বিশ্লেষণ

মর্টগেজ ভাড়াটে

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মর্টগেজ ভাড়াটে বা বন্ধকি ভাড়াটে নামক শব্দের সঙ্গে আমাদের পূর্বপরিচয় নেই। তাই শোনামাত্র চমকে উঠেছিলাম। এ আবার কেমনতরো ভাড়াটে! যার নামের আগে মর্টগেজ বা বন্ধকি শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সনাতনী অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে মাসিক ভাড়া প্রদান সাপেক্ষে মানুষ বাড়ি-ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে থাকে। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা জামানত বাবদ অগ্রিম অর্থ বাড়ির মালিকদের প্রদানেরও বিধান রয়েছে। অগ্রিম অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে নিশ্চয় হেরফেরও হয়ে থাকে। কারো ক্ষেত্রে তিন মাসের ভাড়ার অগ্রিম, কারো ক্ষেত্রে দু-এক মাসের। এটা তো সত্য ঢাকা শহরের বাড়ির বা ফ্ল্যাটের মালিকদের চেয়ে ভাড়াটের সংখ্যাই অধিক। আমাদের বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটেদের সনাতনী ব্যবস্থায় মর্টগেজ ভাড়াটে সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন। না জানা অবধি আমিও অবাক বিস্ময়ে বিষয়টি বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হয়ে মর্টগেজ ভাড়াটে এবং বাড়িওয়ালা উভয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। জেনেছি চমকপ্রদ অভিনব ব্যবস্থাটির খবরাখবর।

ব্যবস্থাটি বিগত তিন-চার বছর ধরে পুরান ঢাকায় চালু হয়েছে এবং ক্রমেই এর বিস্তার দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের প্রায় শহরে বন্ধকি ভাড়াটের সন্ধান পাওয়া গেছে। পুঁজির শক্তি এবং পুঁজির ক্ষমতা এতে প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। বাড়িওয়ালাদের অর্থের প্রয়োজন মেটাতেই মর্টগেজ ভাড়াটে ব্যবস্থাটি চালু হয়েছে। বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকদের তিন বা পাঁচ লাখ টাকা একত্রে প্রদান করে মর্টগেজ ভাড়াটে বাড়ি বা ফ্ল্যাটে ওঠে। ব্যবহৃত গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির বিলই তারা কেবল পরিশোধ করে। মাসিক কোনো ভাড়া তাদের দিতে হয় না। একসঙ্গে নগদ তিন-পাঁচ লাখ টাকা বাড়িওয়ালাকে প্রদানের কারণেই বিনে ভাড়ায় বসবাসের এমন চমকপ্রদ ব্যবস্থা। রীতিমতো দলিল-দস্তাবেজ করেই পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হয়। তিন বা পাঁচ বছর মেয়াদে সাধারণত চুক্তি হয়ে থাকে। চুক্তির সময় সীমা অতিক্রমের পর বাড়িওয়ালাকে শুরুতে দেওয়া তিন বা পাঁচ লাখ টাকা মর্টগেজ ভাড়াটেকে একত্রে ফেরত দিতে হয়। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত মর্টগেজ ভাড়াটে বিনে ভাড়ায়

থাকবে। কেবল গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির বিল পরিশোধ করবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে লগ্নির পুরো টাকা একত্রে ফেরত নেবে। কোনো কারণে বাড়িওয়ালা অর্থ ফেরত দিতে অক্ষম হলে তাদের মধ্যে আবার নতুন করে চুক্তিপত্র সম্পাদন করে আগের নিয়মেই ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে বিনে ভাড়ায় বসবাস করতে পারবে।

