মতামত

মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ড. ফোরকান আলী

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান একটি দেশ। এ দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নকর্ম মূলত কৃষিভিত্তিক। তাই কৃষিশিক্ষা গ্রহণ ও দক্ষতা অর্জন হচ্ছে কৃষি উন্নয়নের মূল হাতিয়ার। কৃষি বাংলাদেশের জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির মেরুদ-। ‘জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধি হলো গাছের ন্যায়। কৃষি হলো তার মূল, শিল্প তার শাখা এবং বাণিজ্য তার পাতা। মূলে ক্ষত দেখা দিলে তা সমস্ত গাছটিকে ধ্বংস করে দেয়।’ চীনা এ প্রবাদটি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের সার্বিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি সুষ্ঠু কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। কৃষি মানুষের মৌলিক চাহিদাবলি যথাÑ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার উপাদানগুলো জোগান দেয়। কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। আমাদের দেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক কারিগরি কৃষিশিক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির সার্বিক প্রয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯২ শতাংশ লোকই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভর করে। এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আত্মকর্মসংস্থানের জন্য কৃষিশিক্ষা গ্রহণ অপরিহার্য। এ গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৯৪ সাল থেকে মাধ্যমিক স্তরে কৃষি শিক্ষাকে একটি আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৬ সালের এসএসসি পরক্ষার্থীরা আবশ্যিক হিসেবে কৃষিশিক্ষা বিষয়ে পরীক্ষা দেয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ১৯৯৭ সাল থেকে যুগোপযোগী এই কর্মমুখী ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক বিষয় কৃষিশিক্ষাকে মাধ্যমিক স্তরে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন কারণে অনেক শিক্ষার্থী আগ্রহ থাকলেও কৃষিশিক্ষা লাভ করতে পারছে না। ফলে তারা যুগোপযোগী কর্মমুখী এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের দেশে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃষি ও কারিগরিশক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের পর যাদের পক্ষে উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব নয় তারা অন্তত মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও কৃষি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মেরুদ- হচ্ছে কৃষি। মাঠ ফসল ছাড়াও কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মৎস্য পশু-পাখি এবং বনজ সম্পদ। কৃষির এসব শাখা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশে ৫৭ মিলিয়ন গবাদি পশু, ১৩৭ মিলিয়ন হাঁস-মুরগি এবং স্থলভাগের মধ্যে ২২ লাখ হেক্টর জমিতে বনাঞ্চল রয়েছে। পশু-পাখি থেকে আমরা মাংস, দুধ ও ডিম পাই; যা আমাদের আমিষ ও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। বনজ সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে। কৃষিজ বনায়নের মাধ্যমে বনায়ন সৃষ্টি করা সম্ভব। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বন থেকে আসে। কৃষির উপযুক্ত শাখাগুলোর দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্যেও কৃষি ও কারিগরি শিক্ষা আবশ্যক।

কৃষিশিক্ষা প্রসার ঘটলে সর্বস্তরের মানুষ কৃষি সম্বন্ধে জানবে। মানুষ কৃষি ও কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন হলে চাষের প্রয়োজনীয়তা বুঝবে। এ সম্পর্কে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এতে মানুষের মধ্যে চাষাবাদ ও কারিগরি কাজের উৎসাহ জাগবে। এই উৎসাহ তাদেরকে কৃষির বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে। এবং আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করতেও প্রেরণা জোগাবে। কারিগরি ও কৃষিশিক্ষায় শিক্ষিত এসব লোকজন স্ব স্ব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। শিক্ষা কাঠামোর মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা একান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাথমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি ও কৃষি শিক্ষার ওপর আরো গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাছাড়াও দেশের বৃহত্তর কৃষক জনগোষ্ঠীকে কারিগরি ও কৃষিশিক্ষা প্রদানের জন্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এ শিক্ষা কার্যক্রম সরকারের বিভিন্ন অধিদফতর পরিচালনা করতে পারে। এতে দেশের দারিদ্রতা দূর করে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

