বিশ্লেষণ

ভেনিজুয়েলা সংকটের নেপথ্যে

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

রায়হান আহমেদ তপাদার

ভেনিজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে এখন। এ মুহূর্তে তাদের মুদ্রাস্ফীতির হার ১৩ হাজার ৮০০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। গত ৩০ বছরের মধ্যে তাদের জ্বালানি তেলের উৎপাদন এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তাদের জিডিপি আরো কমবে বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অনুমান। এমন পরিস্থিতিতে ‘অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের সত্যিকার সমাধানের আশু সম্ভাবনা নেই’, এমন মন্তব্য করেছে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস। ঋণের ভারে একেবারে ডুবে যাওয়া ভেনিজুয়েলার জন্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, এমনটাই মনে করেন প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্সি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কূটনৈতিক আর অর্থনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছেন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতির এ দেশ আরো মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এসবের মধ্যে রাশিয়াসহ অল্প কয়েকটি দেশের শুভেচ্ছা বার্তাও আছে মাদুরোর প্রতি। ভেনিজুয়েলায় গত নির্বাচনে মাদুরোর জয় নিশ্চিত হওয়ার পর গত সোমবার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডাসহ লিমা গ্রুপের ১৪টি দেশ সেখান থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), লিমা গ্রুপ ও কানাডা আগেই জানিয়েছিল, তারা ভেনিজুয়েলার এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেবে না। বিরোধী নেতাদের ধরপাকড় করার পর নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত মাস আগেই এ নির্বাচন হয়েছে।

এ ছাড়া জি-২০ ভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশ জানিয়েছে, তারা ভেনিজুয়েলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। এতে আমেরিকানদের ওপর ভেনিজুয়েলায় বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ভেনিজুয়েলার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপরও। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায়, স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নির্বাচন করতে, সব রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তে মুক্তি দিতে, নিপীড়ন বন্ধ করতে এবং ভেনিজুয়েলার জনগণকে অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে আমরা মাদুরো সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ আরিয়াজা এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘উন্মত্ততা, বর্বরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক’ অ্যাখ্যা দেন। মাদুরোর জয়ে অনেকগুলো দেশের বিরোধিতার মধ্যেই তাকে স্বাগত জানিয়েছে রাশিয়া, এল সালভাদর, কিউবা ও চীন। বিশেষত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন শুভেচ্ছা বার্তায় ভেনিজুয়েলার ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসনে’ মাদুরোর সাফল্য কামনা করেছেন। আর চীনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভেনিজুয়েলার জনমতকে সব পক্ষের শ্রদ্ধা করা উচিত। মাদুরোর প্রতি গুটিকয়েক দেশের সমর্থন রয়েছে বটে, তবে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক দেশের বিশেষত শক্তিশালী অর্থনীতির বেশ কয়েকটি দেশের বিরোধিতা তাকে সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। লুইস ভিনসেন্ট লিওনের মতে, ভেনিজুয়েলার সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আকস্মিক ধসের মুখে পড়ার আশঙ্কা।

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ঊর্ধ্বতন বিশ্লেষক ফিল গানসন বলেন, ‘সংকট এতই তীব্র যে এর কারণে ক্ষমতাসীন সরকার-সামরিক মিত্রতার মধ্যে সংঘাত উসকে উঠতে পারে অথবা ব্যাপক মাত্রায় সমাজে ধস নামতে পারে। সংকট দ্রুত সামাল দিতে না পারলে সমাজের সাধারণ ও সামরিক অভিজাত শ্রেণির মধ্যেও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তার ধারণা। তবে সংকট যতই তীব্র হোক, সামরিক বাহিনীর সমর্থন যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ মাদুরো সরকারের পতন ঘটার সম্ভাবনা নেই এবং সামরিক বাহিনী এ মুহূর্তে মাদুরোর ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেবে না বলে ধারণা করছেন লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিটের বিশ্লেষক ডিয়েগো ময়া ওকাম্পোস। তা ছাড়া প্রবল খাদ্য সংকটের কারণে চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েছে ভেনিজুয়েলার মানুষ। ক্ষুধার তাড়নায় অনেকে জড়িয়ে পড়ছে লুটপাট ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।

চলতি বছরের শুরুতেই ভেনিজুয়েলান অবজার্ভেটরি ফর সোশ্যাল কনফ্লিক্ট নামক এক সংস্থা দেশটির ২৩টি প্রদেশের ১৯টিতে মোট ১০৭টি লুটপাটের ঘটনা রেকর্ড করেছে। এসব লুটপাটের সময় মানুষ হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। ভেনিজুয়েলায় লুটপাট ও ডাকাতির ঘটনা আগেও ঘটেছে, তবে এখনকার মতো নয়। বর্তমান পরিস্থিতি এভাবে এগিয়ে চললে দেশটির অর্থনীতি আরো ভেঙে পড়বে দ্রুতই। এ অবস্থার জন্য প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দায়ী করেছেন ডানপন্থি সমর্থকদের, সরকারবিরোধী বিপ্লব ও বিদেশি হস্তক্ষেপকে। কিন্তু মাদুরোর সমালোচকরা বলছেন, এ সমস্যা তৈরি হয়েছে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর হাতেই। তার সরকার বিভিন্ন খামার ও কারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়ার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে খাদ্য সমস্যা। এদিকে খাবারের মূল্য কমাতে গিয়ে তৈরি হয়েছে আরেক বিপদ। তারা কিছু খাবারের দাম এতটাই কমিয়ে দিয়েছে, যা তার উৎপাদন মূল্যের চেয়েও কয়েক গুণ কম। যার ফলে ব্যবসায়ে ধস খেয়ে পথে নেমেছে প্রচুর খাদ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। এদিকে তেল খাতে অনিয়মের কারণে সরকারের হাতে খাবার আমদানি করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আর মূল্যস্ফীতির বাজে অবস্থার কারণে বাজারে থাকা খাবার কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে অনেক পরিবার।

