পর্যালোচনা

নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ

প্রকাশ | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

নিরক্ষতার অভিশাপ থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্ত করতে ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ৮ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৬৬ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন শুরু হলেও বাংলাদেশে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ পালন করা শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকে। উদ্দেশ্য ছিল সব রাষ্ট্র ও জাতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে এসে সাক্ষরতা বিস্তারে উদ্বুদ্ধ করা। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলোÑ‘সাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি’। শিক্ষা মৌলিক অধিকার। এ মৌলিক অধিকার থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সবাই যাতে শিক্ষার আলোয় অলোকিত হওয়ার সুযোগ পায় এ জন্যই দিবসটির প্রচলন। দক্ষিণ আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে তুমি পৃথিবীটাকেই পরিবর্তন করতে পার।’ যে দেশে সাক্ষরতার হার যত বেশি, সে দেশ তত বেশি উন্নত। টেকসই উন্নয়ন ও উন্নততর সমাজ গঠনে যে জ্ঞান ও দক্ষতার দরকার, তা মূলত সাক্ষরতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। ইউনেসকোর ‘ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্সের’ পরিসংখ্যান মতে, এখনো বিশ্বে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মানুষ শিক্ষাবঞ্চিত। ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণায়’ ২৬ নম্বর ধারায় শিক্ষা বিষয়ে বলা হয়েছেÑ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে। অন্ততপক্ষে প্রাথমিক ও মৌলিক পর্যায়ে শিক্ষা অবৈতনিক হবে।’ এ ছাড়া সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা’ সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে এ দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৭ শতাংশ। ১৯৯১ সালে এসে তা হয় ৩৫.৩০ শতাংশ। ২০০০ সালে দাঁড়ায় ৫২.৮০ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭২.৯ শতাংশ। সাক্ষরতা খাতে ইতিবাচক সাফল্যস্বরূপ বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে ‘ইউনেসকো সাক্ষরতা পুরস্কার’ লাভ করে।

তবে এখনো কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সাক্ষরতা ও উন্নয়ন হাত ধরাধরি করে চলে। বঞ্চিত আরো প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে না পারলে তথা নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে না পারলে উন্নয়নের স্বাদ সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। এ দেশে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই নারী, শিশু (পথশিশু, শিশুশ্রমিকসহ), বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এখনো অনেক হাওর-বিল ও দুর্গম এলাকা আছে, যেখানে সাক্ষরতার হার একবারেই কম। বয়স্ক নারী ও পুরুষ ব্যক্তিদের মধ্যে এখনো বিরাট অংশ নিরক্ষর রয়ে গেছে। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে যদি ন্যূনতম শিক্ষা দিয়ে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে তারা উন্নয়নের অংশীদার হয়ে নিজেদেরও উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়ার হার এখন অনেক কমে গেছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন না করেই অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গ-ি পার হয়ে যাচ্ছে! সম্প্রতি সংস্কৃতিমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘জিপিএ-৫ এখন নির্যাতন’। বেশির ভাগ অভিভাবক এখন যে করেই হোক ছেলেমেয়ের কাছ থেকে ভালো ফলাফল পেতে ব্যস্ত! এখন শিক্ষার গুণগতমানের দিকটাতে জোর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক শিক্ষায় বেশি করে নজর দিতে হবে। সব শিশুর সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিরক্ষরমুক্ত দেশ গঠনে শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে সরকারকে বেশি করে উদ্যোগী হতে হবে। নিরক্ষতা দূরীকরণে টেকসই প্রযুক্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এ ছাড়া শতভাগ শিক্ষার হার নিশ্চিত করা, ঝরে পড়ার হার কমানো ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দেওয়া এখন আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন এনজিওকে বেশি করে এগিয়ে আসতে হবে। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন এবং শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রে সাক্ষরতাকে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই নিরক্ষরতা দূরীকরণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এই তথ্যপ্রযুক্তিই হতে পারে নিরক্ষরতা দূরীকরণের অন্যতম মাধ্যম। তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিরক্ষতা দূরীকরণে এমনই কয়েকটি ছোটখাটো বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম ইতোমধ্যে দেশে গড়ে উঠেছে। এখন ঢাকায় বসেই তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে বাইরের বিভিন্ন জেলার দুর্গম অঞ্চলে পথশিশুদের কিংবা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা শহরে বিভিন্ন পেশায় কাজ করা শিশু শ্রমিকদের অনেক তরুণ ব্যক্তি উদ্যোগেও শিক্ষা দিয়ে থাকে। অনেক বেসরকারি সংস্থাও ঢাকায় ছুটির দিনে পথশিশুদের শিক্ষায় এগিয়ে আসছে। শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনে তরুণ জনগোষ্ঠীকে আরো বেশি করে এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণের এ গণ-আন্দোলন সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। নতুন নতুন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল মধ্যম আয়ের দেশ’ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত দেশ’ গড়ার অঙ্গীকার প্রায় ২৮ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে সম্ভব নয়। জাতিসংঘ প্রণীত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার’ (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্য ‘মানসম্মত শিক্ষা’। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন ও সর্বস্তরে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সবার আগে দরকার শতভাগ সাক্ষরতা।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

"