পর্যালোচনা

পরিবেশবান্ধব আউসের চাষ

প্রকাশ | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

পৃথিবীর ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। আবহমানকাল থেকে এ দেশে আমন, আউস ও বোরোÑএই তিন ধরনের ধানের চাষ হয়ে আসছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বোরো ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির পানিকে কাজে লাগিয়ে যদি স্বল্পমেয়াদি আউস ধানের চাষ করা যায়। তবে এ সময়ে দেশে ৩৫ লাখ হেক্টর জমিতে এক কোটি টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন করা সম্ভব। মন্তব্যটি বিজ্ঞানীদের।

বোরো ধান কাটা থেকে আমন ধান লাগানোর পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৯০ থেকে ১০০ দিন সারা দেশে অনেক জমি ফাঁকা থাকে। এ সময় অনায়াসে স্বল্পমেয়াদি সেচসাশ্রয়ী আউস ধানের চাষ করা যায়। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও দেখেছি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক রোপা আউসের চাষ করেন। আউসের চারা রোপণের ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই আউস ধান কেটে আমন ধানের চারা রোপণ করেন। এতে ওই এলাকার কৃষক বছরে তিনটি ধানের চাষ করে অধিক লাভবান হন। আউস ধানের সুবিধা হলো : ১. রোপণ থেকে মাড়াই পর্যন্ত ৭৫ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। ২. আউস ধান বৃষ্টিনির্ভর, তেমন সেচের প্রয়োজন হয় না। ৩. আউস ধানের খড় গরু-মহিষের প্রিয় খাদ্য। খড় বিক্রি করে অনেক টাকা আয় করা যায়। ৪. অন্যান্য ধানের তুলনায় উৎপাদন খরচ কম। ৫. এর আবাদ পরিবেশবান্ধব।

বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি বেশ কয়েকটি উচ্চ ফলনশীল আউস ধান উদ্ভাবনের ফলে কৃষকের মধ্যে বৃষ্টিনির্ভর আউস ধান চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় জেলায় বাড়ছে আউস আবাদের জমির পরিমাণ ও উৎপাদন। আউসের জনপ্রিয় জাতগুলো হলো বিআর ২০, বিআর ২১, বিআর ২৪, বিআর ২৬, ব্রিধান ৪২, ব্রিধান ৪৩, ব্রিধান ৪৮, ব্রিধান ৫৫, ব্রিধান ৬৫, বিধান ৮২, ব্রিধান ৮৩, বিধান ৮৫ ও বিনাধান ১৯। এ ছাড়া বোরো মৌসুমের ১২টি জাত আউস মৌসুমে চাষ করা যায়। এসব জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি ৩.৫ থেকে ৫ টন। আশার কথা, সম্প্রতি ব্রি হাইব্রিড-৭ নামে আউসের একটি জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, যার হেক্টর প্রতি ফলন পাওয়া গেছে ৭ টন। জাতটি আগামী মৌসুমে কৃষকের জমিতে চাষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় দেশে এ বছর আউসের বাম্পার ফলন পেয়েছেন কৃষক। জাত ভেদে একরপ্রতি ধান ফলেছে ৪০ থেকে ৫০ মন। মাড়াই মৌসুমে বৃষ্টি না থাকায় ধান কাটা ও মাড়াই কাজে তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি কৃষকের। দেশে উৎপাদিত আউস ধানের শতভাগই কাটা হয়ে গেছে। কৃষক এখন ধান শুকানো, গোলাজাতকরণ ও বিক্রি নিয়েই ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করছেন।

