তিস্তা

পানিপ্রাপ্তির দুঃখ গাথা

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

পানির অভাবে তিস্তাপারের পাঁচ জেলার (রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাট) কৃষি ও পরিবেশের বিপদ বাড়ছে। শুকনো মৌসুমে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানি থাকে না বললেই চলে। ২০১৪ সালে বা তারও আগ থেকে ভারত তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করা শুরু করে। তথ্য মতে, ১৯৯৭ সালে তিস্তা নদীর উজানে পানি এসেছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক। গত কয়েক বছর আগেও মে মাসের সময়টাতে ১৫০০ থেকে ২০০০ কিউসেক পানি আসত। তবে শুকনো মৌসুমে ধারাবাহিকভাবে তিস্তা নদীতে পানি আসা কমতে থাকে। যার ফলে ২০১৭ সালে মাত্র ২৫০ কিউসেক পানি আসে। উজান থেকে পানি আসা কমে যাওয়ায় তিস্তাপারের পাঁচ জেলার পানিতে জৈব উপাদান কমে গিয়ে বালুর পরিমাণ বাড়ছে। ফলে তিস্তাপারের বিরাট এলাকা জুড়ে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তিস্তাপারের মাটির ব্যাপক গুণগত অবক্ষয় হয়েছে। মূলত কৃষিকাজ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে মাটিতে সাধারণত আড়াই শতাংশ জৈব উপাদান থাকতে হয়। কিন্তু তিস্তা এলাকায় মাটির জৈব উপাদান গড়ে ১ শতাংশে নেমে এসেছে। পানির অভাবে বিস্তীর্ণ এলাকা ধূসর ও বালুময় হয়ে উঠেছে। তিস্তা ব্যারাজ তৈরি করা হয়েছিল মূলত আমন ধানে সেচ দেওয়ার জন্য। আগে তিস্তা এলাকার পাঁচ জেলায় প্রায় ৮০ ভাগের বেশি অংশে আমন ধানের চাষ করা হতো। তিস্তা নদীতে পানি আসা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে বোরো ধানের আবাদ বেড়েছে। লালমনিরহাটের ‘দোয়ানি তিস্তা ব্যারাজ’ এলাকায় দুই পাশের দুই রকম চিত্র। একপাশে পানি আটকে রাখা হয়েছে, অন্যপাশে পানি নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ভুগতে থাকা অন্যতম একটি দেশ। ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কখনো অতিবৃষ্টি আবার কখনো অনাবৃষ্টি। এ অবস্থায় ফসল উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। উত্তরাঞ্চলে সেচকাজে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির অভাবে ধান চাষের বদলে অন্য ফসল চাষ করতে হচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশের পানির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেলে সেটা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো হতো।

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। তিস্তা নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম দিয়ে। পরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এসে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিশেছে। তিস্তার মোট দৈর্ঘ্য ৪১৪ কিলোমিটার। বাংলাদেশে তিস্তার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২১ কিলোমিটার। তিস্তা এখন নিয়ন্ত্রিত। তিস্তার প্রবাহকে আটকে রাখা হয়েছে জলবিদ্যুৎ ও সেচের মাধ্যমে। দুঃখের বিষয়, ভারত তিস্তায় ‘কপাট সিস্টেম’ চালু করেছে। ফলে পানি আটকে রেখে ভারত নালা দিয়ে পানি অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। আবার পানি বেশি হলে কপাট খুলে দেওয়া হয়। তখনই মূলত বাংলাদেশে পানি আসে। ভারত মূলত শুকনো মৌসুমে ব্যারাজের গেট বন্ধ রাখে আর বর্ষায় খুলে দেয়। ফলে বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেয়! এক কথায়, তিস্তায় বর্ষাকালে পানির চাপ বাড়লে নিয়মিত পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। তিস্তার পানির হিসাব নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ আলোচনা অনেক পুরোনো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারতের ‘যৌথ নদী কমিশনের’ দ্বিতীয় সভায় তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোচনা হয়। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে বাংলাদেশ যদি ব্যর্থ হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতেও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে! কেননা বাংলাদেশ-ভারত স্বীকৃত অভিন্ন আরো ৫৩টি নদী আছে। এভাবে ভারত যদি ক্রমান্বয়ে অন্যান্য নদীর পানি প্রত্যাহার শুরু করে, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ! মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ অংশে ভারত থেকে আসা তিস্তার পানি মাঝেমধ্যে প্রায় ১৫০-২০০ কিউসেকে নেমে আসে। আগে তিস্তা ছিল অনেক গভীর। অনেক আগে চৈত্র মাসে শুকনো মৌসুমে যে পরিমাণ পানি থাকত, এখন বর্ষা মৌসুমে কখনো কখনো সে পরিমাণ পানি থাকে! ভারতের গজলডোবায় বাঁধ দেওয়ার ফলও ভালো হয়নি। বাঁধের কারণে নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে! তিস্তার উজানে ভারতের ব্যারাজ নির্মাণ করার ফলও ভালো ফল বয়ে আনেনি। ব্যারাজ এলাকায় পলি জমা হচ্ছে।

তিস্তায় যে পরিমাণ পানি আছে, তার ২০ শতাংশ বা প্রয়োজনীয় পানি রেখে বাকি পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিলে তা উভয় দেশের জন্য মঙ্গলজনক। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র-রাজ্য সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে কম প্রভাব ফেলেনি। কেন্দ্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝামেলা আছে! এক কথায়, স্বার্থের কারণে বন্দি হয়ে রয়েছে তিস্তা চুক্তি। দুঃখের বিষয়, তিন দশক ধরে আলোচনার পরও বাংলাদেশ তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। চুক্তি না হওয়ার ফলে তিস্তাপারের পাঁচ জেলার এলাকায় কৃষি, পরিবেশ, মানুষের জীবনযাপনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় তিস্তার ন্যায্য পানি পাওয়া এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। পানি সমস্যার সমাধানে এই অঞ্চলে অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে তা অন্য সব দেশের জন্য ভালো হবে। তবে যাই বলা হোক না কেন, তিস্তার পানির ন্যায়সংগত দাবিদার বাংলাদেশ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দৃশ্যমান বন্ধুত্ব সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও নদীর পানির ক্ষেত্রে তা নয় কেন? দুই দেশের কল্যাণে এখনই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়া দরকার। তিস্তার পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশেরও স্বার্থ দেখা হোক। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার জন্য এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

লেখক : কলাম লেখক

sadonsarker2005@gmail.com

"