মতামত

গাড়ি নয় জীবন্ত বোমা

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানি একটি নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। গত তিন বছরে সিএনজিচালিত ১৭৫টি গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষ। একের পর এক সিলিন্ডার বিস্ফোরণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দুর্ঘটনার রাশ টানার কোনো উদ্যোগ না থাকা উদ্বেগজনক। জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৮০ সিএনজি কনভার্সন ওয়ার্কশপ রয়েছে। দেশে দুই লাখ ৫৪ হাজার ৫২২ গাড়ি জ্বালানি তেল থেকে সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব গাড়িতে সিলিন্ডার রয়েছে চার লাখ।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী সিএনজি কনভার্সন সেন্টারসমূহে বড়জোর ৬৫ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে। আগের দুই বছর যোগ করলে পাঁচ বছর মেয়াদোত্তীর্ণ ৯৪ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হলেও বাকি তিন লক্ষাধিক সিলিন্ডার আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও রিটেস্ট করা হয়নি। সড়ক-মহাসড়কে চলন্ত অবস্থায় প্রায়ই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হচ্ছে, দুর্ঘটনায় যানবাহন ভস্মীভূতসহ প্রাণহানিও ঘটছে অহরহ। বৈধভাবে সংযোজিত তিন লক্ষাধিক সিলিন্ডার ইতোমধ্যে রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে আছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নকল-ভেজাল নিম্নমানের অসংখ্য সিলিন্ডার। রিটেস্টবিহীন সিলিন্ডারগুলো চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কারে ব্যবহৃত হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ, ত্রুটিযুক্ত সিলিন্ডারগুলো একেকটি জীবন্ত বোমা হিসেবে বিরাজ করছে। দেশে এ পর্যন্ত সিএনজিচালিত যেসব সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে, তার প্রতিটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এসব সিলিন্ডারে কোনো সেফটি সিস্টেম ছিল না। ইদানীং পুরনো জাহাজের মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারকেও গাড়িতে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। ভয়ংকর ঝুঁকি হয়ে ওঠা এসব সিএনজি সিলিন্ডার যানবাহনের যাত্রীই শুধু নয় পথচারীদের কিংবা অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের জন্যও হুমকি হয়ে চলাচল করছে। জনস্বার্থে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা দরকার। সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারবাহী গাড়ি আটকের বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে।

যানবাহন ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারগুলো নাগরিকদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার এবং পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট করার নিয়ম না মেনে গাড়িচালকরা জীবন্ত বোমা নিয়ে যানবাহন চালাচ্ছেন। চালকদের পাশাপাশি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার যাত্রী এমনকি পথচারীদের জীবনের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে। প্রায়ই ঘটছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২০০ পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়, ওই সময় গাড়ি ভয়াবহ বোমা হয়ে বিস্ফোরণের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে, এ আশঙ্কা রোধে গ্যাস সিলিন্ডারের সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। এদিকে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু এলপিজি সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়েছে। মানহীন সিলিন্ডার ব্যবহার করায় নিরাপদ রান্নাঘর হয়ে উঠেছে বিস্ফোরণের বিপজ্জনক স্থান। বাধ্যবাধকতা থাকলেও সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষায় কেউ উদ্যোগী হচ্ছে না। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় দুই লাখ গাড়ি বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলছে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রতিদিনই খবরের কাগজ কিংবা টেলিভিশন খুললেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতের দেখা যায়। ইদানীং এ বিস্ফোরণের সংখ্যাটা যেন একটু বেশিই চোখে পড়ছে। তবে সাধারণ কিছু নিয়ম জানা থাকলে সহজেই এড়ানো যেতে পারে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ১. খালি সিলিন্ডার থেকে গ্যাসের রেগুলেটর খোলার সময় আশপাশে কোনো জ্বলন্ত মোমবাতি রাখবেন না। ২. গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে যে রবার পাইপটি থাকে, সেটিতে ‘আইএসআই’ ছাপ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তার সঙ্গে আরো একটি বিষয় হচ্ছে, গ্যাসের পাইপটি যেন দৈর্ঘ্যে এক থেকে দেড় ফুটের বেশি লম্বা না হয়। সে ক্ষেত্রে পাইপ পরীক্ষার সময় অসুবিধা হবে। ৩. রেগুলেটরের নজলটি যাতে পাইপ দিয়ে ভালো করে কভার করা থাকে। ৪. গরম বার্নারের সঙ্গে যাতে গ্যাসের পাইপ কোনোভাবে লেগে না থাকে। ৫. পাইপটি নিয়মিত ভিজে কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে, ভুলেও সাবান ব্যবহার করা যাবে না। ৬. দুই বছর অন্তর অবশ্যই পাইপটি বদলে ফেলতে হবে। ৭. সিলিন্ডারের ওপর কখনো কোনো কাপড় বা থালাবাসন রাখা যাবে না। ৮. গ্যাস লিক হচ্ছে বুঝতে পারলে বাড়ির কোনো ইলেকট্রিক অ্যাপ্লায়েন্স অন করা যাবে না। ওভেন, রেগুলেটর বন্ধ করে দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে। গ্যাস লিক করার পর যদি কিছুক্ষণের মধ্যে গন্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস বা হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। সিলিন্ডার থেকে রেগুলেটর আলাদা করে দিয়ে সিলিন্ডারের মুখে সেফটি ক্যাপও পরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। একটি ঘরে দুটি সিলিন্ডার রাখার জন্য অন্তত ১০ বর্গফুট জায়গা থাকা জরুরি। এমন জায়গায় সিলিন্ডার রাখা যাবে না, যেখানে সহজেই তা অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে।

জেননিরাপত্তার স্বার্থে দুর্ঘটনা রোধে এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এবং সরকার সক্রিয় হবে এমনটিই দেখতে আগ্রহী।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

"