজনীতির তাপ-উত্তাপ তাই জনগণের গায়েই প্রথম লাগে। গাড়ির কালো কাঁচের ভেতর নয়, সাধারণের ভেতর রাজনীতিবিদকে নিজেকে উজাড় করতে হবে। জনগণের মূল্যায়ন পেতে হলে জনগণের মতামতের মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, গণতান্ত্রিক দেশে জনগণই শেষ রায় দেওয়ার মালিক। কল্যাণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল ফাঁকা বুলি আওরে জনগণের মূল্যায়ন পাওয়া যাবে না।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, রাজনীতি করলে সমালোচনা সহ্য করতে হয়। কথাটা সত্য। সমালোচনা করার অধিকার জনগণের আছে। আর তারা সেটা করবেই। বিরক্ত হলে চলবে না। যে জনগণ তাকে ফুলের মালা পরিয়ে রাজ সিংহাসনে বসায় সেই জনগণই একসময় তাকে সেখান থেকে টেনে নামায়। কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন খুব দরকার। ভালো মানুষ যদি রাজনীতি দেখে নাক সিটকায়, তাহলে রাজনীতিতে শুদ্ধতা বলে একসময় কিছু থাকবে না। যে কেউ খোলস পাল্টে পকান দলের লেবেল ঝুলিয়ে রাজনীনিতির মাঠে নেমে পড়বে আর তাকে নেতা বলে মেনে নিতে হবেÑ এটা ঠিক নয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কথা বলেছেন। যে কেউ যেকোনো সময় রাজনীতিতে ঢুকে পড়তে পারে। তার জন্য কোন সার্টিফিকেটের দরকার হয় না, কোনো সুপারিশের দরকার হয় না বা কোনো ঘুষের দরকার হয় না। যা দরকার হয়, তা কেবল মিছিল মিটিং করার যোগ্যতা। গলা ফাটিয়ে নেতার পক্ষে সেøাগান দেওয়ার ক্ষমতা আর জ্বি হুজুর করার অভ্যাস। তাহলেই একসময় কর্মী থেকে নেতা হওয়া যায়। আজকাল অবশ্য দেশে কর্মীর চেয়ে নেতার সংখ্যাই বেশি। সবাই যদি বক্তা হয়, তবে শ্রোতা হবে কে? আজ রাজনীতিতে নেতা নয় কর্মী দরকার। তাছাড়া অধিক সন্যাসিতে গাঁজন নষ্ট হওয়ার মতো অবস্থা হবে। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সংসদীয় আসনগুলোতে বিভিন্ন দল থেকে জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন করার কাজ চলছে। একটা কথা মাথায় রাখা দরকার, কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়া প্রয়োজন। জনগণ যাকে পছন্দ করে বিশ^াস করে, তাকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। সবকিছু মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন উত্তপ্ত। তার কারণ একটাইÑজাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকারের দিকে এখন সবার দৃষ্টি। রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি জনসাধারণও আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে কেমন হয় নির্বাচনকালীন সরকার। তবে রাজনীতির তাপ-উত্তাপ যাইহোক না কেন, তার আঁচ থেকে যেন জনগণ মুক্ত থাকতে পারে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

 

"