বিশ্লেষণ

যে জীবন নদীভাঙনের

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের কথা মনে পড়ে যায়, ‘একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।’ সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন নদীতীরবর্তী জনপদে নদীভাঙনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। নদীভাঙন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বছরের অন্যান্য সময় নদীভাঙনের খবর খুব বেশি শোনা না গেলেও প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমের সময়টাই নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করে। সম্প্রতি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী ও এসব নদ-নদীর শাখা নদীতে ভাঙনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে নদী পারের বাতাস। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলায় পদ্মার ভাঙন ও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পদ্মার ভাঙনে প্রতিদিনই মানুষের স্বপ্ন ভাঙছে, কপাল পুড়ছে। নিজেরাই ভেঙে ফেলছেন নিজেদের হাতে গড়া আপন ঘরবাড়ি। চেনা নদী বাড়ির দুয়ারে এসে হানা দিয়েছে অচেনা ভয়ংকররূপে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে নদী পারের কোনো কোনো গ্রাম-ইউনিয়ন! সাধারণত প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে নদীর ভাঙন দেখা দেয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমে নদনদীর ভাঙন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের খাল-বিল-প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে নদীর ওপর বাড়তি পানির চাপ পড়ছে। বৃষ্টিপাত ও নদীর উজানে পানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রচ- গতির সৃষ্টি হলে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। তা ছাড়া নদী সমুদ্রের কাছাকাছি এলে স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি হলে সেই বাধা ঠেলে সবকিছু ভেঙেচুরে নদী সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। নদীতে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দিলে তা নদীভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নদীতীর পলি মাটি দ্বারা ভরাট হওয়ার কারণে অল্প বৃষ্টিপাতেও নদীভাঙনের সৃষ্টি হতে পারে। দিনে দিনে নদ-নদীগুলোর নাব্য সংকট বেড়ে যাচ্ছে। নদীগুলো থেকে অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করা হচ্ছে। নদীর ওপর এতসব অত্যাচারের কারণে নদীভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীভাঙনের প্রাকৃতিক কারণ রোধ করা না গেলেও মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোও যদি দূর করা যায় তাহলে অর্ধেকের বেশি এলাকায় নদীভাঙন কমানো সম্ভব হবে।

আমার এক শিক্ষক বলতেন, নদীর পাশে বাড়ি, ষোলো বছরের নারী আর বেসরকারি চাকরি এগুলো ক্ষণস্থায়ী! সত্যিই, নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে। নদীভাঙন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুর্যোগ ও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবহমান নদী যেমন তার চলার গতিপথ বারবার পরিবর্তন করে, ঠিক তেমনি ভাঙনের ফলে মানুষের জীবনের গতিপথও বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। তথ্য মতে, দেশে ভূমিহীনদের ৫০ ভাগই নদীভাঙনের শিকার। ভাঙনের শিকার হয়ে নদী পারের মানুষের বারবার ঠিকানা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এক গবেষণা বলছে, নদীভাঙনের কারণে সারাজীবনে একজন মানুষের গড়ে ২০ বারের বেশি ঠিকানা পরিবর্তন করতে হয়। সারা দেশে নদীভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব ও ভূমিহীন হয়ে ‘নদী সিকস্তি’ (নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভূমি হারিয়ে অসহায় মানুষ) তকমা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের। একসময় যারা ছিল গ্রামের অবস্থাসম্পন্ন পরিবার, ছিল ফসলি জমির মালিক তারাই আজ ভাঙনে জমিজমা-ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব। নদীভাঙনে কিছুই থাকে না। সবই ভাসিয়ে নিয়ে যায় চেনা নদী। সত্যি কথা বলতে, নদী পারের মানুষের চোখে ঘুম নেই। নদীভাঙনের কবলে পড়ে বাদশাও ফকির হয়ে যেতে পারে! বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০ ভাগই নদ-নদী অববাহিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য নদ-নদীর মধ্যে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ডাকাতিয়া, বংশী, আড়িয়াল খাঁ, কর্ণফুলী, কুমার, কুশিয়ারা, কীর্তনখোলা, তিস্তা, ঘাঘট, কংস, সুরমা, সাঙ্গু, যমুনেশ্বরী, মাতামুহরী, দুধকুমার, গড়াই, চিত্রা, মহানন্দা, করতোয়া, ভদ্রা, ভৈরব, ইছামতীসহ নদীবিধৌত এ দেশের ছোট-বড় মিলিয়ে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। বাংলাদেশের নদ-নদীর তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার তটরেখা নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এসব নদ-নদীর ভাঙনে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সবকিছু হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে এই পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।