সরকারের কৃষি বিভাগ কয়েক বছর ধরে আউসের বিভিন্ন জাত জনপ্রিয় করার জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে। ২০১৫ সালে ৩০ কোটি ২১ লাখ এবং ২০১৬ সালে ৩৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয় আউস চাষের জন্য। ষাটের দশকের আগে দেশে আউস ও আমন ধানের চাষ হতো বেশি, তখন সেচ সুবিধার অভাবে বোরো ধানের আবাদ হাওর-বাঁওড় ও বিল এলাকার নিচু জমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেচসুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে বোরো ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চ ফলনশীল নতুন নতুন বোরো ধানের জাত ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং চীন থেকে স্বল্পদামে ক্ষুদ্র সেচযন্ত্র আমদানির কারণে দেশে বোরো ধান উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়। সারা দেশেই এ বছর আউস ধানের ফলন হয়েছে আশাতীত। জয়পুর হাটে এবার আউস ধানে হেক্টর প্রতি ফলন হয়েছে ৫ টন। জেলায় কৃষি প্রণোদনার আওতায় জয়পুরহাট জেলায় এবার এক হাজার বিঘা জমিতে আউসের আবাদ হয়েছে এবং এক হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সরকারের কৃষি প্রণোদনার আওতায় আউস ধান আবাদের সুযোগ লাভ করেন। এ জন্য কৃষকদের বিঘাপ্রতি ৫ কেজি বীজ, ২০ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি ডিএপি, ১০ কেজি এমওপি সার এবং সেচ সুবিধার জন্য নেরিকা ধানের আবাদে বিঘাপ্রতি ১০০০ টাকা এবং উচ্চ ফলনশীল আউস ধানের আবাদে বিঘাপ্রতি ৫০০ টাকা নগদ প্রণোদনা প্রদান করা হয়। এ বছর জয়পুরহাট জেলায় আউসের প্রণোদনা হিসেবে কৃষক ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা পেয়েছেন। অন্যদিকে কুমিল্লার বরোরা উপজেলায় এবার ১১ হাজার ৯৭৫ একর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১১ হাজার ৯৯৫ একর জমিতে আউসের আবাদ হয়েছে। কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বোরোরায় বিঘাপ্রতি ধান ফলেছে ১৫ থেকে ১৬ মণ। এই ফলনে কৃষক অত্যন্ত খুশি।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলায় এ বছর ২ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আউসের আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। উপজেলা বোধখানা গ্রামের আসকর আলী এ বছর সাড়ে ৬ বিঘা জমিতে ব্রিধান ৪৮ জাতের চাষ করেন। বিঘাপ্রতি তার ফলন হয়েছে ১৮ মণ। তার মতে, বীজতলা, জমি তৈরি, ধান রোপণ, নিড়ানি, সম্পূরক সেচ, অন্যান্য পরিচর্যা, কাটা ও মাড়াই বাবদ প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে ৮ হাজার টাকা। ৬০০ টাকা দরে ১৮ মণ ধান বিক্রি করে তার বিঘাপ্রতি আয় হয় ১০ হাজার ৮০০ টাকা। ধানের খড় বিক্রি করে আরো আয় হয় ৩ হাজার টাকা। মোট আয় ১৩ হাজার ৮০০ টাকা। খরচ ৮ হাজার টাকা বাদ দিলে নিট লাভ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা। অল্প সময়ে এক বিঘা জমি থেকে ৫ হাজার ৮০০ টাকা নিট লাভ হওয়াতে কৃষক মোটামুটি খুশি। তবে তার কথাÑকৃষিশ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশকের দাম যেভাবে বেড়েছে, সে হিসেবে আউস ধানের দাম বাড়েনি।

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার চরপাড়া গ্রামের কৃষক মো. হেলাল উদ্দিন ১.০০ একর জমিতে ব্রিধান ৪৮ জাতের আউসের চাষ করেন। কৃষক হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এক জমি থেকে তিনি ৪০ মণ আউস ধান পেয়েছেন। এক একর জমিতে ধানের চারা রোপণ, আগাছা দমন, রোগ ও পোকা দমনসহ বিভিন্ন পরিচর্যা, ধানকাটা ও মাড়াই বাবাদ তার মোট ২৪০০০ টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে ত্রিশাল বাজারে প্রতি মণ আউস ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা মণ দরে। এই দামে ধান বিক্রি করলে তার কোনো লাভ হবে না, শুধু আসল টাকাটাই উঠবে। তবে এক একর জমির খড় বিক্রি করে তিনি ১৫ হাজার টাকা লাভ করেন।

এক কেজি ধান উৎপাদনে কমপক্ষে ৩ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের উঁচু জমিতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে বোরো ধানের আবাদের ফলে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে চলে যাচ্ছে এবং মরুময়তার লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বৈশাখের শুরু থেকে আগাম বৃষ্টিপাতের ফলে বোরো ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটছে। ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাবের কারণে উত্তর-পশ্চিমের অনেক জেলায় বোরো ধানের চাষ হুমকির মধ্যে পড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সামনে বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে বৃষ্টিনির্ভর পরিবেশবান্ধব স্বল্পমেয়াদি আউস ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বোরো মৌসুমে চাষকৃত ৫৬ লাখ হেক্টর জমির অর্ধেক অর্থাৎ ২৮ লাখ হেক্টর জমিতেও যদি বোরো এবং আমন ধান চাষের মাঝামাঝি সময়ে স্বল্পমেয়াদি উচ্চ ফলনশীল আউশের চাষ করা সম্ভব হয়, তবে তা থেকে অনায়াসে ৮৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান পাওয়া যাবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও টেকসই হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস পাবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করাও কৃষকের পক্ষে অনেকটা সম্ভব হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি)

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লিমিটেড

netairoy18@yahoo.com

"