পর্যালোচনা

সোনালি সম্ভাবনায় সোনালি ব্যাগ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

শাকসবজি, ফলমূল, মাছ-মাংস, চাল-ডাল, লবণ, চিনি ও হলুদ-মরিচসহ সব নিত্যপণ্য বিক্রয়েই ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যাগ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মূল কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পলিথিনের ব্যবহার। সস্তা ও অন্য বিকল্প না থাকায় নানা সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এই সব ব্যবহৃত পলিথিন সুয়ারেজ পাইপ, ড্রেন, নদী, নালা, খাল, বিলে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া এই পলিথিন ব্যাগ মাটির উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট করছে এবং ভরাট করছে নদীর তলদেশ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মতে রাজধানী ঢাকাসহ সরাদেশে প্রায় এক হাজার ২০০ কারখানায় নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরি হচ্ছে। এগুলোর বেশির ভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকা শহরের একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন ২ কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়।

সরকার পোলট্রিফিডসহ চাল-ডাল, লবণ, চিনি, সার ও গমসহ বেশ কয়েকটি পণ্যে পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন প্রণয়ন করেছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, পলিথিন ছাড়া পাটের ব্যাগের মাধ্যমে পোলট্রি ফিড, চিনি, লবণ ও সার মোড়কজাত করলে পাটের ব্যাগের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে ওইসব পণ্যের মান তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এতে ব্যবহারকারী ও উৎপাদনকারী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া পলিথিন ব্যাগের চেয়ে পাটের ব্যাগের দাম ৩ থেকে চারগুণ বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ ও খুচরা মূল্য বেড়ে যাবে।

এসব অসুবিধা বিবেচনা করে পাট থেকে সাশ্রয়ী মূল্যের পলিব্যাগ উৎপাদন করার জন্য অনেক দিন ধরে গবেষণা করে আসছেন আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা। অবশেষে বাংলাদেশ আণবিক কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমদ খান উদ্ভাবন করেন পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের এক নতুন প্রযুক্তি। পাটের সেলুলোজ থেকে পচনশীল পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ইতোমধ্যে তিনি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টাও তিনি। তার তত্ত্বাবধানে বিজিএমসির আওতাধীন লতিফ বাওয়ানী জুটমিলে পরীক্ষামূলক স্বল্প পরিসরে উৎপাদন হচ্ছে এই পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ। এখন যে মেশিনে ব্যাগ তৈরি হচ্ছে তার পুরো ডিজাইনও করেছেন ড. মোবারক আহমদ খান। তার ২০ বছরের গবেষণার ফল এই সোনালি ব্যাগ। এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি এই বিজ্ঞানীকে ২০১৫ সালে স্বর্র্ণপদক প্রদান করেছে। এর বাইরেও তিনি পাটের সঙ্গে পলিমারের মিশ্রণে ঢেউটিন জুটিন, টয়লেটের সø্যাব, চেয়ার-টেবিল ও হেলমেটসহ নৈমিত্তিক ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেছেন।

লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ফেলে দেওয়া পাটের অংশ থেকে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এক হাজারের মতো ব্যাগ। বর্তমানে এক কেজি পলিথিন ব্যাগের দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। আর নতুন উদ্ভাবিত এই প্রতি কেজি পলিথিন ব্যাগের দাম পড়বে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। এরই মধ্যে দেশের রফতানিমুখী শিল্প মালিকরা এই ব্যাগ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এই ব্যাগ কেনার চাহিদা আসছে।

বর্তমান সরকার কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, পাটজাত পণ্য রফতানি, অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন বর্জনের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পাটকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে ২৩৫ প্রকার পণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র চালু করেছে। পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যবহার বহুমুখী করণ ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পাটপণ্য উৎপাদন, বাজারজাত করণ ও ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারকোল, ভিসকোস ও পাটপাতার পানীয়সহ নতুন নতুন বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাট থেকে তৈরি এই পলিথিন ব্যাগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ সোনালি ব্যাগ’। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের পছন্দের নাম। সারা বিশ্বে এই নামেই পরিচিত হবে পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব পলিথিনের ব্যাগ। পলিথিন ব্যাগ ছাড়াও পাট থেকে অনেক কিছু উৎপাদন করছে বাংলাদেশ। পাট থেকে বিমানের ইন্টেরিয়র তৈরি হয়। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন পাট থেকে উৎপাদিত পণ্যের সংখ্যা ছিল ৩৫টি। বর্তমানে পাট থেকে উৎপাদিত পণ্য ২৮৫টি। এক সময়ের সোনালি আঁশ নামের পাট ভবিষ্যতে সোনার বার হিসেবে পরিচিত হবেÑসে সময় আর বেশি দূরে নয়।

