বিশ্লেষণ

পারমাণবিক বিপর্যয় ও অগ্রযাত্রা

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? আর কতটুকুই বা নিরাপদ? জাপানের ফুকুশিমা আর চেরনোবিল দুর্ঘটনার ভয়াবহ নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করে বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের বর্জ্য রাশিয়া তাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ফেরত নিয়ে যাবে। আর নিরাপদ ও নির্ভরশীলতার ব্যাপারে রাশিয়ার বিদ্যুতকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক মান নির্ণয়কারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির মান অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। তাই রাশিয়াকে উন্নত পরমাণু শক্তির পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রসমূহে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো মাথায় রেখেই রাশিয়া তার সর্বশেষ মডেলের আধুনিকায়ন করে। বাংলাদেশেও এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক, এটা আমরা চাই। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পারমাণবিক শক্তি অন্যান্য প্রকারের জ্বালানির চেয়ে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব। বর্তমানে বিশ্বে পারমাণবিক চুল্লির মাধ্যমে বিশ্বের মোট ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কেবল আমরাই এ থেকে পিছিয়ে আছি। সম্প্রতি ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লির দুর্ঘটনায় পরিবেশবাদিরা উদ্বিগ্ন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জার্মানিসহ বিশ্বের দু-একটা দেশ তাদের দেশে বিদ্যমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ আপাতত বাদ দিয়েছে। কিন্তু এটা উল্লেখ্য যে, ওইসব দেশসমূহে পারমাণবিক শক্তি ছাড়াও নবায়নযোগ্য আরো অন্য প্রকার শক্তি আছে, যা থেকে তারা তাদের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারে। যা বাংলাদেশের মতো একটি দেশের পক্ষে সম্ভব হবে কি না, তা প্রশ্নবিদ্ধ।

পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রে নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এর নিরাপত্তা ব্যাবস্থা। এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে চুল্লি নির্মাণ আত্মহত্যার শামিল। ইতোমধ্যেই পৃথিবীবাসী বেশ কয়েকটি পারমাণবিক দুর্ঘটনার সাক্ষী। সর্বশেষ প্রলয়কারী ভূমিকম্প ও সুনামিতে জাপানের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয়ের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ জাতিয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দালন গড়ে ওঠে। এরপর বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশের বিজ্ঞানী, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠান ও সরকার আলোচনা করেছে। সর্বশেষ গত জুন মাসে জেনেভায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশেও এই তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। সামান্য সমস্যা সৃষ্টি হলেই কেন্দ্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাকটর হচ্ছে, ‘প্রেসারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাকটর’। বাংলাদেশেও এ পদ্ধতিই ব্যবহার করা হবে। এই পদ্ধতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো সর্বোত্তম বলে বিবেচিত। রাশিয়ার পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সের্গেই কিরিয়েনকো বলেন, ‘এই বিদুৎ কেদ্র স্থাপনে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহূত হবে। চার হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন বিমান বা ক্ষেপণান্ত্র এখানে আঘাত করলেও কিছু হবে না।

সর্বোপরি, নিরাপত্তার বিষয়টি কেবল জাতিয়ভাবেই নয় আন্তর্জাতিকভাবেও দেখা হয়। এ জন্য আইএইএ (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন) সব সময় প্রস্তুত। যে দেশেই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র হোক না কেন, তার শুরু থেকে আইএইএ নিরাপত্তার দিকটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে। তবে এতসব উত্তরে সন্তুষ্ট নন পরিবেশবদি এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধীরা। তাদের বক্তব্য হলো, কখনোই খুব জোর দিয়ে বলা উচিত নয় যে, সব কিছুই নিরাপদ। কোথাও কোনো সমস্যা নেই এবং হবে না। সমস্যা যেকোনো দিক দিয়ে আঘাত করবে, সেটা বলা যায় না। কম্পিউটারে বিভিন্ন ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে। তাহলে সমগ সিষ্টেম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। উল্লেখ্য, মাত্র কয়ক মাস আগেই ইরানের পারমাণবিক চুল্লিগুলো ভাইরাসে আক্রমণে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। জাপানিরা ভাবতেই পারেনি যে, তদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সুনামির আঘাত হতে পারে। কোনো দুর্ঘটনা স্বেচ্ছায় ঘটে না সেটা আকস্মিক ভাবেই ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আর এ ধরনের ঘটনার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারেÑ তা জানতে আমাদের আরো বেশি করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন রূপপুর প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় রূপপুর প্রকল্প নিয়ে সমীক্ষা করা হয়, সেগুলোর গুণবিচার করা হচ্ছে। বর্তমানে রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে রূপপুরের ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়াগত বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একটি পারমাণবিক শক্তির চুল্লি স্থাপনের পূর্বে সেই অঞ্চলের পরিবেশ, ভূ-কম্পণ প্রবণতা, হাইড্রোলজি, আবহাওয়াবিদ্যা, জনসংখ্যা এবং শিল্প-পরিবহন ও সামরিক স্থাপনাসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে হয়।

