ডেঙ্গু

এক আতঙ্কের নাম

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মো. মাঈন উদ্দিন

ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়ার সঙ্গে ইদানীংকালে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু নামক এক আতঙ্কের নাম। রাজধানীসহ দেশব্যাপী ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। খবরে প্রকাশ, ২৪ ঘণ্টায় ৬০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে

হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত তিন মাসে ডেঙ্গুজ্বরে

মারা গেছে ১১ জন। বর্তমানে হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসাধীন ২৮৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, গড়ে প্রতিদিন ৮৫ জনেরও বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। এটি বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীবাসীর মনেও ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক।

যদিও আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্তৃপক্ষ। তারা বলেন, আমরা বিষয়টি নজরদারি করছি। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে, ডেঙ্গুর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেউ এ জ্বরে আক্রান্ত হলে প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। ডেঙ্গু হলে অনেক সময় রেশ পরে উঠতে পারে। তিনি আরো জানান, ডেঙ্গুর প্রকোপ এ বছর বাড়লেও তা ২০১৬ সালের তুলনায় বেশি নয়। কিন্তু যেসব ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, তারাই কেবল জানে ডেঙ্গুতে আতঙ্ক হওয়ার কিছু আছে না নেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট চেম্বারে বেশি

ডেঙ্গুজ্বরের রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরের মৌসুম। এডিস মশা ডেঙ্গুর বাহক। এ সময় জ্বর বা শরীরে ব্যথা হলে ডেঙ্গুর কথা মাথায় রাখতে হবে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর যখন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের লক্ষণ (যেমনÑ মাড়ি বা নাক থেকে রক্তক্ষরণ, মলের সঙ্গে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) দেখা দেয়, তখনই একে হেমোরেজিক ডেঙ্গু বলা হয়।

অধিক রক্তক্ষরণের ফলে শরীরে জলীয় উপাদান কমে যায়। এ বছর হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গুজ্বর হলে সাধারণত জ্বরের মাত্রা বেশি হয় এবং গায়ে রেশ ওঠে। এ বছর কম জ্বর এবং গায়ে রেশ উঠেনি, এমন ডেঙ্গু রোগীও পাওয়া যাচ্ছে। জ্বর কম থাকায় এবং গায়ে রেশ দেখা না দেওয়ায় অনেকে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসকের কাছে যান। এতে রোগী সিরিয়াস

অবস্থায় চলে যাচ্ছে, যাদের বাঁচানো কষ্টকর। কারো চার-পাঁচ দিন জ্বর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রচুর পানি, শরবত ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খাওয়াতে হবে।

তথ্য মতে, ডেঙ্গুজ্বরের ধরন ও প্রাদুর্ভাবের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। চলতি বছর যারা মারা গেছে, তাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। আইইডিসিআরের পাশাপাশি স্বাস্থ্য

অধিদফতর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগী এবং এ রোগে মৃতদের তথ্য সংগ্রহ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোলরুমের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬০ জন। বর্তমানে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ২৮৫ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর রোববার পর্যন্ত ৯ দিনে ৭৬৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিদিন ৮৫ জনেরও বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর দেশের ২২টি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। এসব হাসপাতালের বাইরেও বিভিন্ন হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তাদের কোনো পরিসংখ্যান সাধারণত অধিদফতরের কাছে থাকে না।

কন্ট্রোলরুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত রোববার বিকেল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৮২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ৭৬৬ জন, আগস্টে ১ হাজার ৬৬৬, জুলাইয়ে ৮৮৭, জুনে ২৮৬, মে মাসে ৩৫, এপ্রিলে ১৪, মার্চে ৫, ফেব্রুয়ারিতে ৭ জন এবং জানুয়ারিতে ২৬ জন। এর মধ্যে জুনে ৩ জন, জুলাইয়ে ৪ জন এবং আগস্টে ৪ জনসহ ১১ জন মারা গেছে। ডেঙ্গুজ্বরে গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বাধিক লোক মারা যায়Ñ১৪ জন। তবে এ বছর মাত্র তিন মাসেই মারা গেছে ১১ জন।

ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৫৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়; মারা যায় ৮ জন। ২০১৬ সালে ৬ হাজার ৭৬ জন আক্রান্ত হয়; মারা যায় ১৪ জন। ২০১৫ সালে ৩ হাজার ১৬২ জন আক্রান্ত হয়; মৃত্যু হয় ৬ জনের। ২০১৪ সালে ৩৭৩ জন, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৪৭৮ জন, ২০১২ সালে ১ হাজার ২৮৬ জন, ২০১১ সালে ১ হাজার ৩৬২ এবং ২০১০ সালে ৪০৯ জন ডেঙ্গু-আক্রান্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, জুন থেকে অক্টোবর ডেঙ্গু রোগ ছড়ানো বাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। কিন্তু এবার ফেব্রুয়ারিতে আগাম বৃষ্টি হওয়ায় মশার উপদ্রব আগে থেকেই বাড়তে থাকে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু। এ জ্বর থেকে রক্ষা পেতে হলে এডিস মশা যেন বংশবিস্তার করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসা বা বাড়ির আঙিনার কোথাও যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।

মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশার

ওষুধ ছিটিয়ে থাকে। তবে রাজধানীবাসী বরাবরই বলে আসছেন, মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম মোটেও সন্তোষজনক নয়।

আসলে মিডিয়াতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কথাগুলো মিষ্টি লাগলেও প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ ডেঙ্গু প্রতিরোধ-সংক্রান্ত কোনো সেবাই পায় না। এদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দিনকে দিন বেড়েই যাওয়ায় এই ডেঙ্গুজ্বর সাধারণ জনগণের মধ্যে এক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং ডেঙ্গুর প্রভাব বিস্তার রোধে জনগণকে যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে সঠিক পদক্ষেপ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

moin412902@gmail.com

"