সরকারি চাকরির অপ্রতুলতার কারণে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যাশায় তরুণদের অনেকেই কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ওয়েলডিং, ইলেকট্রিকের কাজ, সেলাই ও কনফেকশনারি ব্যবসার প্রতিও শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা আগ্রহী হয়ে উঠছে। শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতেই গড়ে উঠেছে ২০টিরও বেশি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। এদিকে মেয়েরা স্বাবলম্বী হওয়ার লক্ষ্যে ঘরেই ছোট ছোট শিল্প গড়ে তুলছে। এসবই উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার। বেকারত্ব মোচনে আত্মকর্মসংস্থান কর্মসূচি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আত্মকর্মসংস্থানের প্রসার ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি সাধারণভাবে তরুণদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেলে তা অর্থনৈতিক অগ্রগতিরই সহায়ক হবে। তবে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিই কেবল বড় কথা নয়। এর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার মানের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি শিক্ষার চাহিদা মেটাতে সরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তবে সেগুলো যাতে উপযুক্ত মান রক্ষা করে পরিচালিত হয় সে ব্যবস্থাও অবশ্যক।

কর্মসংস্থানের সংকট মোচনের লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার বাঞ্ছনীয়। কারিগরি শিক্ষার সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে এ ব্যাপারে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এই লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত হওয়া দরকার। বর্তমানে দেশে যে কারিগরি শিক্ষার চাহিদা ও প্রয়োজন রয়েছে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে সরকারি উদ্যোগে যেমন আরো প্রশিক্ষণ কোর্স ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজন। তেমনি উপযুক্ত মানের প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ব্যাপকভিত্তিক সরকারি সহায়তারও দরকার। তরুণদের মধ্যে হতাশা মোচনেও কাগিররি শিক্ষা যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে সরকার প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা প্রসারের আরো ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে উন্নত, আধুনিক ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা নূতন করে ব্যাখ্যা করা অবান্তর। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং যোগ্যতা ও দক্ষতাই যেখানে উন্নতি ও সাফল্য অর্জনের ভিত্তি। সেখানে উন্নত প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি অবশ্যই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। কারণ, কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে দেশের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। কেননা বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে শিল্পনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। আর এই শিল্পনির্ভর অর্থনীতি গড়তে হলে প্রয়োজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও দক্ষ টেকনিশিয়ান। আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান ও জার্মানির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, তারা আমাদের ১০ ভাগের এক ভাগ বিদেশি ঋণ নিয়ে আজকের বিশ্ব অর্থনীতিকে শাসন করছে। সেইদিন তারা উপলব্ধি করেছিল তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে দাঁড় করাতে হলে সর্ব প্রথম প্রয়োজন শিল্প-কারখানা, কৃষি-খামার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত আধুনিকীকরণ। এই উপলব্ধি থেকে তারা সব প্রযুক্তিবিদ্যায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করে। সেখানে কারিগরি শিক্ষার হার ৫৬% এবং বর্তমানে তারা কারিগরি শিক্ষার হার ৭০%-এ উন্নীত করার জন্য আন্দোলন করছে। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর অল্প সময়ে যে বিস্ময়কর উন্নতি সাধন করেছে। তার মূলে রয়েছে তাদের শিল্পনির্ভর অর্থনীতি। আর শিল্পনির্ভর অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা। অথচ আমাদের দেশে মাত্র ৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ লোক কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ২০ শতাংশ লোক কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত। সুতরাং, দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণের স্বার্থে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে।

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, ‘কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করেছে। মিড লেভেলের কারিগরি জনশক্তি যে দেশের কর্মক্ষেত্রে যত বেশি নিয়োজিত, সেই দেশ তত বেশি উন্নতি করতে পেরেছে।’একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাপান ও অষ্ট্র্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রায় সব দেশে কারিগরিভাবে দক্ষ মিড লেভেলের জনশক্তির পরিমাণ মোট শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর শতকরা ৫৮ থেকে ১৭ ভাগের মধ্যে। আর এসব দেশে জনপ্রতি বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় প্রায় ৪০ হাজার থেকে ১২ হাজার মার্কিন ডলার। সে ক্ষেত্রে বলতে হয়, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। আমরা আশাকরি, সরকার কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। তাহলে দেশের বৃহৎ বেকার যুবশক্তি কমের্র হাতিয়ারে পরিণত হবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

"