পর্যালোচনা

জীববৈচিত্র্য রক্ষা

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

সাধন সরকার

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবী নামক গ্রহ সৃষ্টির পর থেকেই শুরু হয়েছে প্রাণী ও উদ্ভিদের সম্পর্ক। পৃথিবীতে সৃষ্টির সবকিছুই পরস্পর নির্ভরশীল ও বাস্তুসংস্থানের অন্তর্র্ভুক্ত। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী দূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দুর্যোগ, প্রকৃতি-পরিবেশবিনাশী কার্যকলাপ, যুদ্ধ, মানুষের অসচেতনতাসহ নানা কারণে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীবসহ সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সস্মুখীন। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের’ (ডব্লিউডব্লিউএফ) এক গবেষণা বলছে, বিশ্বে গত ৪০ বছরে বন্যপ্রাণী ৫৮ শতাংশ কমে গেছে। বছর প্রতি এ হ্র্রাসের হার ২ শতাংশ। তথ্য মতে, হ্রদ-নদী থেকে স্বাদু পানির প্রাণী সবচেয়ে বেশি হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রাণিজগতের ওপর জলবায়ুর প্রভাব অনেক আগেই পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ ও হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে গাছপালা, প্রাণীর আবাসস্থল সর্বোপরি জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি হচ্ছে। উপকূলের গাছপালা ও প্রাণ-প্রতিবেশের ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জলভাগের সামুদ্রিক জীব ও স্থলভাগের অনেক প্রাণী অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে। অনেক প্রাণী আবার অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলতে শুরু করেছে। গ্রিন ল্যান্ডের প্রাণীদের বছরে আগে প্রায় নয় মাস বরফের চাদর সুরক্ষা দিত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, এখন বরফ পড়তে অনেক দেরি হয়। আবার বরফ তাড়াতাড়ি গলেও যায়। জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের শীতকালীন বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যাওয়াসহ স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধিতে সমস্যা হচ্ছে।

আবার যত্রতত্র অতিথি পাখি নিধনের কারণে শীতপ্রধান দেশ থেকে অতিথি পাখি আসাও এখন কমে গেছে। দেশীয় পাখিও নিধন করা হচ্ছে। অনেক ধরনের পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। পাখি সবচেয়ে বেশি কীটপতঙ্গ খায়। পরিবেশের বন্ধু বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে থাকে। ব্যাঙও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে ফসলি উদ্ভিদকে রক্ষা করে। কিন্তু জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া কীটনাশকের ব্যবহার মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ করছে। ফলে প্রাণী ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। ছোট দেশ হিসেবেও বাংলাদেশে অনেক বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। বন্যপ্রাণী রক্ষা পাওয়া মানে বন, জলাভূমি ও নির্মল প্রকৃতি রক্ষা পাওয়া। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া ও নির্বিচারে হত্যার শিকার হওয়ায় বন্যপ্রাণীরা বিভিন্ন দেশ থেকে একে একে বিলুপ্ত হচ্ছে। জল ও স্থলভাগের প্রতিটি প্রাণী খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে একে অপরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল ও বঙ্গোপসাগরের উপকূল জীববৈচিত্র্যের আঁধার। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দখল আর সমুদ্র দূষণের কারণে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। হাওর-বাঁওড় ও বিল থেকে পাখি শিকার করা হচ্ছে। একসময় ঢাকা শহরে প্রচুর বৃক্ষ, পাখি এবং পুকুর-জলাশয় ছিল। বর্ষাকালে প্রচুর মাছ, ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণী দেখা যেত। কিন্তু এখন এসব অতীত! যদিও ঢাকা শহরের জলাশয়গুলো রক্ষা এবং দূষণমুক্ত করতে পারলে এখনো কিছু জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব। ‘ডব্লিউডব্লিউএফের’ এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি বিশ্বে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বেড়ে যায়, তাহলে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় বন আমাজান ও আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী বাস্তুসংস্থানের ওপর মারাত্মক বিপর্যয়ের প্রভাব পড়বে। এর ফলে স্তন্যপায়ী ও উভচর প্রাণী, সরীসৃপ এবং পাখি একেবারে হারিয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি অতিক্রম করলে সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। এক কথায় উষ্ণ আবহাওয়া, অতিরিক্ত বৃষ্টি, দুর্যোগ ও দূষণে পৃথিবীর বড় বড় বনাঞ্চল যেমন আফ্রিকার সাভানা অঞ্চল, ব্রাজিলের সিরাডো-পান্তানাল অঞ্চল, ইউরোপের ইয়াংটজ বদ্বীপ ও উপকূল, মাদাগাস্কার ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রাণীর হারিয়ে যাওয়ার মতো সুন্দরবনের বাঘের টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের কোরালসহ অনেক উদ্ভিদ হারিয়ে যাবে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি বিভিন্ন সংরক্ষিত উদ্যান থেকেও হারিয়ে গেছে। ২০১৭ সালের বন বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গত সাত বছরে ৪২ হাজার বন্যপ্রাণী পাচারের সময় আটক হয়েছে। সত্যি বলতে, প্রত্যেক বছর কিছু বন্যপ্রাণী পাচার হয়ও। বিভিন্ন সময় পাচার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ইত্যাদি। সম্প্রতি রোহিঙ্গা বসতি বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। রোহিঙ্গা বসতি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকারও প্রকৃতি ধ্বংস করছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা বসতি এলাকায় ১ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এদের মধ্যে বন্যপ্রাণীর তালিকায় আছে হাতি, হরিণ, বনবিড়াল, শূকর ইত্যাদি। এসব বন্যপ্রাণী রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে পাহাড়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার স্বার্থে, ভারসাম্যপূর্ণ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে পৃথিবীব্যাপী জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতেই হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণে জোর দিতে হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দূষণ (বিশেষ করে প্লাস্টিক, পলিথিন) জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। সব ধরনের দূষণ বন্ধ করতে হবে। সব ধরনের জলাশয় ও প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে হবে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরো উদ্যোগী হতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

sadonsarker2005@gmail.com

"