স্মরণ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকবর্তিকা

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোতাহার হোসেন

মুক্তিযুদ্ধে সাহসী জননীর নাম স্মরণ করতে হলে প্রথমেই আসে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নাম। এরপর যে নামটি শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় স্মরণ করতে হয়, তিনি নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের আরেক সাহসী জননী চট্টগ্রামের রমা চৌধুরী। তিনি সদ্যই প্রয়াত হয়েছেন। তিনি এখন তার জন্ম এলাকা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে শায়িত আছেন। কিন্তু কোনো কোনো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কারো কারো জীবন, তার কর্ম, তার আদর্শ, তার ত্যাগ শেষ হয়ে যায় না। বরং এ ধরনের মানুষের ইহজাগতিক ও শরীয় বিদায় হলেও তাদের কর্ম, ত্যাগ, আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ‘পথচলার অন্যতম অনুপ্রেরণা, আলোকবর্তিকা’ হিসেবে থেকে যায় অম্লান, অক্ষয় হয়ে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও বিশিষ্ট লেখক রমা চৌধুরী তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা লেখক রমা চৌধুরী। এই বীর ও সাহসী জননীকে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ‘একাত্তরের জননী’ রমা চৌধুরীর প্রতি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

চট্টগ্রামের শহীদ মিনার ও তার দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত চেরাগি পাহাড় মোড়ে লুসাই ভবনের নিচে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওই দিনই মরদেহ নেওয়া হয় বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়ায় গ্রামে নিজ বাড়িতে। রমা চৌধুরী হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মরদেহ পোড়ানোয় বিশ্বাস করতেন না। তাই তার ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ছেলে দীপংকর টুনুর সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয় তাকে। শহীদ মিনারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। সাহসী জননী রমা চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সেতু ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়া, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ অনেকে।

রমা চৌধুরী পরিণত বয়সেই আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিল রোগ নিয়ে গত জানুয়ারি থেকে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি ছিলেন। গত ২ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে রমা চৌধুরীকে আইসিইউ থেকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। কিন্তু ভোরের দিকে সব আশা শেষ হয়ে যায়, তার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা রমা চৌধুরী ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশা হিসেবে জীবনে তিনি শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৩ মে তিন শিশুসন্তান নিয়ে বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন রমা চৌধুরী। এ সময় তার স্বামী ছিলেন ভারতে। ওই ঘটনার পর থেকেই খালি পায়ে হাঁটতেন রমা চৌধুরী। এলাকার রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী রমা চৌধুরীর বাড়িতে হানা দেয়, শারীরিক নির্যাতনের পর তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা। রমা চৌধুরীর দুই সন্তান সাগর (৫) ও টগর (৩) এ ঘটনার দুই বছরের মধ্যেই মারা যান। তার আরেক সন্তান মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। রমা চৌধুরী ৭১-এর জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’সহ ১৯টি বই লিখে গেছেন। নিজের লেখা বই নিজেই তিনি বিক্রি করতেন। বই বিক্রি করে একটি অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্ন ছিল তার।

রমা চৌধুরীর মৃত্যুতে শহীদ জায়া মুশতারী শফি বলেন, তার পুরো জীবন জুড়েই শুধু আত্মত্যাগ আর সংগ্রাম। জননী সাহসিকা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি অনেক বই রচনা করেছেন; অনেক লিখেছেন। সেসব লেখা সংরক্ষণ করা হয়নি। আমাদের উচিত তার স্মৃতিকে ধরে রাখা। মায়ের মরদেহের কাছে দাঁড়িয়ে কান্নারত সন্তান জহর লাল চৌধুরী বলেন, ‘আমার মা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতেন। তাই একাত্তরে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমার মা চাপা অভিমান নিয়ে চলে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি অনেকের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন। কেউ তখন তাকে সহায়তা করেনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন আমার মায়ের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক। আমি প্রত্যাশা করছি চট্টগ্রামের প্রশাসন ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা রমা চৌধুরীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করবেন। বোয়ালখালীতে শ্বশুরালয়ে একটি এতিমখানা ও একটি বৃদ্ধাশ্রম করার স্বপ্ন ছিল রমা চৌধুরীর। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে আশা করতেই পারি। কারণ, যে মানুষটি তার জীবনজুড়েই আত্মত্যাগের অজস্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এবার অন্যরাও সে দৃষ্টান্তের অনুসারী হবেন, আমরা এমনটা আশা করতেই পারি। রমা চৌধুরী কখনো কারো কাছে মাথা নত করেননি। আর সেই মাথা উঁচু করেই তিনি চলে গেলেন। তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে এসে অধ্যক্ষ রীতা দত্ত নত মস্তকে প্রণাম জানান এই বীরাঙ্গনাকে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরীকে হারিয়ে আজ পুরো দেশ শোকাহত। চট্টগ্রামবাসীর পক্ষে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি গর্বিত। তিনি জীবদ্দশায় কারো কাছ থেকে কিছু নেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও তিনি কিছুই চাননি। সারাজীবন মাথা উঁচু করে তিনি চলেছেন।

চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রমা চৌধুরীর মরদেহে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত আবৃত্তি জোট, বোধন, প্রমা, খেলাঘর, গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রাম, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়ন, বাসদ এবং নগরীর মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল, অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মুসলিম হাইস্কুল, পাহাড়িকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েক শ শিক্ষার্থী সম্মান জানায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান এবং নগর পুলিশের পক্ষে অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোস্তাইন হোসেন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শেষে পুলিশের একটি দল রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে শহীদ মিনারের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহাবুদ্দিন ও মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দাঁড়িয়ে এই বীরাঙ্গনাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এরপর রমা চৌধুরীকে নেওয়া হয় তার দীর্ঘদিনের আবাসস্থল চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবন চত্বরে। কালো কাপড়ে ঢাকা মঞ্চে রাখা হয় তার মরদেহ। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে এসে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম আশ্বস্ত করে বলেছেন, তিনি চট্টগ্রামের গর্ব। তাকে হারিয়ে আমরা শোকাহত। মেয়র মহোদয় হজ থেকে ফিরলে তার সঙ্গে আলাপ করে রমা চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চেরাগী পাহাড় মোড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকেও রমা চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এখানকার লুসাই ভবনের চতুর্থ তলার বাসাটি থেকেই খালি পায়ে হেঁটে তিনি যেতেন নানা গন্তব্য নিজের রচিত বই বিক্রি করতে।

তবে আর কোনো দিনও এই সাহসী জননী মুক্তিযুদ্ধের হারানো সন্তানদের ঠাঁই হওয়া মাটিতে খালি পায়ে হাঁটবেন না। কিন্তু বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, যত দিন থাকবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনাসহ এই বাংলার অসংখ্য নদ-নদী, পাখির কলতান, বাতাস, রোদ, বৃষ্টি তত দিন এসবের মধ্যেই আমরা তাকে খুঁজে পাব। তিনি বেঁচে থাকবেন তার আদর্শে, তার কর্মে, তার ত্যাগের মধ্য দিয়েই। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আলোকিত হবেন শহীদ জননী রমা চৌধুরীর আলোয়। তার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হবে বাংলাদেশের মানুষ-সেই প্রত্যাশা থাকল।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

motaherbd123@gmail.com

"