বিশ্লেষণ

খাঁচার ভেতর বসবাস

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

মযহারুল ইসলাম বাবলা

ফ্ল্যাটে বসবাসের বিষয় সর্বপ্রথম জেনেছিলাম যুক্তরাজ্য প্রত্যাগত আমার নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে। সেটা প্রায় ৪৫ বছর আগে। শুনে অবাক ও বিস্মিত হয়েছিলাম। সেখানে কেউ বাড়ি কেনে না। ছাদ কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে। কিংবা তৈরি করা ফ্ল্যাট কেনে। উঠোন-আঙিনা বলে কিছু নেই। চার দেয়ালে ঘেরা দু-তিনটি থাকার ঘরসহ বসবাসের সব উপকরণ ফ্ল্যাটে মজুদ থাকে। বিশাল উঁচু বিল্ডিংয়ের প্রতি ফ্লোরে (তলায়) চার-ছয়টা পৃথক-পৃথক ফ্ল্যাটে পৃথক-পৃথক পরিবার বসবাস করে। আন্ডারগ্রাউন্ডে গাড়ির গ্যারেজ। এভাবে বন্দি খাঁচায় মানুষ কীভাবে বসবাস করে? এই ভাবনার কূলকিনারা তখন খুঁজে পাইনি। কল্পনায় ফ্ল্যাটে মানুষের বসবাসের বিষয় তখন বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল।

অথচ গত ২০-২৫ বছর ধরে বাংলাদেশেও ফ্ল্যাট বসার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ক্রমেই এর ব্যাপ্তি-বিস্তার কেবল শহরে নয়Ñশহরতলিতে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এতে তাৎক্ষণিক যেসব চরম অসুবিধা দেখা দিয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম পয়োনিষ্কাশন, পানির অপর্যাপ্ততা, বিদ্যুতের ঘাটতি, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং সড়কের যানজট। পাঁচ কাঠার একটি বাড়িতে যে পরিমাণ মানুষ বসবাস করত, এখন তার বিশ গুণ মানুষ ওই একই স্থানের অনেকগুলো ফ্ল্যাটে বসবাস করে। এতে সড়ক এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, পানিসহ নানা ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফ্ল্যাটে বসবাসকারী প্রায় সবারই ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। এতে প্রচ- যানজটের সৃষ্টি হয়ে থাকে। শহরের আবাসন সমস্যার অজুহাতে নানা স্থানে ফ্ল্যাটে নির্মিত হচ্ছে। খাল, বিল, জলাশয়, নদী, নালা ভরাট করে নানা পন্থায় আবাসন বাণিজ্যে পরিবেশ-প্রকৃতি বিনাশ হয়ে চলেছে। পরিবেশের ওপর সর্বনাশা অপতৎপরতায় শহরগুলো মানুষ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আকাশ এবং আলো-বাতাস রুখে দিচ্ছে বিশাল কাঠামোর সুউচ্চ ফ্ল্যাটগুলো। নাগরিক সুবিধা সাধারণের জন্য হুমকির কবলে। পরিবেশের ওপর অনাচারের মাশুল গুনছে সাধারণরা। নদী-নালা ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা মারাত্মক আকারে। মুনাফার গন্ধ পেলে পুঁজিবাদ সেখানে হাজির হয়। মুনাফার জন্য হেন কোনো অপকীর্তি নেই; যা পুঁজিবাদ করতে না পারে। কিছু মানুষের সুযোগ-সুবিধার করতলে সংখ্যাগরিষ্ঠের নাকাল অবস্থা এই ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে জাজ্বল্যমান।

