বিশ্লেষণ

অনাচারের বিপরীতে বিদ্রোহ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

অলিউর রহমান

বৈশ্বিক উষ্ণতাজুড়ে চলছে এখন ভয়াবহ ভয় এবং শঙ্কা। কখনো ভূমিকম্প, কখনো ঝড়ুজলোচ্ছ্বাস আবার কখনো সুনামির মতো ভয়াল থাবা মানুষের সবকিছু কেড়ে নেয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। মানুষ যখন প্রকৃতির বিপরীতে চলতে থাকে, প্রকৃতি তার বদলা নেয়। জলবায়ুর পরিবর্তনে প্রাকৃতিক পরিবেশ এখন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। তাই বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসির দ্বীপের মানুষ বিপাকে পড়ে কাঁদছে। ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী সুনামির ছোবলে ল-ভ- হয়েছে দ্বীপের অধিবাসীরা। সেখানে মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এখনো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে অনেক লাশ। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দ্বীপের প্রায় আড়াই লাখ লোক। বাড়ি-ঘর, সড়ক, বিদ্যুৎব্যবস্থাসহ সবকিছু ভেঙেচুরে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখনো সমুদ্রে লাশ ভেসে চলছে। ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প এবং সুনামির ২০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের তোড়ে দ্বীপটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতের কেরালা রাজ্যে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জাপানের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ ঝড় টাইফুন। বেশ কয়েক বছর আগে জাপানের ওপর বয়ে যাওয়া সুনামির চিহ্ন এখনো যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঝড়ের মোকাবিলা করতে হয়েছে। ঝড়ে কয়েকটি রাজ্যকে এলোমেলো করে দিয়েছে। প্রকৃতি মানুষের ওপর কেন এমন নাখোশ হয়েছে? তা এখনই ভাবতে হবে। তবে এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোয়ই আক্রমণ চালাচ্ছে, তা নয়, ধনী দেশও এখনো ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে পড়ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে জলবায়ুতে দেখা দিয়েছে বিরাট পরিবর্তন। তাতে প্রাকৃতিক পরিবেশও এখন বেসামাল হয়ে পড়ছে। বিশ্ব উন্নত হচ্ছে। তার সঙ্গে বাড়ছে নিত্যনতুন শিল্পায়ন। তাতে ব্যবহার হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি। এর প্রভাবে বায়ুম-লে ব্যাপক হারে কার্বন-ডাই অক্সাইড বাড়ছে। পৃথিবী একটা গ্রিন হাউসের মতো। কার্বন-ডাই অক্সাইড, মিথেন ও অপরাপর গ্রিন হাউস গ্যাস সূর্যের আলোয় উত্তপ্ত তাপ বায়ুম-লে আটকে রাখে। আর এর ফলে পৃথিবী জীবনের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে। যদি গ্রিন হাউস প্রভাব না থাকত, তাহলে পৃথিবীর তাপমাত্রা থাকত মাইনাস ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বায়ুম-লে তাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে। মেরু অঞ্চলের বরফ অনেক সময় আয়নার মতো কাজ করে থাকে। এর ওপর পতিত আলো ৯০ শতাংশ বায়ুম-লে ফিরে যায়। আর যতটুকু অবশিষ্ট থাকে, তার আবার ৯০ ভাগ শোষণ করে পানি। পানি আবার এই তাপ শোষণ করে বরফ গলিয়ে দেয়। অন্যদিকে প্রতি বছর মানবসৃষ্ট কার্বন-ডাই অক্সাইডের ৫০ শতাংশ শোষণ করে মহাসাগরের পানি। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে এই পানি গরম হলে তা ক্রমহ্রাসমানভাবে কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং উপরিতল এবং গভীরতল পানির মিশ্রনে বাধা তৈরি করে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো দ্রুততর হয়। অন্যদিকে কার্বন-ডাই অক্সাইডের চেয়ে মিথেনের গ্রিন হাউস তীব্রতা ২০ গুণেরও বেশি। সাইবেরিয়া অঞ্চলে ১০ বিলিয়ন টনের বেশি সঞ্চিত জৈববর্জ্য বিপুল পরিমাণ মিথেন ধারণ করে আছে, যা বর্তমান সময়ের মনুষ্যসৃষ্ট ৭০ বছরের গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের সমান। তাই সাইবেরিয়ার বরফ গলে যাওয়ার কারণে নির্গত মিথেন ধরে রাখার কোনো উপায় নেই। তাই এই মিথেন বায়ুম-লে আবার ফিরে যাচ্ছে।

