মতামত

শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধ

প্রকাশ | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

মাতৃত্ব কোনো দায়িত্ব নয়, বাণিজ্যও নয়। মাতৃত্ব একটি অধিকার। বলেছেন, বিশ্বখ্যাত লেখিকা ওরিয়ানা ফ্যালাসি। নারী যে একজন ব্যক্তি সে বিষয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। নারীর সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে সম্ভবত মাতৃত্বই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃত্তি। সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ানো একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। প্রকৃতপক্ষে মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে নারীর একটি মহত্তম, সুন্দরতম আর গৌরবজনক ভূমিকা হিসেবে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছে বিশ্ব মানব সম্প্রদায়। সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়ানো একটি সেকেলে ও লজ্জাজনক কর্ম হিসেবে বিবেচনা করা যেমন অন্যায়, তেমনি স্তনকে প্রধানত যৌন অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নারীকে তার গৌরব থেকে বঞ্চিত করে একটি মহৎ ও সুন্দর আচরণকে অশ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা অনৈতিক এবং অগ্রহণীয়। তবে এ কথা আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, কৃত্রিম খাদ্য গ্রহণ এবং বুকের দুধ না খাওয়ানো মা ও শিশু উভয়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য মারাত্মক হুমকি।

ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ফাতেমা পারভীন চৌধুরী বলেছেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে যখন মায়ের দুধ সংরক্ষণের জন্য মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক স্থাপনের চিন্তাভাবনা চলছে, তখন আমাদের মতো দরিদ্র দেশের মায়েরা এ থেকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন। শিশুকে জন্মের পরক্ষণেই মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত বলে বেশ কিছু টিপসের মধ্যে যেটা জরুরি বলে গুরুত্ব আরোপ করেন, তা হচ্ছে, মা যদি কর্মজীবী হন তবে তিনি বাটিতে দুধ নিংড়ে রেখে যেতে পারেন। নিংড়ানো দুধ ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ভালো থাকে। আর ফ্রিজে রাখলে পুরো একদিন ভালো থাকে। প্রথম যে দুধ নির্গত হয়, তাকে ‘শালদুধ’ বলে। শালদুধ লিভিং সেল হিসেবে নবজাতকের দেহে প্রবেশ করে, যা নবজাতককে অনেক রোগের কবল থেকে রক্ষা করে। অথবা রোগ-বিরোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। শিশু জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮০ দিন শুধু মায়ের দুধের ওপর বেঁচে থাকবে, ওই শিশু রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মায়ের দুধ শিশুর জন্য এমনভাবেই তৈরি হয়, যা সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণসম্পন্ন। সব জাতীয় খাবার তাতে নিহিত রয়েছে। তা ছাড়া এর মধ্যে একটি বিশেষ প্রোটিন ও আমিষ আছে, এই জিনিসটি এখন পর্যন্ত সাপ্লিমেন্ট করা সম্ভব হয়নি।’

