ইরান

মার্কিন হুমকি ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

গত কয়েক দশকে আমেরিকা বহুবার ইরানে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছে। জর্জ ডাব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলা চালান। এরপর বহুবার তিনি ইরানে হামলা চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ইরানের প্রতিরক্ষা শক্তি অত্যন্ত মজবুত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট বুশ ইরানে হামলা চালানোর সাহস দেখাননি। এরপর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা রয়েছে বলে একাধিকবার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে দেশটির শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। সর্বশেষ ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক হুমকি দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার একদিন পর অর্থাৎ গত ৯ মে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘ইরানকে হয় আলোচনায় ফিরে আসতে হবে অথবা কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।’ পরমাণু কর্মসূচি শুরু না করার জন্যও তিনি ইরানকে পরামর্শ দেন। তিনি হুমকি দেন ইরান যদি পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ না করে, তাহলে তাদের এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিসের বক্তব্যে ভিন্ন সুর লক্ষ করা যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, ইরানে হামলা চালানোর ক্ষমতা আমেরিকার নেই। আমেরিকা ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা করেছে বলে অস্ট্রেলিয়ার একটি গণমাধ্যম যে খবর দিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাকে ‘কল্পকাহিনি’ বলে উড়িয়েছে দিয়েছেন।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলও এ ধরনের খবর অস্বীকার করে একে কল্পনাপ্রসূত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানে হামলার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইরানের যুদ্ধসক্ষমতা সম্পর্কে তারা ভালোভাবেই অবহিত আছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এটাও জানেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে মার্কিন বাহিনী চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। সম্প্রতি ইরান ও আমেরিকার কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও বাকবিত-া শুরু হয়েছে। ইরানের তেল বিক্রির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তার জবাবে প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, ট্রাম্পের এটা জেনে রাখা উচিত, ইরান দীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলের পানিপথের নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট রুহানি ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘সিংহের লেজ নিয়ে খেলবেন না, কারণ ইরানের জবাবে আপনাদের অনুতপ্ত হতে হবে।’ এর জবাবে ট্রাম্পও রুহানিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আমেরিকাকে কখনো হুমকি দেবেন না এবং ইরানের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইতিহাসে, যার নজির খুব কম। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এসব হুমকি ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি ডেমোক্র্যাট দলের বহু নেতা এর সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সুলাইমানি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলে আমেরিকার পতন অনিবার্য। আমেরিকা যুদ্ধ শুরু করলে এর সমাপ্তিটা কেমন হবে, তা আমরাই নির্ধারণ করব। ভৌগোলিক দিক দিয়ে ইরানের অবস্থান, বিশ্ববাজারে দেশটির তেলের ব্যাপক চাহিদা এবং তেলের গুণগত মানের কারণে ইরানকে কোণঠাসা করা সম্ভব নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন এবং বাজারে তেলের ঘাটতি পূরণে সৌদি আরবকে বাড়তি তেল উৎপাদনের নির্দেশ দেওয়া থেকে তার সন্দেহ ও হতাশার বিষয়টি ফুটে ওঠে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবকে তেল উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা তাদের নিরাপত্তা দেবে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্য সৌদি আরবের জন্য খুবই অবমাননাকর এবং এ থেকে বোঝা যায়, তিনি আরবদের মূল্যায়ন করেন না। এ ছাড়া, সৌদি আরবের পক্ষে ইরানের তেলের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। ব্লুমবার্গ বার্তা সংস্থা এক প্রতিবেদনে বলেছেন, আগামী নভেম্বর থেকে ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর পক্ষে তার ঘাতটি পূরণ করা সম্ভব হবে না। যাই হোক, বর্তমানে বিশ্ববাজারে তেলের যে চাহিদা রয়েছে, তাতে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে সারা বিশ্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং এ বিপর্যয়ের জন্য ট্রাম্প দায়ী থাকবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার ইরানের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তেহরানকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে, ইতিহাসে খুব কমসংখ্যক লোকই এর পরিণতি ভোগ করেছে। ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসন যখন নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, তখন ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হুমকি এলো। ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি তার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুশিয়ারি দেন রুহানি বলেছিলেন, মি ট্রাম্প, সিংহের লেজ নিয়ে খেলবেন না, এর জন্য কিন্তু আপনাকে অনুতপ্ত হতে হবে। রুহানির হুমকির জবাবে নিজের টুইটার পেজে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প লেখেন : আর কখনোই আমাদের হুমকি দেবেন না। অন্যথায় এমন পরিণতি ভোগ করতে হবে, ইতিহাসে খুব কমসংখ্যক লোকই তা ভোগ করেছে। আমরা আর এমন কোনো দেশ নেই, যারা আপনাদের সহিংসতা ও মৃত্যুর শব্দে চুপ থাকবে। সতর্ক হোন। তেহরানে বিদেশে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট রুহানি আমেরিকার প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আরো বলেছিলেন, আমেরিকার জানা উচিত, ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলে সব শান্তির সন্ধান পাওয়া যাবে এবং তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার অর্থ হবে নিজেকে সব ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা। এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গতকাল ইরানবিরোধী এক বক্তৃতায় বলেন, ওয়াশিংটন চায় তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর আমেরিকার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সব দেশে ইরান থেকে তাদের তেল আমদানি কমিয়ে দিক। এমনকি সম্ভব হলে একেবারে বন্ধ করে দিক। ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে বলে আমেরিকা যে হুমকি দিয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, এ হুমকির ফলে তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের তেল বিক্রি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য আগামী নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি সৌদি রাজার সঙ্গে টেলিফোন সংলাপে ইরানের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনার জন্য ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা জানান। এ অবস্থায় ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দেশের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভব কি না এবং এমনকি এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হলে এর পরিণতিই বা কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের এক ফোঁটা তেলও বিক্রি করতে দেওয়া হবে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে হুমকি দিয়েছেন, সে ব্যাপারে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির পাল্টা হুমকি থেকে ওই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, বর্তমান বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় তা বাস্তবায়ন করা এত সহজ হবে না। প্রেসিডেন্ট রুহানি গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে ইরানিদের এক সমাবেশে বলেছেন, ‘ইরানের একফোঁটা তেল বিক্রি করতে দেওয়া হবে না বলে ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তা অর্থহীন। কারণ, অন্যরা বিক্রি করবে আর ইরান বিক্রি করতে পারবে না এটা হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘ইরানকে তেল বিক্রি করতে দেওয়া না হলে এর ভয়াবহ পরিণতি তারা দেখতে পাবে।’ হাসান রুহানি বলেন, আমেরিকা চায় ইরানে কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। তারা দেশের ভেতরে গোলযোগ সৃষ্টি করতে চায় এবং এমন অবস্থা তৈরি করতে চায়, যাতে তারা একদিন এই দেশে ঢুকতে পারে যেমনটি পুরনো দিনগুলোয় ছিল। কিন্তু এখন তা আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট রুহানি আরো বলেন, এটা হচ্ছে আমেরিকার ত্রুটিপূর্ণ স্বপ্ন, যা কখনো পূর্ণ হবে না। পরমাণু সমঝোতা থেকে আমেরিকার বের হয়ে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে ড. রুহানি বলেন, আমাদের জনগণ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং সংঘাত মোকাবিলার জন্য সরকার নিজেকে প্রস্তুত করেছে। আমেরিকা যা করেছে, তার জন্য একসময় দুঃখ করবে, কারণ তারা খুব খারাপ কিছু বেছে নিয়েছে। আহওয়াজের হামলা প্রসঙ্গ টেনে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, কারা এ হামলা চালিয়েছে, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং কাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রয়েছে, তার সবই আমাদের কাছে পরিষ্কার। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশকে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা উসকানি দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন ড. রুহানি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর দেশটির ইরানবিরোধী তৎপরতা বহু গুণে বেড়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ৮ মে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধের ডাক দিলেও আন্তর্জাতিক সমাজের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন। রুহানি বলেছেন, আমরা যেকোনো কিছুর জন্যই আলোচনা চাই এবং আমরা ইস্যুগুলোর সমাধান চাই। কিন্তু আমরা কোনটা বিশ্বাস করব? আপনাদের নরম বার্তাগুলো, নাকি আপনাদের বর্বর কাজগুলো? যদি আপনারা সত্যবাদী হন এবং ইরানের জনগণকে পছন্দ করেন, তাহলে আপনারা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন কেন? প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, আমেরিকা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রচারযুদ্ধ চালাচ্ছে, তবে মার্কিন নেতারা যদি মনে করে থাকেন যে, চাপের কাছে নতিস্বীকার করবে ইরান, তাহলে তারা ভুল করছেন। প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, ‘যদি আপনারা মনে করেন, দুই মাস, তিন মাস, চার মাস অথবা এক বছর পর চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমে এসে হাত তুলে বলবে, আমরা আমেরিকা ও হোয়াইট হাউসের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, তাহলে তা হবে আমেরিকার জন্য একটি অলীক স্বপ্ন।

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

raihan567@yahoo.com

"