বায়ুম-লে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ প্রতি ১০০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় গড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বরফ যুগের সঙ্গে উষ্ণ যুগের তাপমাত্রার পার্থক্য। এক পরিসংখ্যায় জানা গেছে, ১৭৫০ সালের আগে ছয় লাখ বছরের বায়ুম-লে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ ১৮০ থেকে ৩০০ পিপিএম ছিল, ২০০৫ সালে তা হয়েছে ৩৭৯ পিপিএম; মিথেন ছিল ৩২ থেকে ৭৯০ পিপিবি (পার্টস পার বিলিয়ন), ২০০৫ সালে তা হয়েছে ১৭৭৪ পিপিবি; নাইট্রাস অক্সাইড ছিল ২৭০ পিপিবি, ২০০৫ সালে তা হয়েছে ৩১৯ পিপিবি। বায়ুম-লে এসব গ্যাস ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। মিথেন, নাইট্রাসসহ অন্যান্য গ্যাস হিসাব করলে বায়ুম-লে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৩০ পিপিএম কার্বন-ডাই অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট। ধারাবাহিকভাবে এভাবে গ্যাস বৃদ্ধি থাকলে বায়ুম-লে ২০৫০ সাল নাগাদ গ্যাসের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৫০ থেকে ৭০০ পিপিএম কার্বন-ডাই অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট এবং ২১০০ সাল নাগাদ গিয়ে দাঁড়াবে ৬৫০ থেকে ১২০০ পিপিএম কার্বন-ডাই অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট। গ্রিন হাউস গ্যাসের এ প্রবণতা চলতে থাকলে ২১০০ সালে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাবে। এমনকি তা বেড়ে ৪ ডিগ্রি থেকে ৬.৪ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে। এমনিতেই পৃথিবী এখন উষ্ণতম সময় পার করছে। তার ওপর যদি শিল্পায়নের কবলে পড়ে গ্রিন হাউস গ্যাসের বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা চলতে থাকে, তাহলে মানুষের জীবন, অর্থনৈতিক কাঠামো ও প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসযজ্ঞে সূচনা ঘটতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমপক্ষে ১৮ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিমিটার, এমনকি তা ২৬ থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। গড় তাপমাত্রা, দাবদাহ ও তীব্র বৃষ্টিপাত বাড়বে ব্যাপক আকারে। তা ছাড়া খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, টাইফুন, হ্যারিকেনসহ মৌসুমি ঘূির্ণঝড়ের ব্যাপকতা এবং উঁচু জোয়ারের প্রচ-তা বাড়বে তীব্রভাবে। আর্কটিক ও এন্টার্কটিকার বরফ দ্রুত কমে আসবে ও গ্রীষ্মকালে তা বিলোপ পাবে। তাই গ্রিন হাউস গ্যাসের নিরাপদ মাত্রা ৩৫০ পিপিএমে নামিয়ে আনতে হবে। না হলে পৃথিবীর অপরিমেয় এবং অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

গত দুই দশকে জলবায়ুর প্রভাবে দুর্যোগের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে চার গুণ। ১৯৮০ দশকে দুর্যোগের ঘটনা ছিল ১২০টি। সেখানে বর্তমানে পৌঁছায় ৫০০-এর ওপরে। বন্যা বেড়েছে ছয় গুণ। বন্যা ও ঝড় ৬০টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪০টিতে। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ছিল ১৭৪ মিলিয়ন, ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে তা দাঁড়িয়েছে ২৪০ মিলিয়নে।

বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ুর প্রভাব সম্পর্কে বহুদিন ধরেই সতর্কবাণী করে এলেও স্বল্পোন্নত এবং ধনী দেশগুলো তাতে কর্ণপাত করেনি। তাদের বিরতিহীন চাপে অবশেষে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বহুপক্ষীয় কাঠামো ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেন্ট চেঞ্জ। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় অনুষ্ঠিত ১৯২টি সদস্য দেশ জলবায়ু বিষয়ে একমত পোষণ করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতার কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ইউএনএফসিসিসির কিয়োটা প্রটোকল ১৭৫টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়, যা ২০০৫ সাল থেকে কার্যকর করা হয়। সবশেষ প্যারিসে ১৯২টি দেশের প্রতিনিধি নিয়ে সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ধনী দেশগুলোর সৃষ্ট জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ঘোষণা আসে। কিন্তু তাও এখন পর্যন্ত কাক্সিক্ষত রূপে লাভ করতে পারেনি। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কার্বন নির্গমনে বিভিন্ন দেশের দায়ভার এবং জাতিসংঘ মানব উন্নয়ন সূচিতে তাদের অবস্থানের ভিত্তিতে ধনী দেশের ব্যয় সক্ষমতার মাত্রা নির্ধারণ করে গরিব দেশগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন ব্যয়ের শতকরা ৪৪ ভাগ বহন করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে, ১৩ ভাগ বহন করতে হবে জাপানকে, ৭ ভাগ বন করতে হবে জার্মানিকে, ৫ ভাগ বহন করতে হবে যুক্তরাজ্য, ৪-৫ ভাগ বহন করতে হবে ইতালি, ফ্রান্স ও কানাডাকে এবং ৩ ভাগ বহন করতে হবে স্পেন, অস্টেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে। কিন্তু প্যারিসের সেই ওয়াদা ধনী রাষ্ট্র এবং অনেক শিল্পোন্নত রাষ্ট্র তা মানেনি।

বৈশ্বিক উষ্ণতার কবল থেকে আমাদের মানবসম্পদ, কৃষি এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০০৭ সালে সিডর আক্রমণ করার সময় সুন্দরবন বুক পেতে দিয়ে উপকূলীয়বাসীকে রক্ষা করেছিল। তার অবদান অস্বীকার করার মতো নয়। তাই উপকূলীয় অঞ্চলে বনভূমি সৃষ্টির লক্ষ্যে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। সামনের ভবিষ্যৎ যেভাবে জলবায়ু আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করা গেলে সমস্যা যতই আসুক, আশা করা যায়, ততটা আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

oliurrahmanferoz@gmail.com

"