দেশ-বিদেশে সোনালি ব্যাগের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশে প্রতিদিন ৫০০ টন সোনালি ব্যাগ উৎপাদন হলেও তা বাজারজাতকরণে কোনো অসুবিধা হবে না। পাট থেকে পলিথিন তৈরির উদ্ভাবক ড. মোবারক আহমদ খান জানান, এই সোনালি ব্যাগ পরিবেশবান্ধব এবং এটাকে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। জানা যায়, নতুন উদ্ভাবিত পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে। পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ মাটিতে ফেললে অল্প সময়ের মধ্যেই মাটিতে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না। এই ব্যাগ দামেও সাশ্রয়ী । এতে পাটের ব্যবহার বাড়বে এবং ন্যায্যমূল্য পাবেন কৃষক। বিশ্বব্যাপী পলিথিন পরিবেশ বিপর্যয়কারী পণ্য হিসেবে চিহ্নিত। তাই সোনালি ব্যাগ ঠিকমতো বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারলে অতীতের মতোই বাংলাদেশ পাট দিয়ে নতুনভাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

পাট থেকে পরিবেশবান্ধব পলিথিন উৎপাদন সারা বিশ্বে এটি প্রথম এবং একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। পরিবেশবান্ধব এই পণ্যটি আবিষ্কার করে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃতী বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে ম্যানুয়াালি পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় এটা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটামোরা কোম্পানি ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ তৈরির মেশিনারিজ ডিজাইন করবে এবং তৈরি করবে। বাংলাদেশে এসে সেটা প্রতিস্থাপনও করবে কোম্পানিটি। বাণিজ্যিক উৎপাদন পর্যন্ত তারা দায়িত্ব নিবেন। তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতেও রাজি আছেন। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন হবে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণে। কারখানাটি হবে ডেমরায় বাওয়ানি জুট মিলের নিজস্ব জায়গায়। বিশ্বের অনেক দেশে খোঁজাখুঁজি করে পাট থেকে সেলুলোজ উৎপাদনের মেশিন তৈরির কোনো কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফুটামুরা নামের একটি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যায়। কোম্পানটি কাঠের সেলুলোজ থেকে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওই কোম্পানিটিকে পাট সরবরাহ করা হয়েছে। আশা করা যায়, কোম্পানিটি পাট থেকে সেলুলোজ তৈরির মেশিন তৈরি করতে সক্ষম হবে।

জানা গেছে, পচনশীল পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ তৈরির উদ্দেশে পাট থেকে সেলুলোজ আহরণ করা হয়। ওই সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে অন্যান্য পরিবেশবান্ধব দ্রবাদির মাধ্যমে কম্পোজিট করে এই ব্যাগ তৈরি করা হয়। এই ব্যাগে ৫০ শতাংশের বেশি সেলুলোজ বিদ্যমান। এতে অন্য কোনো অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার করা হয় না। তাই এটি ২-৩ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মাটিতে মিশে যায়। নতুন উদ্ভাবিত এই ব্যাগের ভার বহন ক্ষমতা পলিথিনের প্রায় দেড়গুণ এবং এটি পলিথিনের মতো স্বচ্ছ হওয়ায় খাদ্য দ্রবাদি ও তৈরি পোশাকশিল্পের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহাররে জন্য খুবই উপযোগী। পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পৃথিবীতে বাড়ছে পলিথিন বিকল্প ব্যাগের চাহিদা। বর্তমানে প্রতি বছর পৃথিবীতে ৫০০ বিলিয়ন পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জোড়ালো আন্দোলনের কারণে অচিরেই সারা পৃথিবীতে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব ‘সোনালি ব্যাগ’ বিশ্ববাজার দখল করার মতো বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।

লেখক : নিতাই চন্দ্র রায়

সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.

netairoy18@yahoo.com

 

"