জলবায়ু

সুভাকুসুমের নিত্যদিনের বাঁচা

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

ইয়াসমীন রীমা

সুভাকুসুমের বাড়ি খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নের শ্রীনগর গ্রামে। বাড়িটি আইলায় ভাসিয়ে নেয়। আজও তার পরিবারটি ভেসে বেড়াচ্ছে। তিনি এখন বাস করেন বেড়িবাঁধের ওপর একটি ঘুপড়ি ঘরে। কাজের আশায় তার স্বামী রয়েছেন ভিন গাঁয়ে। সুভাকুসুম বলেন, ‘ঝড়ে আমাদের বাড়িঘর সব ওই নদীতে গেছে। এখন স্বামী, ছেলেপুলে নিয়ে এই বাঁধের ওপর থাকি। কী খাবে, কোথায় থাকব, কোনো কিছুর ঠিক নেই।

বাঁধের খুপড়িতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর পুরুষ সদস্যরা কাজের খোঁজে বাগেরহাট ও গোলাপগঞ্জ গেছেন। যারা আছেন, তারা সবাই নারী। এখানেই মজুরি দিচ্ছেন অথবা দিনমজুর হিসেবে কাঁকড়ার নৌকা ও মাছধারার নৌকায়। প্রয়োজনের তাগিদে কেউ খুপড়ির পাশে বাঁধের জায়গায় সবজি চাষের চেষ্টাও করছেন। কিন্তু কাজ সব সময় পাওয়া যায় না।

ভৌগোলিক কারণেই পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ঘূণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নিয়মিত মোকাবিলা করতে হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বোচ্চ জলবায়ু বিপন্ন দেশগুলোর একটি। ভৌগোলিক অবস্থান, বর্ধিত জনসংখ্যা ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে এমনিতেই দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তন এ সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিগত বছরগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং অতিরিক্ত গরম ও শীতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকহারে। এসব দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সেই সঙ্গে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সম্পদও বিনষ্ট হচ্ছে।

২০০৯ সালের ২৫ মে প্রবল বেগে এবং দীর্ঘস্থায়ী ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে উপকূলীয় খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায়। আইলার আঘাতে নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। আইলার আঘাতের পরপরই শুরু হয় বর্ষাকাল। নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির কারণে সময়মতো বাঁধ মেরামত সম্ভব হয় না। গৃহহীন জনগণ আশ্রয় নেয় নদীর বেড়িবাঁধের ওপর। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আয়েশা খানম বলেন, ‘সরকার এসব এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করলেও পানীয়জল এবং চিকিৎসাসেবার অপর্যাপ্ততা রয়েই যায়। এর প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। খাবার পানির অভাব তো আছেই, সেই সঙ্গে রোগবালাই এবং চিকিৎসার অভাব দেখা দেয়। দুই গ্রাম খুঁজেও ডাক্তারের দেখা মেলে না। গত কয়েক মাসে পদ্মপুকুর ইউনিয়নে (শ্যামনগর) প্রসব বেদনা, ডায়রিয়া, আমাশয়, হৃদরোগ, অপুষ্টিসহ বিভিন্ন রোগে ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই নারী।’

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং জার্মানওয়াচ, যুক্তরাজ্যের ম্যাপলক্রফট এবং অধ্যাপক ক্যারোলিন সুলিভানের বিপদাপন্নতা সূচক অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বিপদাপন্ন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে বিপদাপন্ন নারী ও শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৮৭ শতাংশই নারী এবং তারা পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানীয়জল, প্রাণিসম্পদ, বৃক্ষসম্পদ ও ফসল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এসব খাত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নারীদের ওপর পানীয় জল সংগ্রহ ও গৃহস্থালি কাজের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের হার কমছে।

ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন অনুসারে, গর্ভবতী নারী এবং কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। দুর্যোগের সময় পুরুষের তুলনায় নারীর মৃত্যুঝুঁকি ১৪ গুণ বেশি। ১৯৯১ সালের বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়ে নিহত ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ছিলেন নারী এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় আক্রান্তদের ৭৩ শতাংশই ছিলেন নারী। ঘূণিঝড় আইলায় দকোপ উপজেলায় মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন। খুলনার পশুর নদী অববাহিকায় সিইজিআইএসের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, এ অঞ্চলের মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি ও অন্যান্য খাবার থেকে দৈনিক ১৬ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করছে, যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৯-১০ সালে খুলনার দাকোপ উপজেলার ১৩ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩৪৫ জন গর্ভবতী নারী নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নোনাপানি গ্রহণের ফলে নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, জরায়ুর প্রদাহ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশুও জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।