বাংলাদেশ জনসংখ্যার তুলনায় ছোট দেশ। গ্রামের মানুষ গ্রামে থাকতে পারছে না। গ্রাম তাদের শহরমুখে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রামে কর্মসংস্থান নেই। শহরে রয়েছে। গ্রাম এবং শহরের সুযোগ-সুবিধা আকাশ-পাতালসম ব্যবধান। সে কারণে মানুষ শহরমুখী হতে বাধ্য হয়েছে। যৌক্তিক কারণে শহরে মানুষের চাপ ক্রমেই অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিকেন্দ্রীয়করণের বিপরীতে সবকিছুই এককেন্দ্রিক, অর্থাৎ শহরকেন্দ্রিক। তাই গ্রামের মানুষ শহরে ছুটে আসতে বাধ্য হচ্ছে। শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প আয়ের মানুষরা কোটি কোটি অর্থ বিনিয়োগে ফ্ল্যাট কেনার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তারা থাকে বস্তিতে-ঘিঞ্জি এলাকায় ঠাসাঠাসি করে। শহরে যাদের জমি-বাড়ি রয়েছে, তারা নগদ মোটা অর্থ এবং বিনে পুঁজিতে ফ্ল্যাটের পঞ্চাশ শতাংশের মালিক হওয়ার মোক্ষম সুযোগটি লুফে নিচ্ছে। ফ্ল্যাট নির্মাণে মান প্রসঙ্গে নানা অভিযোগের কথাও শোনা যায়। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারসহ আবাসন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরও মানুষ বুভুক্ষের মতো ফ্ল্যাট কিনতে ব্যাকুল। সরকারি-বেসরকারি অবসরপ্রাপ্তরা পর্যন্ত ব্যাংকের চড়া সুদে অর্থ গ্রহণ করে ফ্ল্যাট কিনছেন। গত দশ-পনেরো বছরে দেশে জায়গা-জমির মূল্য প্রায় বিশ গুণ বৃদ্ধিতে মানুষ ফ্ল্যাট কেনার পিছু ছুটতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রামের ফসলি জমি আবাদের জন্য আগামীতে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ফসলি জমিতে পাকা বাড়ি নির্মাণের হিড়িক যত্রতত্র প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতেই আমরা আমদানিনির্ভর দেশ। আগামীতে খাদ্য-শস্যসহ তরিতরকারি আমদানি করা আবশ্যক হলে অবাক-বিস্ময়ের কারণ থাকবে না। ফসলি জমি যেভাবে লুপ্ত হয়ে চলেছে, তাতে সে আশঙ্কা অমূলক বলার উপায় নেই।

আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি নানা বিপদের বার্তা বয়ে এনেছে। আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক জগৎটি এতে লুপ্ত হওয়ার পথে। বিচ্ছিন্নতাকে প্রকট এবং অনিবার্য করে তুলেছে। অতীতে প্রায় বাড়িতে অতিথিদের জন্য পৃথক ঘর বরাদ্দ থাকত। এখন তা কল্পনাও করা যাবে না। ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে কল্পনারও অতীত। আত্মীয়-পরিজনরা ইচ্ছে করলেই কারো ফ্ল্যাটে যেতে পারে না। নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ইন্টারকমে অনুমতি লাভের পরই আত্মীয়ের ফ্ল্যাটে যেতে পারে। সেটা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে ফ্ল্যাটে বসবাসরত আত্মীয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। একই ভবনের নানা ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের মধ্যে রয়েছে চরম বিচ্ছিন্নতা। সেখানে কেউ কারো নয়। সুখে-দুঃখেও কেউ কারো পাশে এগিয়ে আসার বিন্দুমাত্র সংস্কৃতি নেই। ফ্ল্যাটবাসী অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক। যার যার-তার তার। সামষ্টিক ধ্যান-ধারণাবিবর্জিত। চার দেয়ালে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা ও বৈষম্যÑএই দুটি ফ্ল্যাটবাসীর ক্ষেত্রে চরম সত্যরূপে দৃশ্যমান। দুটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সংলগ্ন। বিশাল-বিশাল ফ্ল্যাট নির্মাণের যে নজরকাড়া উন্নতি আমরা চারপাশে দেখছি। এতে সামাজিকতাবিপন্ন ও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিকতা মানুষের ক্ষেত্রে অতি আবশ্যিক তো বটেই। মানুষ মোটেও মানুষ নয়Ñযদি সে সামাজিক না হয়। তাহলে সে পরিণত হয় যন্ত্রে নয়তো পশুতে। এর কোনোটি মানুষের মনুষ্যত্বের সংরক্ষক হতে পারে না এবং বাস্তবে হচ্ছেও না।

ফ্ল্যাট সংস্কৃতি যেহেতু পুঁজিবাদের সৃষ্টি। সে কারণে পুঁজিবাদের চেহারার নানা রূপ এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। পুঁজিবাদ মানুষের ঐক্য-সংহতিবিরোধী। পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করাই তার কর্তব্য। পুঁজিবাদ ব্যক্তির উন্নতি চায় এবং করেও। এতে সমষ্টিকে ঠেলে দেয় পশ্চাৎমুখী। সমষ্টিগত মুক্তির প্রশ্নে সর্বাগ্রে জরুরি পুঁজিবাদবিরোধিতা। কেবল বিরোধিতা নয়Ñপ্রবল আক্রমণ। একই শহরে বসবাস করা মানুষের সংখ্যালঘু অংশের ভোগ-বিলাসিতা, অর্থ-বিত্ত এবং বৈভবে পরিপূর্ণ। অন্যদিকে সমষ্টির ত্রাহি অবস্থা। পুঁজিবাদের আগ্রাসনবিরোধী ঐক্য এবং প্রবল প্রতিরোধ কেবল জরুরিই নয়। অপরিহার্যও বটে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

"