নারী উন্নয়ন

চাই তথ্যের সহযোগিতা

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

নারী উন্নয়নের জায়গাটি তথ্যের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কখনোই তৈরি হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা সামাজিক বৈষম্য সচেতনার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দূর হবে। তথ্য মানুষের জীবন ঘিরে তৈরি করা হয়। তথ্যের মাধ্যমে আসতে পারে ব্যক্তির চেতনার পরিবর্তন। তথ্য মানুষকে হাসায়-কাঁদায়। অধিকারের বোধটা ভেতরে নাড়া দেয়। মানুষের চেতনার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তথ্য অধিকারের মাধ্যমে নারী উন্নয়নের ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের ব্যক্তিগত অনুমতি ভাব এবং সমাজের বাস্তবতার প্রয়োজনে কিংবা জীবনযাত্রার আবশ্যকতায় অস্পর্শনীয় উপাদানকেই বলা হয় তথ্য। তথ্যকে বার্তা-সংবাদ-খবর বলে শনাক্ত করে থাকি। গণযোগাযোগের ক্রিয়া-কর্ম প্রয়োগ, বৈশিষ্ট্য ও সংগ্রহের ধরন অনুযায়ী তথ্যকে তিনটি শ্রেণিতে বিন্যাস করা যায়।

১. বাক্যগঠন বিধিসংক্রান্ত তথ্য (Syntactical Information). ২. শব্দার্থের প্রসারসংক্রান্ত তথ্য (Somatic Information). ৩. বাস্তবধর্মী তথ্য (Pragmatic information).

নারীর উন্নয়নে ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক দিক দিয়ে যে তথ্য প্রচার-প্রকাশ অথবা বিতরণ করা হবে, সে তথ্য মূল্যবান ও সর্বস্তরে মানুষের কাছে ব্যবহারের উপযোগী সুনির্দিষ্ট হতে হয়। মনগড়া, কাল্পনিক বানানো ধোঁয়াটে এবং সম্পর্কহীন অবাস্তব হওয়া চলে না। তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক অবশ্যই থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে দোদুল্যমান তথ্য কুফল বয়ে আনে। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে সর্বত্র শোনা যাচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের কথা। সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শিক্ষা ও চাকরি ইত্যাদি অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নারীরা সোচ্চার। তবে অর্জন খুব বেশি নয়। কেন না, সমাজের সর্বস্তরে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্র নারীরা অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় যাপন করছে জীবন। তবু তাদের কর্মস্পৃহা থেমে থাকেনি। নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছে পুরুষদের সমান্তরালে, আপন যোগ্যতায় বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে। আরো সব সংবাদের পাশাপাশি নারীদের উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা সম্পর্কে জাতি জানতে পায় সংবাদপত্রের মাধ্যমে। কিন্তু সংবাদপত্র তথ্য সাংবাদিতায় নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

যে সমাজে নারী অনুচ্চ কণ্ঠ, সে সমাজেই নারীকে তথ্যশূন্য করা প্রবণতা অধিক। নারীর নৈমিত্তিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ না থাকার ফলে সে জ্ঞানের জগতের নাগালে থাকে না। ফলে সমস্যায় পতিত হয়। নারী জীবনের দৃশ্যমান সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়, তাদের পরিবার ও সামাজিক পরিধি থেকেই। কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে নারীর প্রতি যেসব শোষণ ও নিপীড়ন চলে, তা প্রকাশের ক্ষেত্র এবং পরিবেশ সীমিত হওয়ার কারণে তার দুর্ভোগ নিরসনের পথও হয়ে থাকে সীমাবদ্ধ। প্রতিনিয়ত নারীকে যেসব নির্যাতন ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়, তার অবদমনের বোঝা নারীর মনস্তত্ত্বে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রীয় পরিসরে নারীর নিরাপত্তার জন্য যেসব আইনি অধিকার আছে, তা জানার পরিধি সীমিত। কোনো কোনো ব্যাপারে একেবারে অজানার কারণে নারীকে সহ্য করতে হয় অযাচিত বিড়ম্বনা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্ষমতার ধারণায় ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। একটা সময় মানুষের বধ্যমূল ধারণা ছিল, ঈশ্বর বাস করেন টাকার মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে সে ধারণা বদলে মানুষ বিশ্বাস করে ঈশ্বর আসলে বাস করেন তথ্যে। নারীর শত্রু কে? উত্তর খোঁজার আগে প্রশ্নটি উত্থাপনের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগতে পারে। সন্দেহের অবকাশ নেইÑবিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলন আজ বিশেষত এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নারী ‘স্বাধিকারের আন্দোলন, নারীর ওপর কৃত মনুষ্যত্ববোধহীন আচরণের প্রতিবাদের জন্য তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম বাসিন্দা বাংলাদেশেও এ আন্দোলনের ছোঁয়া লেগেছে। বাংলাদেশ উল্লেখ থাকলেও সঠিক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশ শব্দটিকে অতিক্রম করে সুদূর অতীতের গহ্বরে হানা দেওয়ার আবশ্যকতা নারীর রয়েছে। আর সে জন্যই নারীর প্রকৃত সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করার উদ্দেশ্য তার শত্রুকে, কেন বা কারা তা নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে। এ কথা সবার জানা, অজ্ঞাত শত্রুর চেয়ে জ্ঞাত শত্রু অনেক শ্রেয়। তবে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করলে সন্দেহ নেই, প্রশ্নটির উত্তরে ‘নরের’ কথাই আসবে এবং এ আসাটিও খুব অসংগত নয়। প্রচলিত সমাজ ও জীবনধারা নারীকে বিচিত্রভাবে প্রতারিত ও ক্ষত-বিক্ষত করছে। পুরুষশাসিত সমাজের প্রায় সব নর সে যে পরিচয়েই হোক না কেন, নারীকে শোষণ করেছে। চেতনা জাগ্রত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নারীর প্রথম পাঠ হবে নিজে প্রথমত, মানুষ। দ্বিতীয়ত, নারী বিশ্বাস স্থাপন করা। এ ক্ষেত্রে সুলাস্মিথ-এর উক্তি ‘নারী যেদিন তার জীব বৈজ্ঞানিক (শারীরিক) কর্মকা- থেকে মুক্ত এবং আবেগ ও বুদ্ধির সমন্বয় ঘটিয়ে পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত করবে, সেদিন এ নারীসমাজ মুক্তি আশা করতে পারে নতুবা নয়।’

