বিশ্লেষণ

পোলট্রি ফিডে পাটমোড়ক

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

এম এস মুকুল

একটি শিল্পের বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শিল্পসংশ্লিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পর্যালোচনা করে নেওয়া দরকার। কেননা আরোপিত সিদ্ধান্তের কারণে কখনো কখনো শিল্পের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। যদিও পরিবেশের সুরক্ষায় পাটের মোড়কের ব্যবহার আবশ্যকীয় ও ভালো উদ্যোগ। তারপরও নিরাপদ পোলট্রি ফিডের মান অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি তার চেয়েও জরুরি। এ প্রসঙ্গে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) সভাপতি মসিউর রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পাটের বস্তায় পোলট্রি ফিড মোড়কীকরণ করলে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, আমাদের দেশে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেশি, বর্ষার সময় তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তাই বাতাসের সংস্পর্শে এলে ফিডে ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটে এবং ফিড বিষাক্ত হয়ে পড়ে। তিনি দুঃখ করে বলেছেন, পোলট্রি ও ফিশ ফিডের মান উন্নয়নের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তারা যখন রফতানির কথা ভাবছেন, এমন সময় সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত এ শিল্পের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে। এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘পাটের বস্তায় বিশ্বের কোনো দেশ কী আমাদের কাছ থেকে পোলট্রি কিংবা ফিশ ফিড কিনবে?’ ব্যাপারটি অবশ্যই ভাবনীয়, পূর্ণবিবেচ্য বিষয়। তবে পাটের বস্তা এবং তার ভেতরে ফিডকে নিরাপদ রাখার জন্য পাটের পলিথিন দিয়ে মোড়কীকরণ করা যায় কিনা, সে বিষয়টিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে।

আমরা জানি, আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে পোলট্রি শিল্পের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই জোগান দিচ্ছে এই শিল্পটি। এই শিল্প খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যার সঙ্গে কমবেশি ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। এ কারণে এত বড় একটি শিল্পের যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিল্পের স্বার্থরক্ষাও জরুরি বিষয়। যদিও নিরাপদ খাদ্য ও পোলট্রিশিল্প বিষয়ে জনমনে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে, তারপরও শিল্পবিরোধী এমন কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশপাশি দেশীয় প্রাণিজ আমিষের জোগান হুমকির মুখে পড়বে-এ ব্যাপারটিও ভাবতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব প্যাথলজির অধ্যাপক ড. প্রিয় মোহন দাস বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে ময়েশ্চার এবং ফাংগাস কন্ট্রোল। পাটের বস্তায় ফিড প্যাক করলে ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন পর্যন্ত ফিড ভালো থাকবে কিন্তু এরপর তা মাইকোটক্সিনে আক্রান্ত হবে।’ তাই দেশীয় প্রাণিজ আমিষের জোগান ঠিক রাখতে পোলট্রিশিল্পের সঙ্গে জড়িত পোলট্রি ফিড উৎপাদক, ডিলার, খামারি ও ব্রয়লার উৎপাদকদের নিরাপদ ও মানসম্মত পোলট্রি খাবার, উৎপাদন, সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং খুচরা পর্যায়ে লাইভ বার্ড বিক্রিতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারিও বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মো. গিয়াসউদ্দিন এ বিষয়ে অভিমত প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পোলট্রি ও ফিশ ফিডের জন্য এয়ারটাইট ব্যাগের প্রয়োজন। পাটের ব্যাগে ফিড প্যাকেজিং করলে মাত্র কয়েকদিনেই তা ছত্রাকের সংক্রমণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর এই টক্সিক ফিড হাঁস, মুরগি বা মাছ খেলে তারা নানাবিধ রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হবে।’ বিশেষজ্ঞদের এই মতামতগুলো অবশ্যই গুরুত্বারোপ করা দরকার।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। মাথাপিছু কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৪১টি। ২০১৬ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ। মাথাপিছু কনজাম্পশন প্রায় ৫১টি। এই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু কনজাম্পশন প্রায় ৮৬টিতে। পরিসংখ্যানে মুরগির মাংসের উৎপাদন ও কনজাম্পশন দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১,৫১০ টন। তখন মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৩.৫ কেজি। ২০১৬ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৮৫১ টন। তখন মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৪.২ কেজি। আর এ ধারাবাহিকতা থাকলে ২০২১ সালে হবে উৎপাদন হবে প্রায় ৩ হাজার ৩০০। মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন হবে প্রায় ৭ কেজি। এমন প্রেক্ষাপটে খাতসংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০২০ সালের মধ্যে পোলট্রি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করা যাবে। আর এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে প্রাথমিক পর্যায়ে বছরে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই শিল্পের সম্ভাবনা কত বড়, তা সহজেই অনুমেয়। জাতীয় অর্থনীতিতে পোলট্রিশিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ ছাড়াচ্ছে। পোলট্রি ফিডের উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পোলট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ লাখ টন। ২০১৬ সালে পোলট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৩ লাখ টন। ২০২১ সালে পোলট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন হবে প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টন। তাই পোলট্রি ফিডে পাটের মোড়কীকরণের প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানিয়ে ফিড প্রস্তুতকারকরা বলেছেন, পূর্বাপর না ভেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে দেশীয় এই শিল্প পথে বসবে। তারা বলছেন, যেখানে পাটের বস্তার ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়, সেখানেও যদি জোর করে তা বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা আরো বলছেন, শুধু ফিড ইন্ডাস্ট্রিতেই বছরে অন্তত এক কোটি বস্তার প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ে এ পরিমাণ বস্তা সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব। বস্তার অভাবে যদি ফিড সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে বাজারে ডিম ও মুরগির মাংসের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেবে। কাজেই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে এবং প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করতে হলে সরকারকে সিদ্ধান্ত পূর্ণবিবেচনা করতে হবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রিশিল্পের ওপর একের পর এক নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা ও চাপ বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নেওয়া শুরু হয়। পরের বছরগুলোয় করের পরিধি ক্রমেই বাড়ানো হয়েছে। এখন বিএসটিআইয়ের সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের জটিলতা এবং অর্থনৈতিক চাপ বিশ্লেষণ করে পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই নতুন আরেক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো রকম আলোচনা ছাড়াই পাটের বস্তা কেন বাধ্যতামূলক করা হলো, তা বোধগম্য নয়।

অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, পোলট্রি উৎপাদনে মোট খরচের শতকরা ৬৫ থেকে ৭৫ ভাগ খরচ হয় শুধু খাবারের পেছনে। সুতরাং খাবারের মূল্য কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সহজতর করা প্রয়োজন সবার আগে। এ প্রসঙ্গে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) সাধারণ সম্পাদক আহসানুজ্জামান বলেন, ‘পণ্য মোড়কীকরণে পাটের বস্তার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। আমরাও এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বুঝতে হবে মোড়কীকরণের সিদ্ধান্তটি সুনির্দিষ্ট কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে আদৌ প্রযোজ্য কি-না। তিনি বলেন, পলিথিন পরিবেশের ক্ষতি করে তাই পোলট্রি ও ফিশ ফিড মোড়কে আমরা অনেক আগে থেকেই বায়োডিগ্রেডেবল পিপি ওভেন ব্যাগ ব্যবহার করছি। তিনি বলেন, ৫০ কেজি ধারণ ক্ষমতার একটি পিপি ওভেন বস্তার দাম পড়ে মাত্র ২০ টাকা। সেখানে একটি পাটের বস্তার দাম প্রায় ৭০-৮০ টাকা। অর্থাৎ শুধু পাটের বস্তার কারণেই প্রতি ব্যাগ ফিডের দাম ৬০ টাকা বেড়ে যাবে! অর্থাৎ প্রতি কেজি ফিডের উৎপাদন খরচ বাড়বে ১.৬০ টাকা। এতে সাধারণ তৃণমূল খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভোক্তা সাধারণ। কারণ পোলট্রি বা ফিশ ফিডের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে খুব স্বাভাবিক কারণেই এর প্রভাব গিয়ে পড়বে ডিম ও মুরগির মাংসের দামের ওপর, যা সাধারণ ক্রেতাদের বিড়ম্বনায় ফেলবে।’

বাংলাদেশে পোলট্রির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান খোঁজে বের করতে হবে। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বে পোলট্রি খাদ্য উৎপাদন ১০০ কোটি টন ছাড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালে তা বাড়াতে হবে ৬০ থেকে ৭০ গুণ। এই বিশাল বাজারের সার্বিক নিরাপত্তায় যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন এখনই জরুরি। এ বিষয়ে অভিমত জানিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের অ্যাসিট্যান্ট প্রফেসর শশি আহমেদ বলেছেন, ‘শুধু পাটের বস্তায় ময়েশ্চার কন্ট্রোল করা সম্ভব নয়। তাই পোলট্রি ও ফিশ ফিডের প্যাকেজিংয়ে পাটের বস্তার ব্যবহার হয়তো বাস্তবসম্মত হবে না।’ আবার শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল হক বেগ বলেন, ‘পোলট্রি ও ফিশ ফিডে সাধারণত দুই স্তরের প্যাকিং থাকে-ভেতরেরটি এয়ারটাইট প্যাক এবং বাইরের প্যাকটি ব্যবহৃত হয় নিরাপদে পরিবহন ও ভেতরের স্তরটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য। ফিডের মান ও আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় ধরে রাখতে এয়ারটাইট প্যাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পাটের ব্যাগের মাধ্যমে এয়ারটাইট করার প্রযুক্তি আছে কি না তা আমার জানা নেই। অবশ্য সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে ভেতরে এয়ারটাইট পলি প্যাক এবং বাইরে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন এসব বিষয়গুলো ভেবে, বিশ্লেষণ করে শিল্পের স্বার্থ রক্ষা করে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে হবে সদাশয় সরকারকে।

লেখক : কৃষি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

"