পর্যালোচনা

অভিবাসীদের কান্না ও বিশ্ববিবেক

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

বিশ্বের দেশে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাস, সহিংসতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, প্রাকৃতিক কারণ, বর্ণবৈষম্য, রাজনৈতিক, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কারণে মানুষ বিভিন্ন সময়ে নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকা ও বেঁচে থাকার তাগিদে জন্মভিটা ছেড়ে অন্যত্র বসত গড়তে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় অভিবাসী মৃত্যুর হার বাড়ছে বলে সম্প্রতি একটি খবর বেরিয়েছে। এটি উদ্বেগের। বলা যায়, আজ বিশ্বের দেশে দেশে অভিবাসীদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু তাদের সহায়তায় বিশ্ববিবেক অনেকটাই নিশ্চুপ। যদিও জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু কে শোনে কার কথা! সম্প্র্রতি জার্মানির ‘সুদ ডয়চে জাইটুং’ পত্রিকায় ‘আত্মশুদ্ধি’ শীর্ষক এক সংবাদে বলা হয়, ২০০ বছর আগে ১৮২৪ সাল থেকে লাখ লাখ ইউরোপীয় নাগরিকরা অভাব-অনটনের কারণে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল জীবন বাঁচাতে। ১৮২৪ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১০০ বছরে ৫ কোটি ২০ লাখ ইউরোপীয় নাগরিক আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করেছিল। এখন যেসব দেশ ও রাষ্ট্রনায়কের সিদ্ধান্তে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও বিরুদ্ধে অবস্থান তাদের অনেকেই একসময় অন্য দেশে আশ্রিত হয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছে। বিশ্বে এখন অভিবাসীর সংখ্যা ২৫ কোটিরও বেশি এবং তারা বিশ্ব জনসংখ্যার ৩ শতাংশ। তবে বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের (গ্লোবাল জিডিপি) ১০ শতাংশ হচ্ছে তাদের অবদান। এই তথ্য জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের।

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যখন অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, তখন সদ্য সমাপ্ত ‘ফুটবল বিশ্বকাপে’ ফ্রান্স ও ইউরোপকে মনে করিয়ে দেয়, এ অর্জনে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ফরাসি দলের হয়ে যারা খেলেছেন, তাদের ৭৮ শতাংশই হচ্ছে অভিবাসী। আবার এই অভিবাসীদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই মুসলমান। ইউরোপে বর্তমানে মুসলমান অভিবাসনের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক হাওয়া উঠেছে, এর সূত্রপাত কিন্তু ফ্রান্সেইনমেরি লোপেনের দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থানের মাধ্যমে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বর্ণবিদ্বেষী দল দ্বিতীয় এবং তার আগের নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। আর এ দলের রাজনীতি মোকাবিলায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্রান্সের মূলধারার ডানপন্থি ও বামপন্থি উভয় দলই অভিবাসনবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিতে মুসলমানরা আগে যেসব ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতেন, সেগুলোর বেশ কয়েকটিই তারা হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ লিখেছেন, ‘অভিবাসীরা ফ্রান্সকে শক্তিশালী করেছে’, ‘আফ্রিকান এবং মুসলমানরা তোমাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছে, তুমি এখন তাদের ন্যায়বিচার দাও’ ইত্যাদি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রকাশনায় বলা হয়, এবার যারা বিশ্বকাপ দেখছেন, তারা সম্ভবত অভিবাসীদেরই দেখছেন। তাদের হিসাবে এবারের বিশ্বকাপে ৩২টি দলে মোট ১ হাজার ৩২ জন খেলোয়াড় অংশ নিয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯৮ জনের জন্ম অন্য কোনো দেশে, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ১০-এর কাছাকাছি। এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোতেও ছিলেন অভিবাসী ফুটবলার।

এটা সত্য, মানুষের বেঁচে থাকা যখন সংকটে পড়ে, তখন তা মানবিক বিপর্যয়ে পৌঁছায়। অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই বিপর্যয় শব্দটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাস্তবে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই চলছে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ। কয়েক বছর ধরে নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশান্তরি হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ দেশান্তরি হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ মানুষ ২০১৭ সালে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেছে। দেশত্যাগী মানুষ নিরুপায় হয়ে পাশের দেশেই আশ্রয় নিয়ে শরণার্থী হচ্ছে। আবার কোনো কোনো দেশ অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবিয়ে তাদের হত্যা করে। এর নজির আছে প্রচুর। তবু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অভিবাসী হয়। এ পর্যায়ে আফ্রিকা, আরব, এশিয়ার শরণার্থীদের বিশালসংখ্যক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে।

শুধু আটলান্টিক নয়, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করছে। যদিও ইউরোপের অনেক দেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে না। অবশ্য জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের উদারনীতির কারণে ২০১৬ সালে ১২ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে প্রবেশ করেছিল। অবশ্য এ সময় ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ অনেক দেশও শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়। এর আগে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। অভিবাসীর পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা সর্বাধিক। অনুরূপ জাতিগত নিধনের স্বীকার হয়ে গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যে বর্বরোচিতভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে, পৃথিবীর শরণার্থীদের ইতিহাসে এত নির্মম ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছে, তা মানবতার ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশের এই উদ্যোগ বিশ্বদরবারে প্রশংসিত হয়েছে এবং হচ্ছে। একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত যে উদার মানবিকতায় এক কোটি বাঙালিকে আশ্রয় দিয়েছিল, তা তো আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের মাঝে এই উদারতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন বিপুলভাবে। উত্তর জার্মানির উত্তর সাগরের সমুদ্রবন্দর হচ্ছে ‘ব্রামাহাফেনে’। এখানে একটি দেশান্তরি জাদুঘর রয়েছে। এই জাদুঘরের নাম হচ্ছে ‘দেশান্তরি জাদুঘর’। এই জাদুঘরে রয়েছে ইউরোপীয় দেশত্যাগীদের মর্মন্তুদ কাহিনি, আটলান্টিকের ওপারে তাদের জীবন গড়ার কাহিনি, চিঠিপত্র, দলিল দস্তাবেজ। এই জাদুঘরে প্রবেশপথে লেখা রয়েছে ‘এই পথ দিয়েই ৭০ লাখ জার্মান ও মধ্য ইউরোপীয় অভিবাসী অজানা পৃথিবীর দিকে পাড়ি দিয়েছিল। জানা যায়, এই পথ দিয়েই আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাদা ফ্রিডরিশ ট্রাম্প ভাগ্যের অন্বেষণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে দক্ষিণ জার্মানির রাইনল্যান্ড ফালৎস রাজ্য ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি তার সেই ফেলে আসা অতীত ভুলে উল্টো অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লেগেছেন।

বলা সংগত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারাই অভিবাসী হয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন, একসময় তারাই তাদের জীবনাচার বদলে দক্ষতা ও নিষ্ঠা দিয়ে সে দেশের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাই আমাদের প্রত্যাশা, অভিবাসীদের আহাজারিতে নীরব না থেকে এবার বিশ্ববিবেক জাগ্রত হবে, জয় হবে মানবতার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

"