ইসলাম

পরিবার ও সুস্থ পরিবেশ

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০

জাহাঙ্গীর আলম জাবির

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ইসলাম প্রবর্তিত পরিবার প্রথার সুফল পেতে হলে এর সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রকৃষ্ট ক্ষেত্র হলো পরিবার। সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। পরিবার ছাড়া জীবনে চলার পথে থাকে না কোনো নিরাপত্তা। সামাজিক, মানবিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষ পরিবারেই সবচেয়ে বেশি পারস্পরিক সহযোগিতা পেয়ে থাকে। ইসলামে পারিবারিক সদস্যদের মুহসিনীন বা প্রাচীরঘেরা দুর্গে অবস্থানকারী সুরক্ষিত লোকজনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

ইসলামে পরিবার শুধু স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের পরিসর আরো ব্যাপক, নিকট আত্মীয়স্বজনও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক দয়া, করুণা এবং সহানুভূতি তো আছেই, বাড়তি দায়িত্বশীলতার প্রশ্নও জড়িত। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পূর্ণ সহযোগিতা ও স্নেহ, ভালোবাসার বন্ধনের ওপর নির্ভর করে পারিবারিক জীবনের সুখ-শান্তি ও সর্বাঙ্গীন উন্নতি, স্বামী-স্ত্রী নিজ নিজ কর্তব্য পালন করে চললে পারিবারিক পরিবেশ অনেকাংশে সুখ ও শান্তিতে ভরে ওঠে। পরিবার হচ্ছে আদি ও ক্ষুদ্রতম একক অংশ বা ইউনিট। মানবসৃষ্টির শুরু থেকেই পরিবারের উৎপত্তি ঘটেছে এবং পরিবারের অস্তিত্বের সঙ্গে মানব প্রকৃতি সম্পৃক্ত। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় পরিবারই হলো মানুষ গড়ার মূল কেন্দ্র এবং সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি। এ জন্য পরিবার গড়ার ব্যাপারে ইসলাম বিশেষভাবে যতœবান হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। দাম্পত্য জীবন সুখের হলেই পরে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ও আনন্দময় হয়। আল্লাহতায়ালা তাই দাম্পত্য জীবন গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে স্বামীর জন্য বিয়ের আগে স্ত্রী ও সন্তানের ভরণ-পোষণের জোগান দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করার কথা বলেছেন। পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করার আগেই একজন পুরুষের উচিত তার স্ত্রীর ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের ভরণ-পোষণ করার মতো আর্থিক সচ্ছলতা অর্জন করা। মহান আল্লাহপাক বলেন, ‘আর সন্তানের বাবার দায়িত্ব যথাবিধি তাদের (মা ও শিশুর) ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৩)।

এ আয়াত দ্বারা এ কথা বোঝানো হয়েছে, শিশুকে স্তন্যদান মায়ের দায়িত্ব আর ভরণ-পোষণ ও জীবন ধারণের অন্যান্য দায়িত্ব বহন করবে বাবা। সামাজিক পরিবেশে বসবাস করা স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার এবং বাচ্চাকে দুধ পান করানো তার সর্বশ্রেষ্ঠ মমত্ববোধের পরিচয় ও কর্তব্য। এটা শিশুর অন্যতম অধিকার ও বটে। সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।’ এসব অধিকারসমূহ যথাযথভাবে আদায় করে স্বামী পরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে। আর এ দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন আর্থিক সচ্ছলতা। নতুবা স্ত্রীর অধিকার আদায় করা বা সন্তানের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, বিনোদন, ভবিষ্যৎ জীবন গঠন কোনোটিই সম্ভব নয়। তাই পারিবারিক পরিবেশ সুন্দর ও শান্তিময় করতে হলে সবাইকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইসলামে। মা-বাবার ওপর সন্তানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট বয়সে তার জন্য আলাদা শয়নের ব্যবস্থা করা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন তোমরা তাদের নামাজের জন্য আদেশ করো। আর দশ বছর হলে তাদের নামাজের জন্য তাগিদ দেবে এবং ফাররিকু বায়নাহুম ফিল মাদাজিই তাদের বিছানা আলাদা করে দেবে।’

হজরত লোকমান (আ.) নিজ ছেলেকে যে মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন, পবিত্র কোরআন শরিফে তার উল্লেখ হয়েছে এভাবেÑ‘হে বৎস নামাজ কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে সবর করো। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ়তার কাজ।’ (সুরা লোকমান, আয়াত-১৭)। শিশুরা নরম মাটির মতো, শৈশবে যে মূল্যবোধ ও আদব-আখলাকের পরিবেশে বেড়ে উঠবে, তাই পরবর্তী জীবনে স্থায়ী হয়ে যায়। এ কারণে পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। এ সময় মা-বাবা নিজেদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব দিয়ে এবং ধর্মীয় নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের প্রতিপালন করবেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পিতা, মাতার ওপর সন্তানের অন্যতম অধিকার হচ্ছে তাকে উত্তম শিক্ষা দেওয়া এবং সুন্দর একটি নাম রাখা।’ (বায়হাকি শরিফ)। ছোটবেলা থেকেই শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এটি মা-বাবার ওপর ফরজ। এই কর্তব্য পালন না করলে গুনাহগার হতে হবে এবং আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। হজরত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দোলনা থেকে শিক্ষা শুরু করো।’ তিনি শিশুকে দোলনায় দেখতে চেয়েছেন, অযতœ-অবহেলায় ধুলাবালিতে নয়। আর তাকে এ বয়স থেকেই আনন্দপূর্ণ পরিবেশে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে বলেছেন। প্রিয়নবী (সা.) শিশুদের জ্ঞান দানের কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, বরং তাদের সাঁতার কাটা, এমনকি তীর চালানো পর্যন্ত শিক্ষা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। পড়ালেখা, সাঁতার কাটা, তীর চালানো শিক্ষা দেওয়া এবং পবিত্র উপজীবিকার ব্যবস্থা করা বাবার ওপর সন্তানের অধিকার; (বায়হাকি)। ইসলাম একটি মধ্যপন্থি ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। ইসলাম বলেছে, তুমি আয় বুঝে ব্যয় করো। দারিদ্র্য যেমন ইসলাম কামনা করে না, অনুরূপভাবে ইসলামে বাহুল্য বর্জনের নির্দেশও রয়েছে। কারণ সীমাহীন দারিদ্র্য অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে কুফরির পথে ধাবিত করে, আবার সীমাহীন প্রাচুর্য আর অপরিকল্পিত সন্তান-সন্ততি ও পারিবারিক সদস্য বৃদ্ধি পরিবারে অশান্তি ডেকে আনে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিপথগামী করে। সন্তানের জন্ম দেওয়াই শেষ নয়, সন্তানের উপযুক্ত ভরণ-পোষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দায়িত্ব পালনই প্রকৃত বিষয়। হজরত নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম শরিফ)।

লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

jahangirjabir5@gmail.com

 

"