কৃষিমন্ত্রী ফ্রেডি বার্নাল বলেন, আমাদের জনগণকে বুঝতে হবে যে খরগোশ কোনো পোষা প্রাণী নয়, বরং তা হলো আড়াই কেজি মাংস। কিন্তু খাদ্যাভাবে চিমসে যাওয়া জনগণ মনে করছে, সরকার না, নিজেদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে তাদের নিজেদেরই। আর তাই তারা পথে নামছে, রাস্তা দিয়ে যাওয়া খাদ্যবোঝাই ট্রাক আটকে হামলে পড়ছে সেসব খাবারে। মারিওলি কর্নিএলি নামক একজন লুটার বলেন, হয় আমাদের লুট করে খাবার খেতে হবে, না হয় ক্ষুধায় মরতে হবে। এসব লুটের ঘটনা মাঝেমধ্যে হুট করে ঘটলেও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, লুট করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট গ্রুপগুলোয়। নিরাপত্তাবাহিনীগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিশ্চুপ থেকেছে। ভেনিজুয়েলা সরকার ব্যাংক নোট বাতিল করায় দেশটিতে নগদ অর্থের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আগেই অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত দেশটিতে নতুন এই সংকট যোগ হওয়ায় লোকজন মালবাহী ট্রাক লুট করছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ভেনিজুয়েলা সরকার সম্প্রতি দেশটিতে ১০০ বলিভার নোট বাতিল করে, যা তিন মার্কিন সেন্টের সমান। দেশটির মোট নগদ অর্থের ৭৭ ভাগই ছিল এই নোট। এরপর দেশটির বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা শুরু হলে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এ জন্য বিরোধী রাজনীতিকদের দায়ী করেন। তা ছাড়া ভেনিজুয়েলার মূল্যস্ফীতি বিশ্বে সর্বাধিক। দেশটির অর্থ এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার আগের নোটের চেয়ে ২০০ গুণ বেশি মূল্যমানের অর্থ বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। তবে নতুন নোট বাজারে আসার আগেই পুরনো ১০০ বলিভার নোট বাতিল করায় সরকারের পরিকল্পনা কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে। লোকজন টাকার অভাবে খাদ্য ও বড়দিনের উপহার কিনতে পারছেন না।

আমদানিনির্ভর দেশটিতে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আইএমএফ বলছে, ভেনিজুয়েলায় এবার মূল্যস্ফীতি ৪৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে মাদুরোর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। সংকটের জন্য তিনি বিরোধীদের দায়ী করেছেন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কলম্বিয়া ও ব্রাজিল সীমান্ত। এই দুটো দেশ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতেন বহু ভেনিজুয়েলান। সীমান্ত পার হয়ে আসা কার্মেন রদ্রিগুয়েজ বলছিলেন, আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আমরা ক্ষুধার্ত। আমাদের ওষুধ নেই। আমাদের কিছু নেই, কিছুই নেই। এখন আবার টাকার সমস্যা। এমনকি আমরা খাবারটুকুও কিনতে পারছি না। বিশ্বের সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে বিপর্যস্ত ভেনিজুয়েলা। মাত্র দুই সপ্তাহেই দেশ ছেড়েছে ১০ লাখ মানুষ। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট। এদিকে ভেনিজুয়েলা থেকে আসা অর্থনৈতিক অভিবাসী ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে আশপাশের দেশগুলো। সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, পাসপোর্টবিহীন কোনো ভেনিজুয়েলানকে ঢুকতে দেয়নি ইকুয়েডর। ব্রাজিলে ভেনিজুয়েলা অভিবাসীদের ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে আগুন দিয়েছে স্থানীয়রা। দরজা বন্ধ করে দিয়েছে কলম্বিয়াও। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ভুল পদক্ষেপের ফলে মুদ্রার দাম কমে গিয়ে সব ধরনের পণ্য সংকট দেখা দেয় ভেনিজুয়েলায়। ইকুয়েডর সীমান্তে আটকা পড়া গ্যাব্রিয়েল বলেন, ‘আমরা পুরো পরিবার ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে টিকে আছি। আপনি ভাবতে পারবেন না কতটা কঠিন পরিস্থিতি এখানে। আমাদের পাসপোর্ট নেই কিন্তু আমরা ফিরে গেলে না খেয়ে মারা যাব। বিপর্যস্ত ভেনিজুয়েলানরা খাদ্য সংকট থেকে বাঁচতে চিলি ও পেরুতে আত্মীয়দের কাছে আশ্রয় নিতে চাইছে। এ জন্য তারা আশপাশের দেশ পাড়ি দিয়ে চিলি ও পেরুতে যেতে চাচ্ছে কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

raihan567@yahoo.com

"