মতামত

আমাদের অটোরিকশা

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মোঃ আশরাফ হোসেন

প্রায় চল্লিশ লাখ মধ্য ও নিম্নমধ্য আয়ের লোক ঢাকা মহানগরে বসবাস করে। তারা মহানগরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হয়। একজন পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা কেন্দ্রে সময়মতো উপস্থিত হওয়ার জন্য বেবিট্যাক্সির প্রয়োজন হয়। কারণ এখানে বিকল্প কোনো বাহন নেই। মানুষের পেশিশক্তিতে চালিত রিকশা অনেক প্রধান সড়কে যাতায়াত নিষিদ্ধ। ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসের খরচ সাধ্যের মধ্যে নেই এবং কদাচিৎ পাওয়া যায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বেবিট্যাক্সির প্রয়োজন হয়। হাসপাতালে রোগী নেওয়ার জন্যও বেবিট্যাক্সির দরকার। বিশেষ করে মেয়েশিক্ষার্থীদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার জন্য বেবিট্যাক্সি দরকার পড়ে। কারণ মহানগরের সব এলাকায় পাবলিক বাস সার্ভিস নেই। যেসব এলাকায় বাস সার্ভিস রয়েছে, মেয়েদের পক্ষে তা ব্যবহার করা মুশকিল। বাসগুলো অতিরিক্ত পুরুষযাত্রীর কারণে মেয়েরা প্রতিযোগিতা করে তার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে না।

বর্তমানে মহানগরের সড়কগুলোয় অতিরিক্ত গাড়ির কারণে জ্যাম সৃষ্টি হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় বেবিট্যাক্সি না পাওয়াতে যাতায়াত একটা মুশকিলে পরিণত হয়েছে। মধ্যবিত্তের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সংগতি নেই, তারাও বাধ্য হয়ে উচ্চসুদে ব্যাংকঋণ নিয়ে রিকন্ডিশন কার ক্রয় করছেন। একটা গাড়ি না থাকলে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। মহানগরে অতিরিক্ত গাড়ি হওয়ার জন্য এ বিষয়টি প্রধানত দায়ী। সহজে সাধ্যের মধ্যে বেবিট্যাক্সি ভাড়ায় পাওয়া গেলে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কম হতো। কবছর আগে আমি বেঙ্গালুরুর শহরে গিয়েছিলাম। সেখানে ৬৫ হাজার এলপিজিচালিত বেবিট্যাক্সি চলাচল করত, যখন শহরের লোকসংখ্যা ছিল ৬০ লাখ। সেখানে ধনী পরিবারগুলোর নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও প্রায় একটি করে ছোট কার রয়েছে। যখন একজন যাত্রী একটি বেবিট্যাক্সির জন্য পথপাশে দাঁড়ায়, না ডাকতেই এক-দুটি বেবিট্যাক্সি এসে কোথায় যাবেন, জিজ্ঞাস করে। ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যা এক কোটির ওপরে। এখানে এক লাখ বেবিট্যাক্সি প্রয়োজন। বর্তমানে খুব বেশি হলে ত্রিশ হাজার বেবিট্যাক্সি চলাচল করছে। বেবিট্যাক্সির স্বল্পতা ও উচ্চ ভাড়া ঢাকা মহানগরের চলাচল একটা মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি জিপ বা সিডান গাড়ির তুলনায় একটি বেবিট্যাক্সি সড়কের অর্ধেক স্থান দখল করে চলাচল করতে পারে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানসমূহের বেবিটেক্সি চলাচল উৎসাহিত এবং ব্যক্তিগত জিপ ও সিডান কার চলাচল নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন, যাতে ছোট ছোট বেশি গাড়ি সড়কগুলোয় চলে, বেশি যাত্রী বহন করতে পারে। ২০১৫ সালে ভারতে এলপিজিচালিত একটি বেবিট্যাক্সি সমস্ত ট্যাক্স ফি ইত্যাদি পরিশোধ করে ভারতীয় রুপি ১,৭৫,০০০ টাকা ব্যয়ে সড়কে চলাচল করতে পারে। সে একই সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি আমদানি করে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে টাকা ১০ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। খুব বেশি আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, উৎস কর, পরিপূরক শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্পিড মানি এবং গাড়ির ক্রয়মূল্য পরিশোধ করতে উল্লিখিত উচ্চমূল্য গুনতে হয়। বেবিট্যাক্সি রাস্তায় চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট উচ্চব্যয় অতিরিক্ত ভাড়ার প্রধান কারণ। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী রাজনৈতিক ও আমলা যারা ব্যক্তিগত বা সরকারের গাড়ি ব্যবহার করেন, তারা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি উপলব্ধি করতে পারেন না। বিগত তিন দশক ধরে তারা কঠিন প্রশাসনিক নিয়মনীতি এবং উচ্চ শুল্কহার ধার্য করে বেবিট্যাক্সি চলাচল নিরুৎসাহিত করে চলেছে। সরকারের ওই নীতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্য বিত্ত মানুষের ভোগান্তি বৃদ্ধি করেছে। সরকারের ওই বাধাদানকারী নীতি গণতন্ত্রের মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না। অত্যন্ত উচ্চ ভাড়া এবং প্রয়োজনীয় বেবিট্যাক্সির অভাব মহানগরে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য সৃষ্টি করেছে। সাধ্যের মধ্যে ভাড়ায় প্রয়োজনীয় বেবিট্যাক্সি পাওয়া গেলে অনেক পরিবার ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ের অসাধ্য সাধন করতেন না। এতে সড়কগুলো গাড়ির জ্যাম হ্রাস পেত।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ বেবিট্যাক্সি আমদানি ও রেজিস্ট্রেশনের কঠিন প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতাসমূহ দূর করে স্বল্পশুল্কে সহজে বেবিট্যাক্সি মহানগরের চলাচলের পরিবেশ তৈরি করলে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সিডান ও জিপের সংখ্যা হ্রাস পাবে। ঢাকা মহানগরে চলাচল অধিকতর সহজ হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

"