বিশ্লেষণ

আত্মহত্যার পক্ষে না বলুন

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

এস এম মুকুল

বিশেষজ্ঞদের মতানুযায়ী, পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেও সেটি দ্রুত কার্যকর না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে চরম মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা গ্লানি, যা কষ্টের সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেলে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। মনে রাখা দরকার, এ জীবন শুধু নিজেকে নিয়ে নয়। নিজের দুঃখ, কষ্ট, কঠিন সমস্যার গ-ির বাইরেও আছে এক বড় পৃথিবী। যেখানে অন্যরাও পুরোপুরি সুখী নয়। নিঃসঙ্গতা, চরম একাকিত্ববোধ থেকেও আত্মহত্যার চিন্তা মনে আসে। একটু ভাবলেই দেখবেন, নিজেকে নিঃশেষ করার আগে চারদিকে তাকান, দেখবেন বেঁচে থাকার মতো অনেক কারণ আছে। আছে অনেক প্রয়োজন। পৃথিবীর থেকে অনেক কিছু উপভোগের আনন্দের উৎস আছে। আবার পৃথিবীকে অনেক কিছুই দেওয়ার আছে আপনার। কেন আপনি শূন্যতায় ঝাঁপ দেবেন। আপনার জীবনের অনেক মূল্য। অবারিত সম্ভাবনা আছে আপনার মধ্যেও। মন হালকা করুন, দেখবেন আত্মহত্যার হাতছানিও উধাও হয়ে যাবে। আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে ভাবুন, পৃথিবীতে আপনি একাকী নন। আবার আমরা সবাই একা। সবাইকেই চলে যেতে হয়। জীবন চলার পথে বাধা, ব্যর্থতা, পরাজয় আছেই। তারপরও আছে জয়ের অমিত সম্ভাবনা।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে আত্মহত্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যাই বেশি, যাদের বয়স ১৪ থেকে ৩০ বছর। বাংলাদেশ পুলিশ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানও প্রায় কাছাকাছি। এ কারণে বাংলাদেশে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজকরা এবার বাংলাসহ ৭১টি ভাষায় এই প্রতিপাদ্যের ব্যানার তৈরি করছেন বলে জানা গেছে। ২০১০ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ কর্তৃক প্রকাশিত এবং প্রফেসর এ এম এম ফিরোজ ও প্রফেসর এস এম নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যাপ্রবণ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের আত্মহত্যার প্রবণতা মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। আরো বলা হয়, বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আত্মহত্যা করেন, যার মধ্যে বিষপানে আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালে নভেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। দুই বছরের এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি আত্মহত্যা করেছে। এসব আত্মহত্যা ঘটনার বেশির ভাগই ফাঁসিতে ঝুলে, বিষপান অথবা আগুনে পুড়ে ঘটছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন ও এনজিওর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজারেরও বেশি নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেন।

১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হবে। বাংলাদেশেও দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। এ উপলক্ষে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপের গ্রহণ করেছে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি)। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করি একসঙ্গে’। আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা ২০০৩ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় দিবসটি পালন করে থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ধনী দেশগুলোয় সাধারণত বেশি বয়সী মানুষ আত্মহত্যা করে। দরিদ্র দেশগুলোয় অল্প বয়সের মানুষ আত্মঘাতী হয় বেশি। ৭৫ শতাংশেরও বেশি আত্মহননের ঘটনা ঘটে দরিদ্র দেশগুলোয়। বেশির ভাগ দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আর ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় দুই কোটি নারী-পুরুষ আত্মহননের চেষ্টা করে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নারী-পুরুষ আত্মহননের মাধ্যমে মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা আত্মহত্যা করে, তাদের তিনজনের মধ্যে একজন মাদকাসক্ত এবং আর ৭৫ শতাংশ মাদকাসক্তই আত্মহত্যার প্রবণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এবং জাপানে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। গত ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে, মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আত্মহত্যার হার শতকরা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। সারা পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে, তার মধ্যে ২.০৬ শতাংশ বাংলাদেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রতি লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি বছর এ সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মহসিন আলী শাহ্? বিবৃতিতে বলেন, আত্মহত্যা মানে নিজেকে হত্যা করা ঠিকই কিন্তু পাশাপাশি এর সঙ্গে থাকতে হবে নিজেকে খুন করার প্রগাঢ় ইচ্ছাশক্তি। তিনি বলেছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবার আগে যা করণীয় তা হলো, এর কারণগুলো খুঁজে বের করা। শুধু চিকিৎসক নয়, পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব পরিবার এবং সমাজ থেকেই।