আইলা বিধ্বস্ত এসব অঞ্চলে স্বাদুপানির সংকট বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর থেকে, কখনো কখনো ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূর থেকেও পানি সংগ্রহ করতে হয়। শুধু পানি সংগ্রহের জন্য পরিশ্রমের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে নারীদের মৃতশিশু জন্মদানের হার দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া পানি সংগ্রহের জন্য চিংড়িঘেরের (যা লবণাক্ততা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মানবসৃষ্ট কারণ) বেড়িবাঁধের ওপর দীর্ঘ নির্জন পথ পাড়ি দেওয়ার সময় নারী ও কিশোরীরা প্রায়ই যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। দুর্যোগের হার ও ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায়ও ঘাটতি দেখা দেয়। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে পায়খানা ও টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় নারীরা চরম সংকটে পড়েন। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের অনিরাপদ পরিবেশ ও সীমিত জরুরি সেবার কারণে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে পড়ে। দুর্যোগের পর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নারী, কিশোরী ও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। দুর্যোগের পর স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিবারের আয়ক্ষম পুরুষ সদস্য কাজের খোঁজে সাময়িকভাবে অভিবাসিত হন। এ সময় সন্তান ও পরিবার নিয়ে নারীরা অমানবিক জীবনাযাপন করেন।

ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারাবিলিটি স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহাবুবা নাসরিন বলেন, ‘খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও ভোলা উপকূলীয় এলাকাগুলোর প্রায় কাছাকাছি চিত্র দেখেছি। প্রতিটি পরিবারে সন্তান ৬-৮ জন, অনেক নারী অন্তঃসত্ত্বা। সেখানে নেই কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কারণ হিসেবে তারা বললেন, প্রতি বছর প্রাকৃতিতে দুর্যোগ আর বান তাদের জীবনে নিয়মিত বিষয়। হারাতে হয় অনেককে, প্রিয় সন্তানকেও। তাই অধিক সন্তানে তারা বিশ্বাসী ও আগ্রহী। কিছু হারাবে আর কিছু টিকে থাকবে। অবাক শোনালেও এ এক কঠিন ও বাস্তব সত্য। যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৃদ্ধ এবং শিশুদের পাশাপাশি বিশেষতার ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। তাই দুর্যোগে অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় একাধিক বিয়ে নতুন কোনো ঘটনা নয়।’ এত বছরেও পুনর্বাসিত হয়নি সাতক্ষীরার হাজারও পরিবার। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে এখন আইলাকবলিত নিরাশ্রয় গৃহহীন মানুষের আহাজারি চলছে। অন্ন, বস্ত্র খাবার পানি আর বাসস্থানের জন্য চারদিকে এখনো হাহাকার চলছে। সর্বগ্রাসী আইলা আজও গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বাড়ে। এই চরম দুর্যোগেও লিঙ্গবৈষম্য দেখা দেয়। সবার টার্গেট থাকে পুরুষগুলোকে উদ্ধারের। নারী ডুবে গেলে ক্ষতি কী? সিডরের সময় একটি কিশোরী বলেছিল, ‘বাবাকে সবাই বাঁচিয়েছে। কিন্তু আমার মা ও বোনটা ভেসে গেছে।’

সুতারখালী গ্রামের বয়োবৃদ্ধা আছিয়া বলেন, ‘একেবারে শিশু বয়সে বাপ-মা হারিয়ে ভোলার চরফ্যাশন থেকে দাদির সঙ্গে এসে উঠেছিলাম খুলনায়, আজও তার অকুলে ভাস শেষ হয়নি।’ এদিকে বাজারের চালের আড়তদার পরিমল ম-লকে আবহাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইছি কি না। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রতীকী শব্দটি তবে সুতারখাল বিন্দুতেও পৌঁছেছে। পরিমল বলেন, ‘কেন হচ্ছে জানি না কিন্তু বুঝি যে আবহাওয়া নষ্ট হচ্ছে, শুনেছি নিম্নাঞ্চল ডুবে যাবে।’ এসব বিশ্বাস করেন? পরিমলের সহজ উত্তর- ‘বিজ্ঞানীরা যখন বলেছেন বিশ্বাস তো করতেই হবে।’ শ্রীনগর-সুতারখালীর সুভাকুসুম আর আছিয়ার অবশ্য এসব তথ্য জানা নেই। তাদের রোজকার জীবনটাই সবচেয়ে বড় জানা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"