বিশ্লেষণ

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

প্রতিটি শিশু পরিবারের পরম আকাক্সক্ষার ধন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মা গর্ভকালীন শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে সদা সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন। পরিবারের সদস্যরাও শিশুর জন্ম সুস্থ, সুন্দর ও স্বাভাবিক করার প্রয়াসে মাকে কঠোর পরিশ্রম থেকে বিরত রাখেন। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যসহ বিশেষ পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন। আজকাল অধিকাংশ মাকে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে দেখা যায়। শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গীয় প্রভায় আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো গৃহ। পরিবারে বয়ে যায় আনন্দের জোয়ার। পরিবারের সব সদস্যের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় শিশুর দেখাশোনা করা। সবার সুদৃষ্টি থাকে পরিবারের নতুন অতিথির দিকে। শিশু তার হাসি-কান্না, চাহনির মাধ্যমে আনন্দ, দুঃখ, ব্যথা, চাহিদা প্রকাশ করে থাকে। মা সহজেই শিশুর মনের ভাব বুঝতে পারেন। মায়ের সঙ্গে শিশুর গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক। মায়ের একটুখানি পরশ শিশুর মনে এনে দেয় অনাবিল আনন্দ ও তৃপ্তি। এ আনন্দের মধ্যেই মা তার গর্ভকালীন সীমাহীন দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণাকে ভুলে থাকেন। মায়ের আদর, পরিবারের স্নেহের বন্ধন সবকিছুই ফিকে হয়ে আসতে থাকে শিশুর শিক্ষাজীবনে প্রবেশের পর থেকে। শৈশবে শিশুরা পরিচিত হতে থাকে চারপাশের দ্বৈতসত্তার মানুষের সঙ্গে। তাদের বুঝতে কষ্ট হয় কোনটি সত্য। শিক্ষাজীবন শুরুর আগের রূপ না পরবর্তী রূপ, কোনটি ছল না। এর উত্তর কি কারো জানা আছে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, শিক্ষার নামে শিশুরা জীবন-মন-প্রাণ উজাড় করে দিচ্ছে, কী দিচ্ছে সেই তথাকথিত শিক্ষা? এ শিক্ষাপ্রাপ্ত শিশুরা কি নৈতিকতা-অনৈতিকতার মধ্যে কোনো সীমারেখা টানতে পারছে? সম্ভবত উত্তরগুলো সবারই জানা। আমাদের প্রতিনিয়ত জীবনচারিতায় ক্রমে প্রকাশিত হচ্ছে উত্তরগুলো, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়। একমাত্র বিশাল কর্মচারীর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তাদের নিজস্ব ক্যাডার সার্ভিস নেই। এ কারণে মেধাবীরা শিশুদের বা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয় না। সব শিশুর জন্য অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও বিভিন্ন ধারার আলাদা বই নির্ধারণ করা হোক। মেধাবীদের প্রাথমিক শিক্ষায় আগ্রহী করার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্যাডার সার্ভিস সৃষ্টি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে আমাদের দেশে শিশু শিক্ষা ১১ ভাগে বিভক্ত। এ ধারা আগামী প্রজন্মের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে আসছে। মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি সবার কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়। শিশুশিক্ষার এ বেহাল দশা মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে জানার অন্তরায়। ইসলাম ধর্মে বর্ণিত আছে, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত’। জন্মভূমিকে ভালোবাসা ইমানের অঙ্গ। ৩০ লাখ শহীদ ও অগণিত মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এ বাংলাদেশ। কওমি শিক্ষা প্রকৃত ধর্মীয় আলেম তৈরি করে থাকে। পরকালের সুখ, শান্তি ও ইসলাম ধর্মের প্রসারে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা আগামী প্রজন্ম মাতৃভূমি, মাতৃভাষা সম্পর্কে জ্ঞান না রাখে বা অবহেলা করে প্রকৃত ইমানি শিক্ষা কতটুকু বাস্তবায়িত করবে, তা বোধগম্য নয়। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত, জাতীয় দিবসসহ বিশেষ দিবস পালনের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শিশুরা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জ্ঞান লাভ করতে না পারায় মাতৃভূমি, মাতৃভাষার প্রতি তাদের

ভালোবাসা জন্মায় না। বড় হয়ে নিজের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া, দেশ সমাজ তথা পরিবেশের প্রতি মমতা জন্মায় না। বিদেশি ভাবধারায় শিক্ষা অর্জন করে তারা বড় হয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে কিন্ডারগার্টেন নামক শিক্ষা শিশু মনোবিজ্ঞানবহির্ভূত বই ও খাতার বোঝা চাপিয়ে দেয়, যা মহামান্য হাইকোর্ট শিশুদের শরীরের ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগের বোঝা বহনের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। শিশু বেশি বেশি বই পড়ছে। অশিক্ষিত, মহাশিক্ষিত প্রায় সবার মাঝে এ নির্মম আনন্দ উপভোগ করতে দেখা যায়।