আত্মহত্যাকে অনেক ধর্মেই পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, তার নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ আছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণ দেখে জানা যায়, মানুষ তখনই আত্মহত্যা করে যখন তার জ্ঞান, বুদ্ধি, উপলব্ধি এমনকি অনুধাবন শক্তি পর্যন্ত লোপ পায়। সে তখন নিজেকে অসহায় এবং ভরসাহীন মনে করে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও হেনস্তার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সংকটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিভেনটিং সুইসাইডে বলা হয়, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। সারা বিশ্বে প্রতি ২ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে এবং প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন সফলভাবে আত্মহত্যা করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এ সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অপর এক তথ্য থেকে জানা যায়, গত ৪৫ বছরে ৬০ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা, ধনী দেশগুলোয় বেশি বয়সী মানুষ এবং দরিদ্র দেশগুলোয় অল্প বয়সের মানুষ আত্মহত্যা বা আত্মঘাতী হয় বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দরিদ্র দেশগুলোয় ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নেয় ৭৫ শতাংশেরও বেশি। বেশির ভাগ দেশে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আর ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীরা ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মহত্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন মানুষকে যদি চিহ্নিত করা যায়, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কথা বলার সুযোগ পেলে সেই পথ থেকে তার ফিরে আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। তাদের মতে, বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে অসংখ্য হটলাইন চালু করা জরুরি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে ‘কান পেতে রই’ নামে এ ধরনের একটি হেল্পলাইন চালু হয়েছে। যারা মানসিক বিষাধগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সমস্যা সমাধানের নানা পথ বলে দেয়। (সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগের নম্বর : ০১৭৭৯৫৫৪৩৯১, ০১৭৭৯৫৫৪৩৯২, ০১৬৮৮৭০৯৯৬৫, ০১৫১৭৯৬৯১৫০)।

আত্মহত্যার পূর্ববর্তী মানসিক লক্ষণসমূহ

ঘন ঘন মৃত্যুর কথা বলা, আমি বাঁচতে চাই না, দূরে কোথাও চলে যাব, জীবন দিয়ে দেব এসব বলা। এ ছাড়া শারীরিকভাবে নিজের ক্ষতি করা যেমন : হাত কাটা, নিজের শরীরে আঘাত করা। বড় কোনো দুর্ঘটনার স্বীকার, কাছের প্রিয় কোনো ব্যক্তিকে হারানো (মৃত্যু/হারিয়ে যাওয়া), ডিভোর্স, আপন ব্যক্তিদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা, মানসম্মানহানি, ব্যবসায় ক্ষতি। পারসোনালিটির পরিবর্তন, সব সময় দুঃখী হয়ে থাকা, অন্যমনস্ক, চিটচিটে মেজাজ, হতাশ, ক্লান্ত হয়ে থাকা। ব্যবহারে পরিবর্তন, স্কুল-কলেজে, কাজের জায়গায়, দৈনন্দিন জীবনের কোনো কিছুতে মন দিয়ে কাজ না করতে পারা। ঘুমের সমস্যা, বাজে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা, অনেক রাতে/ভোরে না ঘুমিয়ে চলাফেরা করা। খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম, খাবারে অনীহা কিংবা অতিরিক্ত খাওয়া। আত্মমর্যাদা কমে যাওয়া, নিজেকে গুরুত্বহীন মনে করা, নিজের প্রতি ঘৃণা, লজ্জাবোধ হওয়া।

ভবিষ্যতের কোনো আশা না থাকা।

আত্মহত্যাপ্রবণতা কমানো সম্ভব

নিজের প্রতি যতœবান হওয়া : নিজের প্রতি যতœবান হলে, নিজেকে ভালোবাসতে শিখলে মানুষ জীবনের মায়া বেশি করে। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদা মানুষকে অনেক ওপরে নিয়ে যেতে পারে।

একাকিত্ব থেকে আত্মহত্যাপ্রবণতা বেশি কাজ করে। তার মধ্যে সাহস জোগাতে হবে, জীবনের মূল্য বোঝাতে হবে। পারিবারিক সহযোগিতা অনেক বড় জিনিস। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এমন ব্যক্তিদের সেই সময় পারিবারিক সাহায্যের খুব প্রয়োজন হয়। নিজের ফিলিংস শেয়ার করার মাধ্যমে মন হালকা করা। আত্মহত্যা দমনে গণসচেতনতারর বিকল্প নেই। সর্বস্তরে আত্মহত্যা প্রতিহত করতে গণসচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে হবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

(সূত্র : Internation Assosiation For Suicide Prevention-IASP)

"