নিবন্ধ

সড়ক নিরাপদ হোক

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মীর আবদুল আলীম

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা বড় আকারে আন্দোলন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ সড়ক আশ্বাসের পর শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে গেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এ সমস্যার কোনো সুরাহা হচ্ছে না। উপরন্তু প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমরা পত্রিকায় চোখ রাখলেই সড়ক দুর্ঘটনার করুণচিত্র দেখতে পাই। আইনি দুর্বলতায় সড়ক নিরাপদ হচ্ছে না, সড়ক দুর্ঘটনা কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও বাস্তবে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। ২৬ আগস্ট নাটোরে বেপরোয়া বাস এবং লেগুনার সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল ১৫ জন। সেদিন বিভিন্ন স্থানে আরো অন্তত ১০ জন প্রাণ হারায়। একদিনেই ২৫ জন জীবন দিয়েছে সড়কে।

এত কিছুর পরও আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলো এখনো মরণফাঁদ। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন অকালে প্রাণ ঝরছে না, প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বাতাস ভারী হয়ে উঠছে না। দেশে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে, তাতে এ অবস্থায় আজকাল আর কেউ ঘর থেকে বের হলে পৈতৃক প্রাণটা নিয়ে যে ঘরে ফিরতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। সড়ক দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা বরং পরোক্ষভাবে হত্যারই শিকার হয়। সরকারি হিসাব মতে, গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে ৩৪ হাজার ৯১৮ জন। প্রতি বছর মারা যায় ৩ হাজার ৪৯১ জন। থানায় মামলা হয়েছে এমন দুর্ঘটনার হিসাব নিয়ে পুলিশ এ তথ্য দিয়েছে। বেসরকারি হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ২০ হাজার ৩৪ জন। প্রতিদিন গড়ে মারা যায় প্রায় ৫৫ জন। পুলিশের দেওয়া তথ্য ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত তথ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকার কারণ হলো, দুর্ঘটনার পর পুলিশকে ৬৭ ধরনের প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এ ঝামেলার কারণে অনেক দুর্ঘটনার মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ রেকর্ডভুক্ত করে না, যা হোক, পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় ২ হাজার ১৪০ জন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে ১ হাজার ১৮৬ এবং সামান্য আহত হয়েছে ১৫৭ জন। অন্য একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৭৪৮টি। মারা গেছে ৫২ হাজার ৬৮৪ জন। আহত ও পঙ্গু হয়েছে আরো কয়েক হাজার মানুষ।

২০০৯ সালের এক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এশিয়া, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১৫টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা নেপালে বেশি, দ্বিতীয় বাংলাদেশ। সবচেয়ে কম যুক্তরাজ্যে। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার নিবন্ধিত যানবাহনের দুর্ঘটনায় নেপালে মারা যায় ৬৩ জন এবং বাংলাদেশে ৬০ জন। যুক্তরাজ্যে এ হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ওই গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের প্রায় ৩২ শতাংশ ১৬ থেকে ৩২ বছর বয়সের মধ্যে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে যানবাহন দুর্ঘটনায় বছরে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায় এবং আহত ও পঙ্গু হয়ে পরনির্ভরশীল জীবন কাটাতে বাধ্য হয় এর চেয়েও অনেক বেশি মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির সাম্প্রতিক এক গবেষণা তথ্যে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদহানি হয়। এটি দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৯৫ শতাংশের সমান। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় শতকরা ৫০ ভাগ বেশি।

এক গবেষণা জরিপ থেকে জানা যায়, ৪৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যাত্রীবাহী বাস, ৩৭ শতাংশ দায়ী ট্রাক। আরেক গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেশে প্রতি ১০ হাজার মোটরযানে ১০০টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক হাজার মোটরযানে দুই দশমিক পাঁচ ভাগ থেকে তিন দশমিক পাঁচ ভাগ। অন্যদিকে, আমাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতি এক হাজার যানবাহনে ১৬৩ জন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সরকারি হিসাব মতে, ১৯৯৯ সালে ৪ হাজার ৯১৬ জন, ২০০০ সালে ৪ হাজার ৩৫৭ জন, ২০০১ সালে ৪ হাজার ৯১ জন, ২০০২ সালে ৪ হাজার ৯১৮ জন, ২০০৩ সালে ৪ হাজার ৭৪৯ জন, ২০০৪ সালে ৩ হাজার ৮২৮ জন, ২০০৫ সালে ৩ হাজার ৯৫৪ জন, ২০০৬ সালে ৩ হাজার ৭৯৪ জন, ২০০৭ সালে ৪ হাজার ৮৬৯ জন, ২০০৮ সালে ৪ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ২৯৭ জন, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৮০৩ জন, ২০১১ সালে ৩ হাজার ৬৮৮ জন, ২০১২ সালে ৫ হাজার ৯১১ জন, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ৮৬৫ জন এবং ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৯৭৫ জন, ২০১৫ সালে ৮ হাজার ৬৪২ জন, ২০১৬ সালে ৭ হাজার ৪২৭ জন ও ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৬৯৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে বিগত বছরের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। প্রতি বছরই এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। অদক্ষ চালকরাই যে এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এর প্রতিকার হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। মানুষের জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকারকে আরো জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেবল সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে মাসে ৯০০ জন এবং বছরে ১০ হাজার ৮০০ জন মারা যাচ্ছে। তবে বিআরটিএর পরিসংখ্যান মতে, এ সংখ্যা দিনে ১৬ এবং বছরে পাঁচ হাজার ৭৬০ জন লোক মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। তাদের মতে, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল, ২. মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন, ৪. ট্রাফিক আইন না মানা, ৫. নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা, ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা এবং ৭. অরক্ষিত রেললাইন। আর এসব কারণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। তবে সে মৃত্যু যদি অকাল ও আকস্মিক হয়, তাহলে তা মেনে নেওয়া আরো কঠিন। বলতে গেলে, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একের পর এক অকালমৃত্যু আমাদের শুধু প্রত্যক্ষই করতে হচ্ছে না, এ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বিভীষিকাময় ও অরাজক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা আমাদের কারো কাছেই কাম্য নয়। আমরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

newsstore13@gmail.com

"