ব্যবস্থাটি পুরান ঢাকা থেকে ক্রমেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকা থেকে মূল কারণটিও জেনেছি। নগদ অর্থের তাগিদেই নিরুপায় বাড়ির অসহায় মালিকদের এমন চুক্তি করতে হয়। পুরান ঢাকার জায়গা বাড়েনি। কিন্তু বেড়েছে পরিবার। পৈতৃক সম্পত্তিতে অংশীদারদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারায় কারো মালিকানার জায়গার পরিমাণ আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠার ঊর্ধ্বে নয়। নগণ্য সংখ্যক আছে যাদের জমির পরিমাণ তিন-চার কাঠা। সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের জায়গার পরিমাণ আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠা হওয়ার কারণেই এই স্বল্প জায়গায় রাজউকের গৃহ নির্মাণ অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া রয়েছে সরু রাস্তার কারণে রাজউকের অনুমোদন না পাওয়ার পাকা ব্যবস্থা। রাজউকের অনুমোদন লাভের ক্ষেত্রে আরেক অন্তরায় বাড়ি নির্মাণে চারদিকে জায়গা ছেড়ে বাড়ি নির্মাণের শর্তারোপ, যা পুরান ঢাকার জমির মালিকদের ক্ষেত্রে পালন করা অসম্ভব। আধা কাঠা থেকে সোয়া কাঠা জমির চারদিকে জায়গা ছাড়লে তো বাড়ি নির্মাণের ন্যূনতম জায়গাও থাকে না। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প জায়গার মালিকরা রাজউকের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে স্ব-উদ্যোগে জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে বাড়ি নির্মাণে হাত দেয়। রাজউকের অনুমোদন না থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে গৃহ নির্মাণ ঋণসুবিধা পাওয়াও সম্ভব হয় না। অর্থের ঘাটতিতে অসমাপ্ত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে অগত্যা তাদের মর্টগেজ ভাড়াটেদের শরণাপন্ন হতে হয়। তিন-পাঁচ লাখ নগদ টাকা গ্রহণ করে মর্টগেজ ভাড়াটেদের ঘর-ফ্ল্যাট বিনে ভাড়ায় বসবাসের জন্য দিতে হয়। পুরান ঢাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্প জমির মালিকদের একই দশার কারণে মর্টগেজ ভাড়াটে ব্যবস্থাটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে চলেছে। খুব কম সংখ্যকই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক অর্থের প্রয়োজন মেটাতে মর্টগেজ ভাড়া দিয়ে থাকে। একজন জানিয়েছে, মেয়ের বিয়ের পণের অর্থ প্রদানের জন্য বাধ্য হয়ে নিজেদের দুই রুম মর্টগেজ ভাড়া দিয়ে ছাদে টিন শেডের ঘর তুলে নিজেরা বসবাস করছে। মর্টগেজ ভাড়াটেরাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে বাড়ির মালিকদের নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগটি তারা কাজে লাগিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। মানি মেকস্ মানি অর্থাৎ টাকাই টাকা তৈরি করে। ব্যাংকের সুদও এত অধিক নয়। ব্যবসায় বিনিয়োগে নানা ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই। নিরাপদ লাভজন বিনিয়োগই তারা মর্টগেজ ভাড়া নেওয়াকে মনে করে।

সাধারণত ভাড়াটেদের ওপর বাড়িওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ আছে। তবে মর্টগেজ ভাড়াটেদের তেমন কোনো অভিযোগ নেই বরং তারা অধিক সমীহ ও মর্যাদা বাড়িওয়ালাদের থেকে পেয়ে থাকেন। বাড়িওয়ালাদের আর্থিক দুরবস্থার এই সুযোগ নেওয়া নৈতিক কিনা! জানতে চাইলে বলে, ‘একজন নিরুপায় বাড়ির মালিককে অর্থ দিয়ে উপকার করেছি। বিনিময়ে নিজেরাও লাভবান হচ্ছি। এখানে অনৈতিক কিছু নেই। বরং আমরা অর্থ না দিলে তাদের পক্ষে বাড়ি নির্মাণের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভবপর ছিল না। আর তারা মাথা কুটলেও রাজউকের অনুমোদন না থাকার কারণে আর্থিক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একটি টাকাও ঋণ পাবে না। নিজেরা লাভবান হচ্ছি সত্য, তাই বলে বাড়ির মালিকও যে লাভবান হচ্ছে নাÑতাও অসত্য নয়।’

বর্তমান বৃহৎ ঢাকার মূল সীমানার মধ্যে পুরান ঢাকা যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত পুরান ঢাকাকে আধুনিক ঢাকার অংশ করার নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ। মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গার মতোই পুরান ঢাকা একুশ শতকের রাজধানী ঢাকার মাঝে জরাজীর্ণ তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদার এক জনাকীর্ণ জনপদ। পুরান ঢাকার ব্যাপারে রাষ্ট্রের কর্তারা আগাগোড়াই নির্লিপ্ত ও উদাসীন। অপ্রশস্ত রাস্তার অজুহাতে রাজউক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় না। তাই গৃহঋণ সুবিধাবঞ্চিত পুরান ঢাকার মানুষ বাধ্য হয়েই ইচ্ছানুযায়ী অননুমোদিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণের সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছে। নতুন ও পুরাতন ঢাকার ভবন নির্মাণের অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা থাকা উচিত বলে মনে করি।

পুরান ঢাকা কালের ঐতিহ্য নিয়ে কেবল নয়, আধুনিক ঢাকার নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়েও জীবন্ত থাকার দাবি রাখে। বিশ্বের সব দেশের রাজধানীতে এবং শহরে পুরান ও নতুন অঞ্চল পাশাপাশি রয়েছে, তবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য নেই।

আমরাও চাই নতুন ও পুরান শহরের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও নাগরিক অধিকার, সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সব বৈষম্য নিরসন হোক।

দেশজুড়ে সর্বত্র চলছে পুঁজির অসীম দৌরাত্ম্য। পুঁজির নীরব শোষণও। পুঁজির শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র ক্রমেই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তার করে চলেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। বিকল্প ব্যবস্থা না আসা পর্যন্ত হরেক ক্ষেত্রে পুঁজির নতুন-নতুন দৌরাত্ম্য আমাদের দেখতে হবে এবং ভুগতেও হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

mibabla71@gmail.com 

"