বিশ্লেষণ

মহররম মাসের গুরুত্ব

প্রকাশ | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মুফতি মুহাম্মদ এহছানুল হক

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশম-লী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে গণনার জন্য মাস ১২টি। এর মধ্যে চারটি মাস নিষিদ্ধ মাস, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান’। (সুরা তাওবাহ, আয়াত : ৩৬)। নিষিদ্ধ চারটি মাস সম্পর্কে রাসুলপাক (সা.) বলেন, বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি, তার মধ্যে চারটি মাস অতি সম্মানিত। তিনটি পর পর লাগোয়া। তিনটি হলো, জিলকদ, জিলহজ ও মহররম আর চতুর্থটি জমাদিউস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব মাস। (বোখারি, হাদিস নম্বর : ২৯৫৮; মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৬৭৯)। ইমাম বাগাভী (রহ.) বলেন, অনেক আগেই আল্লাহ তাআলা এ বিধান লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। (তাফসিরে বাগাভী, পৃষ্ঠা : ১৯২)। ইমাম আবু জাফর তাবারি (রহ.) বলেন, ইসলাম আগমনের আগেও জাহেলি যুগে এ চারটি মাস নিষিদ্ধ ছিল। এ মাসগুলোকে তারা পবিত্র মনে করে সম্মান করত, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং ঝগড়া-ফ্যাসাদ থেকে নিজেদের বিরত রাখত। (তাফসিরে তাবারি, ১৯২ পৃষ্ঠা)।

অধিক সম্মানিত মাসগুলোর প্রথম মাস মহররম। এই মহররম মাসের ফজিলত অনেক বেশি। যেহেতু এটি পবিত্র মাস, তাই মহররম মাসে যুদ্ধ হারাম। তবে যদি প্রতিপক্ষ কাফির-মুশরিক যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং আক্রমণ করে, তাহলে যুদ্ধ করে তাদের ঘায়েল করা বৈধ। এ প্রসঙ্গে মুকাতিল ইবনে হায়্যান ও ইবনে জুরাইজ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবিদের একদল মহররম মাসে মুশরিকদের একদল লোকের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তখন মুসলিম পক্ষ-প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত রাখতে চাইলেন, যাতে তারা হারাম মাসে যুদ্ধ না করে। তারপর মুশরিকপক্ষ অস্বীকৃতি জানিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হতে প্রতিজ্ঞ হলো এবং হঠাৎ তাদের ওপর চড়াও হলো। তখন মুসলমানরা তদের প্রতিহত করলেন এবং যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। (তাফসিরে ইবনে কাছির, পঞ্চম খ-, ৪৪৯ পৃষ্ঠা)। হাদিস শরিফে মহররম মাসে নফল ইবাদত এবং নফল সিয়ামকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আফদালুস সিয়ামি বাদা রামাদানা শাহরুল্লাহিল মুহাররাম। অর্থ : রমজানের পর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা। (মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১৯৮২)। এ হাদিসে মহররমকে ‘শাহরুল্লাহ’ তথা আল্লাহর মাস বলা হয়েছে। এর দ্বারাই বোঝা যায়, মহররম মাসের মর্যাদা কত বেশি। সুবহানাল্লাহি বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম।

তিরমিজি শরিফে হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আলী (রা.)-কে প্রশ্ন করলেন, রমজান মাসের পর কোন মাসের রোজা রাখার জন্য আপনি আমাকে আদেশ করবেন? আলী (রা.) বললেন, ঠিক এ প্রশ্নটিই এক ব্যক্তি হুজুর (সা.)-কে করেছিল। আমি সেখানে বসেছিলাম। হুজুর (সা.) প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, তুমি যদি রমজানের পর কোনো মাসকে গুরুত্ব দিয়ে রোজা রাখতে চাও, তাহলে মহররম মাসকে গুরুত্ব দাও। কেননা, মহররম মাস হলো আল্লাহর মাস। (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৭৪১; মুসনাদে আহমাদ, ২য় খ-, ১৫৪ পৃষ্ঠা।) একবার রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছে, মাসগুলোর মধ্যে কোন মাসটি শ্রেষ্ঠ? রাসুল (সা.) বললেন, শ্রেষ্ঠ মাস হলো আল্লাহর মাস। যাকে তোমরা মহররম বলে থাকো। (সুনানে কুবরা লিন্নাসায়ি, হাদিস নম্বর : ২৯১৬; সুনানে কুবরা লিল বায়হাকি : খ- ৪, ২৯১ পৃষ্ঠা)।

কোনো কোনো হাদিস শরিফে আমরা দেখতে পাই, রমজানের পর মাহে শাবানের রোজাকে রাসুল (সা.) বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এখানে রমজানের পর মহররম মাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে ইমাম নববী (রহ.) শরহে মুসলিমে লেখেন, দুটি কারণে এমনটি হতে পারে। প্রথমত, রাসুল (সা.)-কে হায়াতে দুনিয়ার শেষের দিকে মহররম মাসের ফজিলত সম্পর্কে জানানো হয়েছে। তাই শুরুতে তিনি এ সম্পর্কে বলেননি। অথবা সফর কিংবা অসুস্থতাজনিত বা এ ধরনের কোনো কারণে মহররম মাসের সিয়াম থেকে তিনি বিরত ছিলেন। (শরহে মুসলিম : অষ্টম খ-, ৫৫ পৃষ্ঠা।)

পবিত্র মাস, আল্লাহর মাস, মহররম মাসে আমাদের করণীয় হলো, এ মাসে বিশেষত ইসলামের কল্যাণে নিবেদিত হওয়া। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অধিকসংখ্যক দরুদ ও সালাম পেশ করা। নফল নামাজ আদায় করা। কোরআন মাজিদ তিলাওয়াত করা। পবিত্র আশুরা এবং অন্য দিনগুলোয়ও সিয়াম পালন। পবিত্র কোরআন মাজিদ, হাদিস শরিফ এবং আওয়লিয়া কিরামদের জীবনী অধ্যয়ন করার পাশাপাশি দান-সাদকাহ ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে এ মাসে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য অর্জন করতে হবে। আল্লামা ইকবাল বলেন, ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বা’দ। হজরত ইমাম হুসাইন (রা.), আহলে বাইয়াতকে ভালোবেসে অন্যায়কে প্রতিহত করে সত্যকে আঁকড়ে থাকার শিক্ষাও আমরা এ মাসে গ্রহণ করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা লাভ করার এবং তার প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ (সা.)-কে অনুসরণ করার, আহলে বাইয়াতের প্রেমিক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুফাসসিরে কোরআন ও খতিব

মনিপুর বাইতুর রওশন জামে মসজিদ, ঢাকা

"