নদীভাঙনের শিকার মানুষের বেশির ভাগই ঠিকানা হয় শহরের বস্তিতে। অনেকের আবার জায়গা হয় শহরের ফুটপাতে, রেললাইনের পাশে। আবার বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত জমিসহ প্রভৃতি স্থানে কোনো রকমে ভাসমানভাবে বসবাস করে ‘নদী সিকস্তি’ মানুষ। নদীভাঙনের শিকার এই বাস্তুহারা জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ ঢাকা শহরে বস্তিতে বসবাস করে থাকে। পুরো বর্ষা মৌসুম জুড়ে চলতে থাকে ভাঙনের তা-বলীলা। বর্ষা শেষে ভাঙনের প্রকোপ কিছুটা কমলেও বছরজুড়ে তা কমবেশি মাত্রায় চলতে থাকে। তথ্যমতে, ভাঙনের কবলে পড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার একর জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বন্যা বাংলাদেশের এক নম্বর দুর্যোগ হলেও বর্তমান সময়ে নদীভাঙন বন্যাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কেননা নদীভাঙন সারা বছর ধরে তার ভাঙনের ভয়াল রূপ অব্যাহত রাখে। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টারের’ (বিডিপিসি) এক জরিপে বলা হয়েছে, নদীভাঙনে প্রতি বছর উদ্বাস্তু-গৃহহীন মানুষের ভাসমান সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার করে বাড়ছে। এ বিপুল মানুষের গন্তব্য শহরের বস্তি। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫১টি জেলাতেই কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়। তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে নদীভাঙনের ফলে ভূমি বিলীন হয়েছে প্রায় সাত লাখ একর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। এ সময়ে অর্থনৈতিকভাবে দেশের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৮৫টি শহর ও বন্দরসহ মোট ২৮৩টি স্থানে নিয়মিত প্রতি বছর নদীভাঙন দেখা দেয়। নদীভাঙনে মানুষের বসতভিটা, মাথা গোঁজার ঠাঁই, গাছপালা, ফসলি জমি, বাজার-দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন স্থাপনা, পূর্বপুরুষের মূল্যবান স্মৃতিসহ সবকিছুই নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ভোলা, বরিশাল, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুরে প্রতি বছর কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়।

গ্রামীণ দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ এই নদীভাঙন। নদীভাঙনকবলিত মানুষের জীবনে সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভাঙনের শিকার মানুষরা জীবনের তাগিদে দ্রুত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অসহায় নিঃস্ব মানুষের জীবনে নেমে আসে বেকারত্ব ও চরম দারিদ্র্য। নদীভাঙনে অনেক জনপদের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। প্রতি বছর নদীভাঙনে বিরাট একটা জনগোষ্ঠীর ক্ষতি হচ্ছে আর এ ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও সুফল মিলছে না। নদীভাঙনের শিকার বৃহত্তর একটা জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভবও নয়। দক্ষিণ এশিয়াসহ পাশের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশের মতো এত বেশি নদীভাঙন দেখা যায় না। বাংলাদেশে নদীভাঙন প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের মতোই ভয়াবহ হলেও ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের অবস্থা পরিবর্তনে ও নদীভাঙন রোধে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেই বললেই চলে। যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা সাময়িক ও পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য! ফলে নদীভাঙন চলছেই। নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নদী পারের জনগণ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। ভাঙনের শিকার জনগোষ্ঠী সরকার, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। ভাঙনকবলিত এলাকায় এখন-ই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে অনেক এলাকা। ভাঙন রোধে কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করা সময়ের বাস্তবতা। নদী প্রকৃতির দান। প্রকৃতির ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। নদীভাঙন রোধে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি নদী থেকে বালু উত্তোলন ও নাব্য সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে নদী শাসন করতে হবে। নদীভাঙন রোধে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নদীভাঙন রোধে বৈজ্ঞানিক ও উন্নত প্রযুক্তির পন্থা অবলম্বন করতে হবে। বিশ্বের বহু দেশে প্রমত্তা নদীতে শাসন করে বা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নদী মানুষের বশীভূত করা হচ্ছে। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে সমুদ্রের বুকে বাঁধ দিয়ে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে, আর সে হিসেবে নদী আয়ত্তে আনা তো সাধারণ কাজ! ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতি বছর পাশের অন্য দেশের পানিসম্পদের বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে শুকনো মৌসুমে একদিকে ব্যাপক পানির অভাবে ভুগছে, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধ ভারতসহ বাংলাদেশের জন্যও এখন বিপদ ডেকে আনছে! গঙ্গানির্ভর নদ-নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ভারতের সঙ্গে এখনই বোঝাপড়া করা উচিত। ভাঙনরোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে ভাঙনকবলিত অংশের নদীর তীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভাঙনরোধে বালুর জিও ব্যাগ, সিসি ব্লক, ক্রসড্যাম নির্মাণ ইত্যাদি উপায় অবলম্বন করা হলেও, তাতে খুব বেশি সফলতা আসছে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তীর বাঁধাই করার পাশাপাশি পরিকল্পিত ও স্থায়ী উদ্যোগের কথা চিন্তা করতে হবে। এ ছাড়া ‘নদী সিকস্তি’ মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার পাশাপাশি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

 

"