ধর্ম

নবীজীর রওজা মোবারক

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মুফতি মুহাম্মাদ এহছানুল হক

প্রতিটি মুমিনের ভালোবাসার আরেক নাম হজরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সা.)। যাকে ভালোবাসাই হলো ঈমানের বড় শর্ত। হুজুর আকরাম (সা.) যেখানে ঘুমিয়ে আছেন, সে জায়গাটি সঙ্গত কারণেই মুমিনদের প্রিয় স্থান। ওই স্থানের সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো, পৃথিবীতে একমাত্র জান্নাতের টুকরা রাসুল (সা.)-এর বিশ্রামের জায়গা সোনার মদিনার রওজা মোবারক। পবিত্র হাদিস শরিফ থেকে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, আমার ঘর এবং মিম্বরের মধ্যবর্তী জায়গাটি জান্নাতের একটি টুকরা (বুখারি শরিফ, হাদিস নম্বর : ১৯৯৫)।

মনে রাখা দরকার, সাধারণ মানুষ এবং নবী-রাসুলদের মধ্যে অসংখ্য পার্থক্যের একটি হলো, সাধারণ মানুষ মরে গেলে ঘর থেকে বের করে কবরস্থানে দাফন করা হয়। আর নবীগণ যে ঘরে ইন্তেকাল করেন, ওই ঘরেই তাদের দাফন হয়েছে। কারণ নবীরা স্ব স্ব কবরে জীবিত থাকেন আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক পান। দুনিয়াতে তারা যেখানে বিশ্রাম নিতেন, হায়াতে কবরেও তারা ওই স্থানে বিশ্রাম নেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, নবীরা নিজ নিজ কবরে জীবিত। তারা সেখানে সালাত আদায় করেন (মুসনাদে বাজজার, হাদিস নম্বর : ৬৮৮৮)।

মা আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর ঘরে হুজুর ইন্তেকালের স্বাদ নিয়েছেন। তাই তাকে ওই ঘরেই দাফন করা হয়েছে। মসজিদে নববীর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে হজরত মা আয়েশা (রা.) এর হুজরা মোবারক অবস্থিত। এটির দৈর্ঘ-প্রস্থ ৩.৫ বাই ৫ মিটারের কাছাকাছি ছিল। হুজুরপাক (সা.)-এর একফুট পেছনে হজরত আবু বকর (রা.) এবং তার এক ফুট পেছনে ওমর (রা.)-এর রওজা। এরপর একটি কবরের পরিমাণ জায়গা খালি রাখা হয়েছে। এখানে হজরত ঈসা রুহুল্লাহ (আ.)-কে আখেরি নবীর উম্মত হিসেবে দাফন করা হবে (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ৩৬১৭)।

পৃথিবীর একমাত্র জান্নাতের টুকরো সোনার মদিনার এ রওজা মোবারক জিয়ারতের ফজিলত ও মর্যাদা অনেক বেশি। রওজা শরিফ জিয়ারতে মাধ্যমে নূরনবীর শাফায়াত লাভ করা যায়। হুজুরে আকরাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার রওজা মোবারক জিয়ারত করবে, আমার ওপর ওয়াজিব হয়ে যায় ওই উম্মতের জন্য শাফায়ত করা’ (দারা কুতনি : ২/২৭৮)।’ অন্য হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে উম্মত শুধু আমার রওজা জিয়ারতের জন্য আসবে, কিয়ামতের দিন আমি নবীর শাফায়াত লাভ করা তার অধিকার হয়ে যায় (মুজামুল কাবির : ১২/২২৫)।’ একবার হজরত হুসাইন (রা.) প্রশ্ন করলেন, ‘নানা, কেউ যদি আপনার রওজা শরিফ জিয়ারত করে তাহলে তার প্রতিদান কী? প্রিয় নবীজী বললেন, কেউ যদি আমার কিংবা আহলেবাইতের কারো রওজা মোবারক জিয়ারত করে, কিয়ামতের দিন আমি তাকে গোনাহ থেকে পবিত্র করব (কিতাবুল জিহাদ ওয়াল মাজার : পৃষ্ঠা ৪৬০)।’

পবিত্র হজ বা উমরা আদায়ের আগে ও পরে আমরা রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করব এবং সেখানে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত দোয়া ও দরুদ শরিফ পড়ব। হজরত উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-কে রাসুল (সা.)-এর রওজা শরিফের সামনে দোয়া করতে দেখেছি, (ইবনে হিব্বান, হাদিস নম্বর : ৫৬৯৪)।’ ইবনে ওমর (রা.)-এর ছাত্র ইমাম নাফে (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, আপনি কি আপনার শায়েখ ইবনে ওমরকে হুজুর (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করতে দেখেছেন? নাফে (রহ.) বললেন, আমি শতাধিকবার ইবনে ওমর (রা.)-কে রওজা মোবারক জিয়ারত করতে দেখেছি। তিনি যখন রওজা শরিফের কাছে আসতেন, খুব আদবের সঙ্গে আবেগঘন কণ্ঠে বলতেন, ‘আসসলামু আলান্নাবিয়্যি, আসসালামু আলা আবি বাকরি, আসসালামু আলা আবি ওমর (রা.), (ইকতিদাউ সিরাতাল মুসতাকিম : ২/৬৬৮)।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে দিনার (রহ.) বলেন, আমি দেখেছি, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রওজা শরিফের সামনে দাঁড়িয়েছেন। সালাত ও সালাম বলেছেন এবং দোয়া করেছেন (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নম্বর : ৩৯৭)।

প্রিয় নবী (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতকারীর মর্যাদা এত বেশি যে, হুজুর (সা.) নিজে বলেছেন, ‘আমার ওফাতের পর যে উম্মত আমার রওজা জিয়ারত করবে, সে যেন আমার সঙ্গে জীবিত অবস্থায় আমার সঙ্গে দেখা করল। (মুজামুল আওসাত, হাদিস নম্বর : ২৮৭)।’ আরেকটি হাদিসে হুজুর (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ করল অতপর আমার রওজা মোবরাক জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবিত অবস্থায় আমার সাক্ষাৎ পেল, (শুআবুল ইমান, হাদিস নম্বর : ৩৮৫৫)।’

রওজা শরিফ জিয়ারতের সময় অবশ্যই রাসুল (সা.)-এর সুমহান মর্যাদার কথা স্মরণ রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন বেয়াদবির ভাব প্রকাশ না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রিয় হাবিবের শানে যেন বেয়াদবি না হয় সে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, যারা তার প্রতি ঈমান এনেছে, তারা তাকে ইজ্জত করে, সহযোগিতা করে এবং যে নূর কোরআন তার ওপর অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে। তারাই সফলকাম (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৫৭)।’

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে রাসুল (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারাত নসিব করে নবীজির সঙ্গে জান্নাতের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমরা যেন বারবার পবিত্র হজ-উমরা জিয়ারত রওজা মোবারক আদায় করতে পারি। আমিন।

লেখক : খতিব

মণিপুর বাইতুর রওশন জামে মসজিদ মিরপুর, ঢাকা

"