সভ্যতার আধুনিকতার অগ্রগতিতে পশুর দুধ প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সচেতনতার অভাবে মুনাফালোভী বহুজাতিক দুধের কোম্পানিগুলো তাদের মনোস্তাত্ত্বিক ও আগ্রাসী বিজ্ঞাপন কৌশলের বলে বাহারি বিজ্ঞাপন এবং অবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ফাঁদে পা দিচ্ছেন সব স্তরের মায়েরাই। মানব শিশুদের মায়ের দুধপান করা থেকে বহুদূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং এই নিষ্পাপ শিশুদের টিনের দুধের বিষ প্রাণ হরণের দিকে ধাবিত করছে। তা ছাড়া অর্থনৈতিক বিষয়টি জরিপ করে দেখা গেছে, প্রতি কেজি কৃত্রিম শিশুখাদ্যের মূল্য প্রায় ৫০০ টাকা। একটি শিশুর পরিপূর্ণ পুষ্টির জন্য মাসে কৃত্রিম শিশুখাদ্যের জন্য খরচ হচ্ছে ২০০০ টাকা। একজন নি¤œ বেতনভোগী কর্মচারীর সাকল্যে মাসিক বেতন ২২০০-২৩০০ টাকা। তাহলে সেই পরিবারের শিশুখাদ্য জোগান দিতে বেতনের মোটামুটি এক শ-ভাগই খরচ হয়ে যাওয়া মানে ওই পরিবারটির দুরবস্থার কথা অনুমান করা যায়। মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারটিকে আবশ্যকীয় করার লক্ষ্যে দুধের বিকল্প হিসেবে গুঁড়ো দুধের প্রচারণা বন্ধ, প্রথম ছয় মাস শিশুকে গুঁড়ো দুধ না দেওয়াÑএসব ক্ষেত্রে নীতিমালা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিবিএফের সহকারী সমন্বয়কারী ডা. নিবেদিতা ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনজিওদের মাধ্যমে মায়ের প্রতি সহায়ক দল-মাদার সাপোর্ট গ্রুপ গঠন করে যাচ্ছে। এদের কাজ হলো মাকে শালদুধসহ বুকের দুধ পান করানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করা। বাসায় কর্মক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ-প্রদানের বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করা। আমাদের, বিশেষ করে টিনজাত গুঁড়ো দুধের ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে এবং গুঁড়ো দুধে শিশুর অধিক পুষ্টিÑ এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ধারণা আত্মবিশ্বাস থেকে দূর করতে হবে। গর্ভবতী মাকে শুরু থেকেই হাতে-কলমে সঠিকভাবে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে শিক্ষা দিতে হবে। মা যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন, তবে কোনোভাবে শিশুকে তার বুকের দুধের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’

বাংলাদেশের মায়েরা বছরে ৭০০ মিলিয়ন লিটার বুকের দুধ খাওয়ান। তারা যদি সফলভাবে দুধ খাওয়ান তাহলে আরো ৪০০ মিলিয়ন লিটার বুকের দুধ উৎপাদন করতে পারেন। এতে মায়ের দুধের মোট পরিমাণ হচ্ছে ১১০০ মিলিয়ন লিটার, যা বর্তমানে আমদানি করা ৮৩৭ মিলিয়ন লিটার গুঁড়ো দুধের চেয়ে পরিমাণে এবং মূল্যে অনেক বেশি। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিককালের সার্ভিলেন্স স্টাডি অনুযায়ী মাত্র ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মা ছয় মাস বছর পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ পান করান। জন্মের আট ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান মাত্র ৩২ দশমিক ২ শতাংশ মা। সারা পৃথিবীজুড়ে বুকের দুধ পান করানোর পক্ষে জোর প্রচার চলছে। কারণ সুস্থ মা ও শিশু মানেই সুস্থ জাতি। মায়ের বুকের দুধ এ সুস্থতা প্রদানে শক্তিশালী উপাদান। স্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞদের মতে, নবজাতকের প্রাথমিক টিকাই হচ্ছে শালদুধ বা কলসট্রাম ইমিউনো গ্লোবিউলিনে সমৃদ্ধ, যা শিশুকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। আরো আছে জীবাণু ধ্বংসকারী শ্বেতকণিকা-লিউকোসাইটা, যা শিশুকে অসুখ-বিসুখ থেকে রেহাই দেয়। তা ছাড়া শিশুকে দুধ পান করালে মায়ের শরীরের পক্ষেও উপকারী। স্তনপানে মায়ের শরীরের বাড়তি মেদ কম হয়। মাতৃদুগ্ধতা অক্সিটোসিন বলে একটি হরমোন থাকে, যা একজন মায়ের ইউটেরাকে আবার আগের আকার ও অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। স্তন ওভারিয়ান ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।

বিশ্ব এবং দেশব্যাপী সুস্থ শিশু গঠনে মায়ের দুধের পক্ষে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সফল করতে শুধু নিজের ঘরে নয়, বাইরে অফিসে, দোকানে, হাট-বাজারে, সর্বত্র একটা নতুন প্রেক্ষাপট গড়ে উঠুক। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মায়ের দুধ আদর্শ খাদ্য। শিশুর জন্য মায়ের দুধ অবশ্যই অফুরন্ত শক্তির উৎস। কিন্তু সে কথাই সব নয়। বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মা বা নারী তার নিজের জন্য নিজের মধ্যেও এক ধরনের শক্তির উৎস উপলব্ধি করতে পারেন এবং এই উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে নারী নিজের জীবন ও পরিবেশের ওপর আরো অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

"