এ ছাড়া অগ্নিকান্ড, বিস্ফোরণ, বিকিরণ, ও দুর্ঘটনার কারণে মহাবিপর্যয় ঘটতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণে আন্তর্জাতিক মানের নিউক্লিয়ার বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লির দুর্ঘটনার ফলে ক্যানসারজনিত রোগের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যেসব স্থানে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে সেসব স্থানে জন্ম নেওয়া সব শিশুই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। জমির উর্বরতা চিরদিনের জন্য বিনষ্ট হয়। পারমাণবিক চুল্লিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার পর সৃষ্টি হয় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, যা জীবজগত ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। যতই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেন, তারপরেও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও কারিগরি ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম-বেশি থেকেই যায়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমানে যে হারে ব্যবহার হচ্ছে তাতে আগামী ৪০ থেকে ৬০ বছর পর ইউরেনিয়াম আর পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাধারণভাবে একটি পারমাণবিক চুল্লি পরিবেশের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশেপাশে বসবাস করলে একজন মানুষের শরীরে যেটুকু তেজস্ক্রিয়তা ঢুকবে, তা একটি টেলিভিশন সেটের সামনে বসলে যেটুকু ঢোকে তার সমান। অর্থাৎ তা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য অসহনীয় মাত্রার। অন্যান্য বর্জ্য তেমন মারাত্মক নয় এবং তা ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই থাকবে। তবে কোনো কারণে যদি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এতে যে ক্ষতি হবে তা কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনীয় নয়। একবার তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে মাটি পানি বায়ুসহ সমগ্র পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এমনকি এটা বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে।

পরিবেশের এই ক্ষতি আবার সেই অঞ্চলে আবদ্ধ থাকে না তা আশে পাশের অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো এটার প্রভাব মাটিতে, পানিতে এবং মানুষ দেহে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী। আশেপাশের পশুপাখি এবং ফসলে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব কারণেই পরিবেশবিদরা এই বিদ্যুত কেন্দ্রের বিরোধিতা করছেন। তাদের বিরোধিতার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্ধিত মেয়াদসহ ৮০ বছর। এই ৮০ বছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ আমরা পাব এবং যে পরিমাণ আর্থিক লাভ আমাদের হবে। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ লাভের চেয়েও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিস্ফোরণের পর সরা দুনিয়া জুড়েই বিদ্যুতকেন্দ্রসহ সব পারমাণবিক প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন পরিবেশবিদরা। এ ছাড়া পরমাণু বিদ্যুতকেন্দ্রের বিরুদ্ধে একটি প্রবল জনমত গড়ে উছেছে দুনিয়া জুড়েই। বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। ৩৫টি দেশের ৪৪০টি পারমাণবিক চুল্লিতে এই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১০৪টি রিয়েক্টর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে শীর্ষ স্থানে। যেখানে উৎপাদন হয় তাদের চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ। ফ্রান্সের ৫৯টি রিয়েক্টর সে দেশের মোট উৎপাদনের ৭৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বর্তমানে যেসব দেশে আরো রিয়েক্টর নির্মাণাধীন রয়েছে তারমধ্যে শীর্ষে রয়েছে চীন ও ভারত। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৪টি দেশে প্রায় ১৪৩টি পরমাণু চুল্লি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ব্রিটেনে ১৯টি পরমাণু চুল্লি রয়েছে, যার সবগুলোই সক্রিয়। ফ্রান্স ও জার্মানি অনেক দিন ধরেই পরমাণু চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে চাইছে।

এমনকি তারা নতুন কোনো চুল্লি না বসানোর ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমান চুল্লিগুলোর মেয়াদ শেষ হলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। বেলজিয়ামে পাঁচটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তাদের ৫৮ শতাংশ বিদ্যুৎ, সুইডেনে ৪৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪০ শতাংশ এবং জাপানে ৫৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। আমাদের প্রতিবেশী ভারত পারমাণবিক শক্তি থেকে ২০১১ সালে ৬৭৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদরে ক্ষমতাবিশিষ্ট পারমাণবিক কেন্দ্র রয়েছে। ভারতে বর্তমানে ২০টি পরমাণু চুল্লি রয়েছে। প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশগুলো এগিয়ে চলেছে। আমাদেরও পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। পরিবেশবিদদের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা ও ক্ষয়-ক্ষতির বিষয়ে আগাম সর্তকতা নিতে হবে। নিজস্ব বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানী গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। এ বিষয়ে লেখাপড়া ও গবেষণা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

 

"