সাধারণ মানুষের সন্তানদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা শিক্ষক সংকটসহ নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে আছে। আমাদের দেশে শিশু শিক্ষার জন্য যে একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় আছে, তা অনেকটা অবহেলিত। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, সংস্থাপন, শিক্ষাসহ সব মন্ত্রণালয়ই সর্বমহলে যথেষ্ট সমাদৃত। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগিসহ সব মন্ত্রণালয়ের ক্যাডার সার্ভিস বিদ্যমান। নেই শুধু প্রাথমিক শিক্ষার। আজ নৈতিকতার শিক্ষা শিশুকে দেওয়া প্রয়োজন। শৈশব থেকে আমরা নানা নীতিবাক্য পড়ে আসছি। ‘সদা সত্য কথা বলিও’, ‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো’, ‘যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলিও না।’ বাস্তবে এ বাক্যগুলোর কতটুকু আমরা ধারণ করতে পেরেছি, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। শুধু মুখে মুখে নৈতিক শিক্ষার বাক্য না শিখিয়ে ব্যবহারিক কাজের মাধ্যমে শিক্ষাকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধীরে ধীরে শিশুর হাতে তুলে দিতে হবে বিভিন্ন রঙের ছবিসংবলিত বই। পাশাপাশি ছড়া আবৃত্তি, রং দিয়ে মনের মতো আঁকাআঁকি করতে দেওয়া। আঁকাজোঁকার মধ্য দিয়ে লেখার

অভ্যাস গঠন শুরু করতে হবে। কিন্তু এর পরিবর্তে আমরা কী করছি? আমরা আদরের সোনামণিদের ওপর শিক্ষার

নামে নির্মম যন্ত্রণা উপহার দিচ্ছি। শিশুশিক্ষার প্রারম্ভে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত সবাই একযোগে শিশুকে বাংলা, ইংরেজি বর্ণমালা শেখানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। শিশুর মানসিক সামর্থ্যকে বিবেচনায় না আনায়, তার আগ্রহকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে শিশুর

পাঠগ্রহণ আজ তার কাছে নিরানন্দ হয়ে উঠেছে। নামিদামি বিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির প্রয়াসে শিশুকে তার শৈশবের স্বর্গীয় আনন্দ বিসর্জন দিয়ে শিখতে হয় বড়দের জ্ঞান, বয়স, রুচি ও সামর্থ্যরে শিক্ষা, যা তার জন্য অতিরিক্ত বোঝাস্বরূপ। শিশুরা তোতা পাখির মতো অনেক বড় কঠিন শব্দ মুখস্থ বলতে পারে। অথচ শিশু বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোনো জ্ঞান বা ধারণা রাখে না। শিশুদের জ্ঞানহীন ‘জ্ঞানার্জন’ অভিভাবকদের পুলকিত করে থাকে। চলতে থাকে সারা দিন শুধু লেখাপড়া। শিশুর জীবন থেকে বিদায় নেয় সকাল-বিকেলের সূর্য দেখা, খেলাধুলা, সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমসহ সব বিনোদন।

সকালে বাসায় পড়া, স্কুলে পড়া, কোচিং ক্লাসের পড়া, রাত জেগে শুধু পড়া আর লেখা নিত্যদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সন্তানরা আরাম-আয়েশ, বিনোদন, খেলাধুলাকে বিসর্জন দিয়ে শুধু পড়ছে তো পড়ছেই। এ পড়ালেখা শিশুকে কতটা বিকশিত করছে, সমাজকে কতটুকু উপকৃত করছে, দেশকে কী দিচ্ছে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। শিশু মনোবিজ্ঞানবহির্ভূত শিক্ষা শিশুদের জোর করে শেখানোর পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, এ বয়সে যদি লেখাপড়ার ওপর চাপ না দেওয়া হয়, তবে বড় হয়ে পড়ার অভ্যাস করাতে সমস্যা হবে। প্রত্যেক কাজের জন্যই সময় নির্ধারিত রয়েছে। মাতৃদুগ্ধপানের মেয়াদ যেমন নির্দিষ্ট, তেমনি নির্ধারিত রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সময়, প্রথম শ্রেণির ভর্তির বয়স, এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার বয়স, চাকরির বয়স। কিন্তু শিশুশিক্ষার জন্য বয়সের বিষয়টিকে গুরুত্বহীনভাবে দেখা হচ্ছে। প্রথম শ্রেণি থেকে পরীক্ষা দিতে দিতে শিশুর পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে কিংবা পরীক্ষাভীতি কমে যাবে, তা খোঁড়া যুক্তি। পরীক্ষার যন্ত্রণায় হারিয়ে যেতে বসেছে শিশুর আনন্দময় শৈশব। শিশুর খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকচর্চা, গল্প, কবিতা, ছড়ার বই পড়া, ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন, নৈতিক শিক্ষাসহ ব্যবহারিক শিক্ষা সব আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর পড়া, স্কুল, কোচিং যেন শিশুর জীবন। পরীক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত, নিরক্ষর সবার মধ্যে ঐক্যবদ্ধ সুর। শিশুকে ভালোভাবে পাস করাতেই হবে। এ প্রতিযোগিতায় সমৃদ্ধ হচ্ছে কোচিং, নোট, গাইডসহ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মিষ্টি ব্যবসায়ীর বাণিজ্য। শিশুদের জন্য পরীক্ষা অনেকটা হাতুড়ে ডাক্তারের চিকিৎসার মতো।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, শরীরে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা না করে যেমন লক্ষণ দেখে বা শুনে রোগীকে ওষুধ দেওয়া হলে তাতে রোগীর বিপদের আশঙ্কা থাকে। আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ কিছু প্রশ্ন খাতায় লিখলে ভালোভাবে পাস করা যায়। কিন্তু বলার যোগ্যতা, নৈতিক শিক্ষা অর্জন, পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার যোগ্যতা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণসহ ভবিষ্যতের আদর্শ নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যায় না। জাতীয় জীবনে এনেছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। অন্যদিকে শিশুর শৈশব হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। শিশুর শৈশব বিপন্ন না করে আদর্শ মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সৃষ্টি করা হোক যথার্থ জ্ঞানসমৃদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

raihan567@yahoo.com 

"