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিচার বিশ্লেষণহীনভাবে ঘরে ঘরে নারীর প্রতিবাদী কণ্ঠ যদি ধ্বনিত হয়, তাতে বিপর্যয়ই বাড়বে। কাজ হবে না কিছুই। চেতনা বিকাশের জন্য প্রথম যা-করা দরকার, মুষ্টিমেয় শিক্ষিত নারী, যারা নিজেদের যথার্থ অবস্থানকে অনুধাবন করতে পারে। যারা সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারে নারী এবং পুরুষ বৈজ্ঞানিকভাবে আলাদা প্রাণীবিশেষ, স্বাধীনতা মানেই পুরুষদের মতো খালি গায়ে পথচলা নয়। পুরুষদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, নারীর পোশাক পুরুষ পড়লেই সর্বত্র নারী স্বাধীনতার জোয়ার বয়ে যাবে না। তারা চাকরি, গৃহকর্ম, মিটিং আন্দোলন এসবের মধ্যেই শুধু ব্যাপৃত না থেকেই প্রথমে পাশের বাসায় গিয়ে অশিক্ষিত গৃহবধূকে তার অবস্থান সম্পর্কে জানানো, তাকে শিক্ষিত হতে অনুপ্রাণিত করা। স্বাধীনতার প্রথম পাঠ হিসেবে তাকে স্বামীর জুতো ব্রাশ করা থেকে বিরত থাকতে না বলে যদি ধারণা দেয়, সেই নারীর সর্বাগ্রে একজন মানুষ হওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, একান্তভাবে একজন নারী হওয়া। একান্তভাবে একজন নারী হয়ে উঠতে হলে সর্বাগ্রে তার একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়া প্রয়োজন।

আমাদের বিকৃত আর্থ-সামাজিক বিকাশধারার কারণে নারী নিজেই তার শক্তিসত্তার ওপর সঠিক অর্থে আস্থাশীল হয়ে উঠতে পারেনি। এ জন্যই অসংখ্য জটিলতা, মিল-গরমিলে ঠাসা মানবিক লেনদেনের ক্ষেত্রটিও আমাদের পুরুষশাসিত সমাজকাঠামো শ্রেণিশাসনও শ্রেণিবৈষম্যের মতো টিকিয়ে রাখছে পুরুষশাসন ও নারীশোষণ। পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করেও নারীরা কাজের কোনো স্বীকৃতি পায় না। নারী শুধু কোমলই নয়, কঠিনও বটে। এখানে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কহীন হওয়ায় মেয়েরা পুরুষের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এখানে নারী দুভাগে শোষিত ও নির্যাতিতÑ

১. পুরুষ শাসন। ২. মজুরি শোষণ।

বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে কি নিষ্ঠুর নির্মমভাবে রোদ-বৃষ্টি অপেক্ষা করে মেয়েরা পর্যায়ক্রমে ঘানির নিষ্ঠুর জোয়াল টানে, তাদের এ জীবন যেন কবি নজরুলের ‘নারী’ কবিতার বর্ণিত ঘটনার বাস্তব দৃষ্টান্ত। এখনো আমাদের কৃষি থেকেই জাতীয় আয়ের ৬৭ ভাগ উঠে আসে। একবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে এসে নারী মুক্তি আন্দোলন নতুনভাবে বিকশিত হওয়ার প্রচেষ্টায় নয়, সম-অধিকারের দাবিতেও নয়, যাদের শ্রমে-ঘামে সমাজের চাকা সচল আছে সতত। নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে আমাদের নারীর অবস্থান কী এবং কোথায়? এ প্রশ্নটি আজকাল বেশ উচ্চকণ্ঠে সভা-সমাবেশে এবং ঘরোয়া আলোচনায়ও আসে। খুব স্বাভাবিক কারণেই। কেননা বর্তমানে দেশের সরকারপ্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী দুজনই মহিলা। একবিংশ শতাব্দীর গোধূলি আর একবিংশ ঊষাবেলায় দাঁড়িয়ে আজ বিশ্বসভ্যতা শতাব্দীর বিগত দিনগুলোর সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা বিষয়ের সম্ভাব্য খতিয়ান করার যেমন প্রয়োজন পড়েছে, তেমনি অনাগত দিনের আগামী শতাব্দীতে নারীসমাজের গতি প্রকৃতি কেমন হবে তার খতিয়ানও করতে বসেছেন পৃৃথিবীর সচেতন বিবেকবান বুদ্ধিজীবীরা স্ব-স্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে। বিশ্বের অর্থনৈতিক মানচিত্রে ১৭০ মার্কিন ডলার মাথাপিছুর আয় নিয়ে এখন দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্রতম দেশ এবং এর চরম দারিদ্র্যের চরমতম শিকার জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ এ দেশের নারীসমাজ। নারীদের শতকরা ৮৫ ভাগের ও অধিক দরিদ্র সমাজ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। (ইউনিসেফ পত্রিকা শিশু দিগন্ত জুন-৮৮)।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক ও বিশ্লেষক

"